শিরোনাম :
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ: ৫৫ বছরে ১৮ জন, নতুন মুখের অপেক্ষা গ্যাস সংকট: ক্ষমা চেয়ে ব্যবসায়ীদের ‘মোরাল সাপোর্ট’ চাইলেন জ্বালানিমন্ত্রী ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেনও হবে বাংলা কিউআরে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ফখরুল, এলজিআরডিতে সালাহউদ্দিন, স্বরাষ্ট্রে এ্যানি গ্যাস সংকট: তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল, মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ আরও ১২ জেলায় চালু হলো অনলাইন ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতে হাইকোর্টে রিট দায়ের বিপর্যস্ত অস্ট্রেলিয়া,ব্যাটিং-বোলিংয়ে স্বপ্নের মতো দিন বাংলাদেশের কেন ঢাকা শহর থেকে সরছে না বাস টার্মিনাল

গ্যাস সংকট: ক্ষমা চেয়ে ব্যবসায়ীদের ‘মোরাল সাপোর্ট’ চাইলেন জ্বালানিমন্ত্রী

দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ইকবাল হাসান মাহমুদ। একই সঙ্গে তিনি সংকট মোকাবিলায় ব্যবসায়ী মহলের কাছ থেকে মানসিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। তার ভাষায়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই বাস্তবতা তিনি নিজেও গভীরভাবে অনুধাবন করেন এবং কারখানা বন্ধ থাকা অবস্থাতেও ব্যাংকঋণের সুদ ও কর্মীদের বেতন পরিশোধের যে চাপ উদ্যোক্তাদের ওপর থাকে, তা তার অজানা নয়।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক ওই আলোচনায় দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতি, তার কারণ এবং আগামী দিনের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আলোচনার শুরুতেই মন্ত্রী নিজের বক্তব্যে একরকম আত্মজিজ্ঞাসার সুরে বলেন, বর্তমান সংকট নিয়ে তিনিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একই রকম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “মিটিংয়ের শুরুতেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে আজকের যে সমস্যাটা, সে সমস্যাটার জন্য আমিসহ সবাই ভোগান্তির মধ্যে আছি।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান সংকট নিয়ে সরকার কোনো দায় এড়িয়ে যেতে চায় না, বরং পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেই তিনি কথা বলছেন।

সমুদ্রে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার বিবরণ

আলোচনায় মন্ত্রী তুলে ধরেন, গভীর সমুদ্রে অবস্থিত একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই মূলত গ্যাস সরবরাহে এই টানাপোড়েনের সূত্রপাত। তার ভাষ্যমতে, এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে, তা সরকারের কল্পনাতেও ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতা এবং এর প্রভাব নিয়ে তিনি নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করেন।

তবে তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় টার্মিনালের কাছাকাছি অবস্থানরত এলএনজিবাহী আরেকটি জাহাজকে দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল বলেই আরও বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে। এই বিষয়টিকে তিনি সংশ্লিষ্টদের তাৎক্ষণিক তৎপরতার ফসল হিসেবে অভিহিত করেন।

দেশে বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ সচল থাকার কথা থাকলেও, তার একটিতে সাম্প্রতিক সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী একধরনের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এখন শুধু আমার দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নাই। আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই।”

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে তোলার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও সময়সাপেক্ষ কাজের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে তাড়াহুড়ো করার তেমন সুযোগ নেই।

সরকারের আন্তরিকতার বার্তা

সংকট মোকাবিলায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, “এ সরকার জনগণের সরকার। জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে বলে আমরা এখানে এসে সরকার গঠন করতে পেরেছি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দিনরাত পরিশ্রম করছে এই সংকট নিরসনে। তার ভাষায়, “উই অল আর ভেরি সিরিয়াস।” অর্থাৎ, সংকট নিরসনে সরকারের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি এ কথাও স্পষ্ট করেন যে, এফএসআরইউ মেরামতের মতো কারিগরি বিষয়াদি এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় নির্ধারণ পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এখন এফএসআরইউ খারাপ হয়ে গেছে। এখানে তো আমি জোরজবরদস্তি করে বলতে পারব না। ইঞ্জিনিয়াররা যেভাবে আমাদেরকে বলবে, সেভাবেই হবে।”

