শিরোনাম :

তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত,দিল্লিকে কঠিন শর্ত: নেপথ্যে ‘অবিশ্বাস’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আপাতত থমকে গেছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি চলছিল, শেষ মুহূর্তে এসে তা ভেস্তে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার দেওয়া কয়েকটি কঠোর শর্ত। ভারতের পক্ষ থেকে আগ্রহ ও উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও এসব শর্তের কারণে সফর আয়োজন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, আর তা দিল্লির কূটনৈতিক মহলে তৈরি করেছে এক ধরনের বিস্ময়।

ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ভারত প্রথমে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আসন্ন সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু ঢাকা সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের আগ্রহ ছিল বরং একটি সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সফরের দিকে, যেখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ থাকবে। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনাগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর ভারত দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং চলতি অগাস্ট মাসেই একটি দ্বিপাক্ষিক সফর আয়োজনের উদ্যোগ নেয়।

তবে প্রস্তুতি যখন এগিয়ে চলছিল, তখনই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রেস ব্রিফিংকে ঘিরে। সেখানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্য ঢাকাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং বাংলাদেশ সরকার এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়— যাকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বর্ণনা করেছেন ‘নজিরবিহীন’ বলে।

দিনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা সফর ও নতুন গতি

বাংলাদেশের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কয়েক দিন পরই, গত ১০ অগাস্ট, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। পরদিন দিনেশ ত্রিবেদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকে বাংলাদেশের মনোভাবের কথা জানান এবং পরবর্তীতে দিল্লির নির্দেশনা নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।

এরপরই নতুন করে গতি পায় দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রক্রিয়া। দুই দেশের গণমাধ্যমে তখন সফরের সম্ভাব্য তারিখ পর্যন্ত আলোচিত হতে শুরু করে। মনে করা হচ্ছিল, দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে চলেছে।

কিন্তু ঠিক তখনই, গত রোববার, ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে নতুন মোড় নেয় পুরো পরিস্থিতি। সেখানে ভারত সফরের আগে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির কথা বলা হয়, যার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি শর্ত।

বাংলাদেশের যে দুই শর্ত

গত রোববারের ওই ব্রিফিংয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম। লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, ভারত সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য মূলত দুটি বিষয় সামনে আনা হয়েছে।

প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। দ্বিতীয়ত, শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, এই দুটি শর্তের কথা ইতিমধ্যে ভারতকে জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে।

দিল্লিতে বিস্ময়, ঢাকায় প্রশ্ন

সফরের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের এই শর্ত ভারতে একধরনের বিস্ময় তৈরি করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “শর্তগুলো তো কঠিন। এটা সবাই বলছে। কিন্তু এই শর্ত রাখাটা নিয়েই বরং আমাদের এখানে বিস্ময়টা দেখা যাচ্ছে।” তার মতে, এই শর্তগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “এখানে যেসব শর্ত আছে, এর সবটাই ভারতের জানা। কিন্তু এগুলোকে যে শর্ত হিসেবে রেখে বলা হবে যে, এগুলো না হলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটা হবে না বা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না, অসুবিধাটা ভারতের এখানেই। এখানে যেটা দরকার ছিল যে, দু’দেশের মধ্যে কথা হওয়া। কারণ কথা তো বলতেই হবে। সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি হতো, ততো ভালো হতো। এখন জটিলতা আরও বাড়ল।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তাদের আগের অবস্থানের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছে— বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের ‘পর্যালোচনায়’ রয়েছে। এর মূল বার্তা হলো, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সহসাই ঘটছে না, অর্থাৎ ভারত তার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে।

ভারতের অনড় অবস্থান কি অস্বাভাবিক?

ভারতের এই অবস্থান আসলে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ভারত শর্তে রাজি হয়ে সহজেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেবে— এমনটা প্রথম থেকেই খুব কম বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন। অতীতে ভারত অনেক রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের জোর করে ফেরত পাঠানো হয়নি। তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামার মতো অনেকে বহু বছর ধরে সেদেশে অবস্থান করছেন।

ফলে ভারত যখন তার আগের অবস্থান বজায় রাখল, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— বাংলাদেশের দেওয়া শর্ত আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত ছিল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের দেশ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো একসময় যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ে ছিলেন। তাই বলে কি বাংলাদেশ কখনো ব্রিটিশ সরকারকে বলেছে যে, আপনার সঙ্গে আমি আলোচনা করব না, যতদিন তাকে ফেরত না দেওয়া হয়! এটা কি হতে পারে! কানাডায় গিয়ে কখনো বলেছে? সেখানেও তো অনেকে আছে। আমেরিকাতেও তো অনেকে আছে। কিন্তু বলে দেওয়া যে, এর জন্য যাবোই না, বসবোও না— এটা তো হলো না।”

তিনি যোগ করেন, “আমাদের তো অনেক ইস্যু আছে। না বসে তো উপায় নেই। আমি যদি ওটা ধরেই থাকি, তাহলে পানি নিয়ে যে আলোচনা, সেটার কী হবে? সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, সেটার কী হবে? জ্বালানি, সেটার কী হবে?”

অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, যে সময়ের মধ্যে সফরের বিষয়টি আয়োজিত হওয়ার কথা চলছিল, সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ করা আদৌ সম্ভব কিনা, তা বিবেচনা করার সুযোগ ঢাকার ছিল।

কঠোর শর্তের পেছনে তিনটি ব্যাখ্যা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের হঠাৎ এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মূলত তিনটি ব্যাখ্যা ঘুরেফিরে সামনে আসছে।

প্রথমত, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনরায় ফিরে আসার চেষ্টা। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দল মূলত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দলের প্রধান শেখ হাসিনাও পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম।

দলটি দেশের রাজনীতিতে এখন কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দলটি আবারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে, আর সেই চেষ্টাটি চলছে ভারতের মাটি থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার এই বিষয়টিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে।

একই সঙ্গে, শেখ হাসিনার এই প্রেস ব্রিফিং বা এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার পেছনে ভারত সরকারের কোনো সমর্থন আছে কি না, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ রয়েছে ঢাকার মধ্যে। যদিও ভারত সরকার এই ধরনের যেকোনো যোগসূত্রের কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।

হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ভূমিকায় ‘অবিশ্বাস’

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সরকারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দেশটির ভেতরে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করছে।

গত ৮ অগাস্ট বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকার এক অনুষ্ঠানে দিল্লিকে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলার বিষয়ে সরাসরি সতর্ক করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের (ভারতের) সঙ্গে সম্পর্ক রাখব। তার মানে এই নয় যে আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও চাইবেন। এই দুটো বিষয় একেবারেই বিপরীতমুখী।”

ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের এই সংশয়ই এখন দ্বিপাক্ষিক সফরের আগে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ আগে এই বিষয়েরই সুরাহা চাইছে— অর্থাৎ সম্পর্কের নতুন খেলা শুরুর আগে সেই খেলার নিয়ম নির্ধারণ করে নিতে চাইছে ঢাকা।

এম হুমায়ুন কবীর এ প্রসঙ্গে বলেন, “যেহেতু উনি (শেখ হাসিনা) ব্যক্তি হিসেবে একজন, কিন্তু তার পাশাপাশি উনার সংগঠন আছে। উনার সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আছে। এই সবগুলো বিষয় একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। যেহেতু আমরা সেই সম্পর্ক থেকে সরে এসে সম্পর্কের একটা পুনর্বিন্যাস করতে চাচ্ছি, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।”

তার মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখন শেখ হাসিনা একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে শেখ হাসিনার উপস্থিতি, তার দলের সংশ্লিষ্টতা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস— সবগুলো বিষয়ই এখানে জড়িয়ে আছে।”

সার্বভৌম সমতা ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’

শুধু প্রত্যর্পণের শর্তেই থেমে থাকেনি ঢাকার বিবৃতি। সেখানে আরও কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে— যেমন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।

এসবের অর্থ কী, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এম হুমায়ুন কবীর বলেন, “এটাকে বলতে পারেন এক ধরনের পুনর্বিন্যাস, বা রিসেট করতে হচ্ছে সম্পর্কটাকে। কারণ বাংলাদেশ এখন বলছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। তার অর্থ হচ্ছে, আমি কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না। এরকম চিন্তা-ভাবনা থেকেই আমরা একটা নতুন বাস্তবতার দিকে এগোতে চাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের দিক থেকে এ ব্যাপারে হয়তো তারাও চিন্তা-ভাবনা করছে। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করলেই তো হবে না। এটাকে বাস্তব একটা জায়গায় আনার জন্য দুই পক্ষের আলাপ-আলোচনা দরকার। এর জন্য আবার যথেষ্ট প্রস্তুতিও দরকার।”

সম্পর্ক কি সত্যিই জটিলতার দিকে যাচ্ছে?

এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে হঠাৎ একটি শীর্ষ বৈঠকের চেয়ে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্বিন্যাস করাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সেটি নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবিশ্বাসও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

কিন্তু এর ফলে সফর অনিশ্চিত হয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সত্যিই জটিলতার দিকে যাচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। তবে সম্পর্কে এখনই কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, কিংবা সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই— বিশ্লেষকরা তেমনটা মনে করছেন না।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “আমি সবসময় মনে করি যে, এখানে যে রাজনীতিটা আছে, সেটা সেভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। হ্যাঁ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিবেচনায় থাকবে, কিন্তু সেটাই সব নয়। ভারতকে রাজনীতির ভাষা দিয়েই বোঝানোর দরকার যে, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে কারণ ভারত এখানে একটি বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে, জনগণের সঙ্গে নয়। এটাই ভারতকে বোঝাতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এর জন্য শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক আটকে যাবে। কথা হবে না, আলোচনা হবে না— এমনটা হতে পারে না।”

অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তার মতে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলে তাতে কোনো পক্ষেরই লাভ হবে না। তিনি বলেন, “এটা কি হতে পারে যে, ভারত আর বাংলাদেশ কথাই বলবে না? এটা তো হতে পারে না। মি. রহমান ভারতে এলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে আলাপটা হতো, সেটার তো আর কোনো বিকল্প হতে পারে না। সামনাসামনি দেখা করাটা একটা ভিন্ন অর্থ বহন করে। সেটা না হলে সম্পর্ক কীভাবে এগোবে? সুতরাং এখানে দু’পক্ষের অনেক বক্তব্য আছে। সামনাসামনি বসলেই এগুলোর সমাধান সম্ভব।”

