গ্যাস সংকট: তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সমুদ্রে ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাসের ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করায় সরকার এই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে এসব টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি, পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগকারী খোঁজার কাজও চলছে বলে জানান।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ আয়োজিত এক আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে জ্বালানিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক এই আলোচনায় তিনি স্বীকার করেন, গভীর সমুদ্রে একটি এলএনজি টার্মিনালে এভাবে আগুন লাগার বিষয়টি সরকার কল্পনাতেও আনেনি। তাঁর ভাষায়, “এফএসআরইউতে আগুন লেগেছে। লাগার পর থেকেই আমাদের এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।”

মন্ত্রী জানান, ওই দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বড় আকার নিতে পারত। কারণ টার্মিনালের পাশেই এলএনজিবাহী আরেকটি জাহাজ নোঙর করা ছিল। আগুন লাগার পরপরই দ্রুততার সঙ্গে জাহাজটি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, যার ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে।

দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ সচল রয়েছে। এর একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যটি চালু থাকলেও প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিট মেরামতের পর দুটি ইউনিট একযোগে চালু করতে হলে সরবরাহ প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে আগামী দিনগুলোয় গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এই পরিস্থিতি নিয়ে খানিকটা হতাশার সুরেই তিনি বলেন, “এখন শুধু দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই।”

তবে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, লোডশেডিং যতটা সম্ভব কম রাখা এবং শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংকট সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে চার কার্গো এলএনজি কিনেছে বলে জানান তিনি। টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে এসব কার্গো দ্রুত খালাস করে সরবরাহ বাড়ানোর প্রত্যাশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

গত ছয় মাসে সরকার একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দিয়েছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। পাশাপাশি আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “পায়রা, তারপর মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টের জায়গাগুলো নিয়ে আমরা সম্ভাব্যতা যাচাই করছি এবং বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

২০২৯ সালের মধ্যে এসব টার্মিনাল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শুধু নতুন টার্মিনাল বসালেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে না, এর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনও গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান, নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করা হলেও বর্তমান পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহের সুযোগ সীমিত থেকে যাবে। এই সমস্যা সমাধানে সমুদ্রের নিচ দিয়ে নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণ করে তা বাখরাবাদ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন জ্বালানিমন্ত্রী। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাপেক্সকে নতুন কূপ খননের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সংস্থাটির জন্য আরও দুটি রিগ কেনার অর্ডারও দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ভোলার গ্যাস কনটেইনারে করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ৩০টি কনটেইনার ট্রাকের মাধ্যমে গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম নিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে দেশটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে কনটেইনার সরবরাহ করতে হলে সেগুলো চীনে তৈরি করিয়ে আনতে হবে। এই ব্যবস্থা চালু হলে শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাতেও বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা

আলোচনায় জ্বালানিমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ধরন বদলে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকত। কিন্তু বর্তমানে মধ্যরাতেও চাহিদা উচ্চপর্যায়ে থাকছে। তিনি জানান, আগের দিন রাত বারোটার দিকে দেশে প্রায় আঠারো হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড করা হয়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে রাতের বেলা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতাকে দায়ী করেন তিনি।

এসব যানবাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতের বেলা চার্জে বসানো হয়। এই চার্জিংয়ের বড় একটি অংশ চলে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে।” তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের কষ্টের কথা শুনলেন মন্ত্রী

আলোচনা অনুষ্ঠানে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ডিজেল খরচ এবং ব্যাংকঋণের চাপের কথা তুলে ধরেন। জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেও এক সময় শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন, তাই কারখানা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়ার চাপ তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। তাঁর কথায়, “আমি তো আপনাদেরই একজন। আপনাদের কষ্টটা আমার চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে?”

কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ যে থেমে থাকে না এবং শ্রমিকের বেতন যে নিয়মিত দিতে হয়, সে বাস্তবতা স্বীকার করে ব্যবসায়ীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছেন এবং শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে। তিনি বলেন, “শিল্প যদি সচল না থাকে, তাহলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আসবে কোথা থেকে?”