মেরামত ও সরবরাহ পরিস্থিতি

মন্ত্রী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটের মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পরও দুটি বয়লার পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে সচল করতে অন্তত ৭২ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হবে বলে দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা সরকারকে অবহিত করেছেন। তার আশঙ্কা, এই সময়ের মধ্যে গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা শিল্প উৎপাদনে বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

সাময়িক এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে চার কার্গো এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করেছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিকল হয়ে যাওয়া এফএসআরইউ পুনরায় সচল হলে এসব এলএনজি খালাস করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া টার্মিনালের প্রয়োজনীয় তার বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব সরঞ্জাম দেশে পৌঁছানোর পর যাতে দ্রুততম সময়ে শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঘটনাস্থলে পাঠানো যায়, সে জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতোমধ্যে বিশেষ সমন্বয় করা হয়েছে। তার লক্ষ্য, সরঞ্জাম দেশে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যেন তা মেরামতস্থলে পৌঁছে যায়।

উদ্যোক্তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা পুরোদমে চালু রাখতে না পারায় একদিকে যেমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। এর ওপর ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে তারা মন্তব্য করেন।

উদ্যোক্তাদের এসব উদ্বেগের জবাবে মন্ত্রী নিজের অতীত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি জানান, দেশে বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়নের সূচনালগ্নে তিনি নিজেও একজন শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তাই শিল্প পরিচালনায় যে চাপ ও প্রতিবন্ধকতা থাকে, তা তার একেবারে অজানা নয়। তিনি বলেন, “আমি তো আপনাদেরই একজন। আপনাদের কষ্টটা আমার চেয়ে বেশি আর কে বোঝে? কারণ আমি জানি, আমরা যখন ইন্ডাস্ট্রি করছি, আমাদের এই ইন্টারেস্টের চাকা কীভাবে ঘুরছে।”

কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ যে থেমে থাকে না, সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সবার ছুটি আছে, কিন্তু ইন্টারেস্টের ছুটি নাই। ছুটির দিনেও ইন্টারেস্ট বাড়তে থাকে।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শিল্পোদ্যোক্তাদের আর্থিক দুর্ভোগের প্রতি নিজের সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

সরকারের অঙ্গীকার

মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী নিজে তিন দফায় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়ে শিল্প খাতের সংকট নিরসনে করণীয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

শিল্প খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইন্ডাস্ট্রি না চললে আমার ইকোনমিক গ্রোথ হবে কই থেকে? সুতরাং আমাদের জন্য শিল্পকে চালায়ে রাখা শিরোধার্য।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে শিল্প উৎপাদন সচল রাখাকেই সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।

তিনি আশ্বাস দেন, শিল্প খাত সচল রাখতে যা যা করণীয়, সরকার তার সবকিছুই করবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের জবাবদিহিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছে এবং জনগণের রায়ই চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, “ইলেকশনে যদি জনগণ না নেয়, আমরা চলে যাব। এটা আমাদের অতীতে রেকর্ডও আছে।”

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

চলমান সংকট সাময়িক হলেও দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি একটি সমস্যা বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতের বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তব্যের শেষভাগে এসে মন্ত্রী আবারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, “এটা আমাদের ক্রিয়েট করার সমস্যা না। কিন্তু সরকার যখন দায়িত্ব নিয়েছি, দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের। সে দায়িত্ব অবহেলা করছি না। আমরা সবাই চেষ্টা করছি অতি দ্রুত যেন আপনাদের সমস্যার সমাধান করতে পারি।”

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে সংকটের উৎস নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন, অন্যদিকে সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেন।

