ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর কোডের ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতদিন মূলত বাণিজ্যিক লেনদেনেই সীমাবদ্ধ ছিল এই কিউআর কোড ব্যবস্থা, তবে এবার সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের আর্থিক লেনদেনকেও এর আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি ব্যক্তির জন্য থাকবে নিজস্ব একটি কিউআর কোড, যা স্ক্যান করেই ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবে মুহূর্তেই অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় লেনদেনের ক্ষেত্র হবে বহুমুখী। একজন গ্রাহক চাইলে তার ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি অন্য কারও ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাতে পারবেন। একইভাবে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস হিসাব থেকে অন্য একটি এমএফএস হিসাবেও অর্থ স্থানান্তর করা যাবে নির্বিঘ্নে। শুধু তা-ই নয়, এমএফএস হিসাব থেকে ব্যাংক হিসাবে এবং ব্যাংক হিসাব থেকে এমএফএস হিসাবে—উভয় দিকেই টাকা আদান-প্রদানের সুযোগ থাকবে এই পদ্ধতিতে। ফলে আলাদা আলাদা মাধ্যম ব্যবহারের ঝক্কি ছাড়াই একটিমাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করার পথ খুলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য।
এই সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলা কিউআর কোড অ্যাপে যুক্ত থাকবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার তথা পিএসপি, পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটর তথা পিএসও এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ। অর্থাৎ দেশের প্রায় সব ধরনের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এই একক প্ল্যাটফর্মের অধীনে চলে আসবে, যা আর্থিক খাতে ডিজিটাল লেনদেনের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী ১ নভেম্বরের মধ্যে এই অ্যাপ চালুর লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অ্যাপটি তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এমএফএস সেবাদাতাদের কাছে এখন স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে গেছে যে, আসছে নভেম্বরের মধ্যেই তাদের এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তুতি সেরে ফেলতে হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলা কিউআর কোডের এই যাত্রা একেবারে নতুন নয়। এর আগে গত জুলাই মাস থেকেই বাণিজ্যিক পর্যায়ে বাংলা কিউআর কোড দিয়ে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকে দেশের সব মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এখন নিয়মিতভাবে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করেই লেনদেন পরিচালনা করছে। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেনে এই কোড সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন একটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরবর্তী ধাপ হিসেবে, যা বাণিজ্যিক লেনদেনের সাফল্যের ধারাবাহিকতাতেই নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগৃহীত তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৩৫ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয়, দেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা কতটা দ্রুত বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত জুন মাসে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে কিউআর কোড ব্যবহার করে মোট ৭০৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। অথচ ছয় মাস আগের হিসাব বলছে, তখন এই অঙ্ক ছিল ৬৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানেই লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ছেষট্টি কোটি টাকার বেশি, যা এই প্রযুক্তির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ও ব্যবহার বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তি পর্যায়ে বাংলা কিউআর কোডের এই সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে। বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে টাকা পাঠাতে হলে গ্রাহকদের হিসাব নম্বর, মোবাইল নম্বর কিংবা অন্যান্য তথ্য মনে রাখতে হয় বা সংগ্রহ করতে হয়, যা অনেক সময় ভুলের ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু কিউআর কোডভিত্তিক এই ব্যবস্থা চালু হলে কেবল একটি কোড স্ক্যান করেই নির্ভুলভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে অর্থ আদান-প্রদান সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ হবে, তেমনি ভুল হিসাবে টাকা চলে যাওয়ার মতো সমস্যাও অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যারা এখনো নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্যও এই ব্যবস্থা হতে পারে একটি সহজ বিকল্প। একইসঙ্গে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেনের ক্ষেত্রেও তৈরি হবে একটি অভিন্ন ও সমন্বিত কাঠামো, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্যই ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজন হবে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও। কারণ ব্যক্তি পর্যায়ে নতুন কোনো প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও আস্থা তৈরি হওয়াটা জরুরি। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে আগামী নভেম্বরে এই অ্যাপ পুরোপুরি চালু হলে দেশের আর্থিক লেনদেনের ধরনে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্যিক পর্যায়ে সাফল্যের পর ব্যক্তি পর্যায়েও বাংলা কিউআর কোডের এই বিস্তৃতি দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