মন্ত্রী আরও জানান, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

বেসরকারি খাতে তেল আমদানির নীতিমালা এখনো হয়নি

অনুষ্ঠানে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে চলমান নানা প্রচারণার বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তেল আমদানির ব্যবসা দেয়নি এবং এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিমালাও এখনো প্রণীত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “নীতিমালা তৈরি হওয়ার আগেই কাউকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যে প্রচারণা চলছে, তা ঠিক নয়।”

মন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত সামগ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সামগ্রিকভাবে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি— উভয় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার, এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে মন্ত্রীর বক্তব্যে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সিলেটে বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার

১২ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

গ্যাস সংকট: তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা

আপডেট সময় ০৩:৩২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সমুদ্রে ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাসের ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করায় সরকার এই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে এসব টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি, পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগকারী খোঁজার কাজও চলছে বলে জানান।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ আয়োজিত এক আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে জ্বালানিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক এই আলোচনায় তিনি স্বীকার করেন, গভীর সমুদ্রে একটি এলএনজি টার্মিনালে এভাবে আগুন লাগার বিষয়টি সরকার কল্পনাতেও আনেনি। তাঁর ভাষায়, “এফএসআরইউতে আগুন লেগেছে। লাগার পর থেকেই আমাদের এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।”

মন্ত্রী জানান, ওই দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বড় আকার নিতে পারত। কারণ টার্মিনালের পাশেই এলএনজিবাহী আরেকটি জাহাজ নোঙর করা ছিল। আগুন লাগার পরপরই দ্রুততার সঙ্গে জাহাজটি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, যার ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে।

দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ সচল রয়েছে। এর একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যটি চালু থাকলেও প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিট মেরামতের পর দুটি ইউনিট একযোগে চালু করতে হলে সরবরাহ প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে আগামী দিনগুলোয় গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এই পরিস্থিতি নিয়ে খানিকটা হতাশার সুরেই তিনি বলেন, “এখন শুধু দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই।”

তবে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, লোডশেডিং যতটা সম্ভব কম রাখা এবং শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংকট সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে চার কার্গো এলএনজি কিনেছে বলে জানান তিনি। টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে এসব কার্গো দ্রুত খালাস করে সরবরাহ বাড়ানোর প্রত্যাশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

গত ছয় মাসে সরকার একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দিয়েছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। পাশাপাশি আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “পায়রা, তারপর মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টের জায়গাগুলো নিয়ে আমরা সম্ভাব্যতা যাচাই করছি এবং বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

২০২৯ সালের মধ্যে এসব টার্মিনাল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শুধু নতুন টার্মিনাল বসালেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে না, এর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইনও গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান, নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করা হলেও বর্তমান পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহের সুযোগ সীমিত থেকে যাবে। এই সমস্যা সমাধানে সমুদ্রের নিচ দিয়ে নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণ করে তা বাখরাবাদ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন জ্বালানিমন্ত্রী। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাপেক্সকে নতুন কূপ খননের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সংস্থাটির জন্য আরও দুটি রিগ কেনার অর্ডারও দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ভোলার গ্যাস কনটেইনারে করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ৩০টি কনটেইনার ট্রাকের মাধ্যমে গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম নিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে দেশটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে কনটেইনার সরবরাহ করতে হলে সেগুলো চীনে তৈরি করিয়ে আনতে হবে। এই ব্যবস্থা চালু হলে শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাতেও বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা

আলোচনায় জ্বালানিমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ধরন বদলে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকত। কিন্তু বর্তমানে মধ্যরাতেও চাহিদা উচ্চপর্যায়ে থাকছে। তিনি জানান, আগের দিন রাত বারোটার দিকে দেশে প্রায় আঠারো হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড করা হয়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে রাতের বেলা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতাকে দায়ী করেন তিনি।

এসব যানবাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতের বেলা চার্জে বসানো হয়। এই চার্জিংয়ের বড় একটি অংশ চলে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে।” তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের কষ্টের কথা শুনলেন মন্ত্রী

আলোচনা অনুষ্ঠানে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ডিজেল খরচ এবং ব্যাংকঋণের চাপের কথা তুলে ধরেন। জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেও এক সময় শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন, তাই কারখানা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়ার চাপ তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। তাঁর কথায়, “আমি তো আপনাদেরই একজন। আপনাদের কষ্টটা আমার চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে?”

কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ যে থেমে থাকে না এবং শ্রমিকের বেতন যে নিয়মিত দিতে হয়, সে বাস্তবতা স্বীকার করে ব্যবসায়ীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছেন এবং শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে। তিনি বলেন, “শিল্প যদি সচল না থাকে, তাহলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আসবে কোথা থেকে?”

মন্ত্রী আরও জানান, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

বেসরকারি খাতে তেল আমদানির নীতিমালা এখনো হয়নি

অনুষ্ঠানে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে চলমান নানা প্রচারণার বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তেল আমদানির ব্যবসা দেয়নি এবং এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিমালাও এখনো প্রণীত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “নীতিমালা তৈরি হওয়ার আগেই কাউকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যে প্রচারণা চলছে, তা ঠিক নয়।”

মন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত সামগ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সামগ্রিকভাবে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি— উভয় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার, এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে মন্ত্রীর বক্তব্যে।

Share this news as a Photo Card