সার্বিক পর্যালোচনা

ামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এই আলোচনাসভায় মন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে যেমন বর্তমান সংকটের প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত কারণ তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি রূপরেখাও উঠে এসেছে। সমুদ্রে অবস্থিত ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং এর পরবর্তী যান্ত্রিক জটিলতা যে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক হলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে, তা মন্ত্রীর বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একই সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে তারা প্রকৃত অর্থেই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, দ্রুত সময়ের মধ্যে এফএসআরইউ মেরামত সম্পন্ন হয়ে স্বাভাবিক সরবরাহ কতটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ: ৫৫ বছরে ১৮ জন, নতুন মুখের অপেক্ষা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

কেন ঢাকা শহর থেকে সরছে না বাস টার্মিনাল

১৩ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

গ্যাস সংকট: ক্ষমা চেয়ে ব্যবসায়ীদের ‘মোরাল সাপোর্ট’ চাইলেন জ্বালানিমন্ত্রী

আপডেট সময় ০৮:১৬:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ইকবাল হাসান মাহমুদ। একই সঙ্গে তিনি সংকট মোকাবিলায় ব্যবসায়ী মহলের কাছ থেকে মানসিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। তার ভাষায়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই বাস্তবতা তিনি নিজেও গভীরভাবে অনুধাবন করেন এবং কারখানা বন্ধ থাকা অবস্থাতেও ব্যাংকঋণের সুদ ও কর্মীদের বেতন পরিশোধের যে চাপ উদ্যোক্তাদের ওপর থাকে, তা তার অজানা নয়।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক ওই আলোচনায় দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতি, তার কারণ এবং আগামী দিনের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আলোচনার শুরুতেই মন্ত্রী নিজের বক্তব্যে একরকম আত্মজিজ্ঞাসার সুরে বলেন, বর্তমান সংকট নিয়ে তিনিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একই রকম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “মিটিংয়ের শুরুতেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে আজকের যে সমস্যাটা, সে সমস্যাটার জন্য আমিসহ সবাই ভোগান্তির মধ্যে আছি।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান সংকট নিয়ে সরকার কোনো দায় এড়িয়ে যেতে চায় না, বরং পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেই তিনি কথা বলছেন।

সমুদ্রে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার বিবরণ

আলোচনায় মন্ত্রী তুলে ধরেন, গভীর সমুদ্রে অবস্থিত একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই মূলত গ্যাস সরবরাহে এই টানাপোড়েনের সূত্রপাত। তার ভাষ্যমতে, এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে, তা সরকারের কল্পনাতেও ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতা এবং এর প্রভাব নিয়ে তিনি নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করেন।

তবে তিনি জানান, দুর্ঘটনার সময় টার্মিনালের কাছাকাছি অবস্থানরত এলএনজিবাহী আরেকটি জাহাজকে দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল বলেই আরও বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে। এই বিষয়টিকে তিনি সংশ্লিষ্টদের তাৎক্ষণিক তৎপরতার ফসল হিসেবে অভিহিত করেন।

দেশে বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ সচল থাকার কথা থাকলেও, তার একটিতে সাম্প্রতিক সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী একধরনের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এখন শুধু আমার দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নাই। আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই।”

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে তোলার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও সময়সাপেক্ষ কাজের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে তাড়াহুড়ো করার তেমন সুযোগ নেই।

সরকারের আন্তরিকতার বার্তা

সংকট মোকাবিলায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, “এ সরকার জনগণের সরকার। জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে বলে আমরা এখানে এসে সরকার গঠন করতে পেরেছি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দিনরাত পরিশ্রম করছে এই সংকট নিরসনে। তার ভাষায়, “উই অল আর ভেরি সিরিয়াস।” অর্থাৎ, সংকট নিরসনে সরকারের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি এ কথাও স্পষ্ট করেন যে, এফএসআরইউ মেরামতের মতো কারিগরি বিষয়াদি এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় নির্ধারণ পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এখন এফএসআরইউ খারাপ হয়ে গেছে। এখানে তো আমি জোরজবরদস্তি করে বলতে পারব না। ইঞ্জিনিয়াররা যেভাবে আমাদেরকে বলবে, সেভাবেই হবে।”

মেরামত ও সরবরাহ পরিস্থিতি

মন্ত্রী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটের মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পরও দুটি বয়লার পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে সচল করতে অন্তত ৭২ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হবে বলে দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা সরকারকে অবহিত করেছেন। তার আশঙ্কা, এই সময়ের মধ্যে গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা শিল্প উৎপাদনে বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

সাময়িক এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে চার কার্গো এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করেছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিকল হয়ে যাওয়া এফএসআরইউ পুনরায় সচল হলে এসব এলএনজি খালাস করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া টার্মিনালের প্রয়োজনীয় তার বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব সরঞ্জাম দেশে পৌঁছানোর পর যাতে দ্রুততম সময়ে শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঘটনাস্থলে পাঠানো যায়, সে জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতোমধ্যে বিশেষ সমন্বয় করা হয়েছে। তার লক্ষ্য, সরঞ্জাম দেশে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যেন তা মেরামতস্থলে পৌঁছে যায়।

উদ্যোক্তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা পুরোদমে চালু রাখতে না পারায় একদিকে যেমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। এর ওপর ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে তারা মন্তব্য করেন।

উদ্যোক্তাদের এসব উদ্বেগের জবাবে মন্ত্রী নিজের অতীত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি জানান, দেশে বেসরকারীকরণ ও শিল্পায়নের সূচনালগ্নে তিনি নিজেও একজন শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তাই শিল্প পরিচালনায় যে চাপ ও প্রতিবন্ধকতা থাকে, তা তার একেবারে অজানা নয়। তিনি বলেন, “আমি তো আপনাদেরই একজন। আপনাদের কষ্টটা আমার চেয়ে বেশি আর কে বোঝে? কারণ আমি জানি, আমরা যখন ইন্ডাস্ট্রি করছি, আমাদের এই ইন্টারেস্টের চাকা কীভাবে ঘুরছে।”

কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ যে থেমে থাকে না, সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সবার ছুটি আছে, কিন্তু ইন্টারেস্টের ছুটি নাই। ছুটির দিনেও ইন্টারেস্ট বাড়তে থাকে।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শিল্পোদ্যোক্তাদের আর্থিক দুর্ভোগের প্রতি নিজের সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

সরকারের অঙ্গীকার

মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী নিজে তিন দফায় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়ে শিল্প খাতের সংকট নিরসনে করণীয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

শিল্প খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইন্ডাস্ট্রি না চললে আমার ইকোনমিক গ্রোথ হবে কই থেকে? সুতরাং আমাদের জন্য শিল্পকে চালায়ে রাখা শিরোধার্য।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে শিল্প উৎপাদন সচল রাখাকেই সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।

তিনি আশ্বাস দেন, শিল্প খাত সচল রাখতে যা যা করণীয়, সরকার তার সবকিছুই করবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের জবাবদিহিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছে এবং জনগণের রায়ই চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, “ইলেকশনে যদি জনগণ না নেয়, আমরা চলে যাব। এটা আমাদের অতীতে রেকর্ডও আছে।”

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

চলমান সংকট সাময়িক হলেও দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি একটি সমস্যা বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতের বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তব্যের শেষভাগে এসে মন্ত্রী আবারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, “এটা আমাদের ক্রিয়েট করার সমস্যা না। কিন্তু সরকার যখন দায়িত্ব নিয়েছি, দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের। সে দায়িত্ব অবহেলা করছি না। আমরা সবাই চেষ্টা করছি অতি দ্রুত যেন আপনাদের সমস্যার সমাধান করতে পারি।”

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে সংকটের উৎস নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন, অন্যদিকে সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেন।

সার্বিক পর্যালোচনা

ামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এই আলোচনাসভায় মন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে যেমন বর্তমান সংকটের প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত কারণ তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি রূপরেখাও উঠে এসেছে। সমুদ্রে অবস্থিত ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং এর পরবর্তী যান্ত্রিক জটিলতা যে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক হলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে, তা মন্ত্রীর বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একই সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে তারা প্রকৃত অর্থেই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, দ্রুত সময়ের মধ্যে এফএসআরইউ মেরামত সম্পন্ন হয়ে স্বাভাবিক সরবরাহ কতটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।

Share this news as a Photo Card