সামনের পথ

বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে হলেও শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সরাসরি সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। এমন একটি সরাসরি বৈঠক হলেই কেবল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব পথ বের হতে পারে।

তবে একবার সফর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর, এই সফরকে ঘিরে ঢাকার দেওয়া শর্ত এবং সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তার সুরাহা কীভাবে হয়— আগামী দিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি অনেকখানি নির্ভর করছে তার ওপরই। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় আপাতত সফরের সম্ভাবনা অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে, আর তার সঙ্গে অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সময়সীমাও।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল

২১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত,দিল্লিকে কঠিন শর্ত: নেপথ্যে ‘অবিশ্বাস’

আপডেট সময় ০১:৫৪:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আপাতত থমকে গেছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি চলছিল, শেষ মুহূর্তে এসে তা ভেস্তে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার দেওয়া কয়েকটি কঠোর শর্ত। ভারতের পক্ষ থেকে আগ্রহ ও উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও এসব শর্তের কারণে সফর আয়োজন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, আর তা দিল্লির কূটনৈতিক মহলে তৈরি করেছে এক ধরনের বিস্ময়।

ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ভারত প্রথমে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আসন্ন সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু ঢাকা সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের আগ্রহ ছিল বরং একটি সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সফরের দিকে, যেখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ থাকবে। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনাগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর ভারত দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং চলতি অগাস্ট মাসেই একটি দ্বিপাক্ষিক সফর আয়োজনের উদ্যোগ নেয়।

তবে প্রস্তুতি যখন এগিয়ে চলছিল, তখনই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি প্রেস ব্রিফিংকে ঘিরে। সেখানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্য ঢাকাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং বাংলাদেশ সরকার এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়— যাকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বর্ণনা করেছেন ‘নজিরবিহীন’ বলে।

দিনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা সফর ও নতুন গতি

বাংলাদেশের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কয়েক দিন পরই, গত ১০ অগাস্ট, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। পরদিন দিনেশ ত্রিবেদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকে বাংলাদেশের মনোভাবের কথা জানান এবং পরবর্তীতে দিল্লির নির্দেশনা নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।

এরপরই নতুন করে গতি পায় দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রক্রিয়া। দুই দেশের গণমাধ্যমে তখন সফরের সম্ভাব্য তারিখ পর্যন্ত আলোচিত হতে শুরু করে। মনে করা হচ্ছিল, দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে চলেছে।

কিন্তু ঠিক তখনই, গত রোববার, ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে নতুন মোড় নেয় পুরো পরিস্থিতি। সেখানে ভারত সফরের আগে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির কথা বলা হয়, যার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি শর্ত।

বাংলাদেশের যে দুই শর্ত

গত রোববারের ওই ব্রিফিংয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম। লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, ভারত সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য মূলত দুটি বিষয় সামনে আনা হয়েছে।

প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। দ্বিতীয়ত, শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, এই দুটি শর্তের কথা ইতিমধ্যে ভারতকে জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে।

দিল্লিতে বিস্ময়, ঢাকায় প্রশ্ন

সফরের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের এই শর্ত ভারতে একধরনের বিস্ময় তৈরি করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতরেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “শর্তগুলো তো কঠিন। এটা সবাই বলছে। কিন্তু এই শর্ত রাখাটা নিয়েই বরং আমাদের এখানে বিস্ময়টা দেখা যাচ্ছে।” তার মতে, এই শর্তগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “এখানে যেসব শর্ত আছে, এর সবটাই ভারতের জানা। কিন্তু এগুলোকে যে শর্ত হিসেবে রেখে বলা হবে যে, এগুলো না হলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটা হবে না বা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না, অসুবিধাটা ভারতের এখানেই। এখানে যেটা দরকার ছিল যে, দু’দেশের মধ্যে কথা হওয়া। কারণ কথা তো বলতেই হবে। সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি হতো, ততো ভালো হতো। এখন জটিলতা আরও বাড়ল।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তাদের আগের অবস্থানের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছে— বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের ‘পর্যালোচনায়’ রয়েছে। এর মূল বার্তা হলো, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সহসাই ঘটছে না, অর্থাৎ ভারত তার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে।

ভারতের অনড় অবস্থান কি অস্বাভাবিক?

ভারতের এই অবস্থান আসলে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ভারত শর্তে রাজি হয়ে সহজেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেবে— এমনটা প্রথম থেকেই খুব কম বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন। অতীতে ভারত অনেক রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের জোর করে ফেরত পাঠানো হয়নি। তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামার মতো অনেকে বহু বছর ধরে সেদেশে অবস্থান করছেন।

ফলে ভারত যখন তার আগের অবস্থান বজায় রাখল, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— বাংলাদেশের দেওয়া শর্ত আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত ছিল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের দেশ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো একসময় যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ে ছিলেন। তাই বলে কি বাংলাদেশ কখনো ব্রিটিশ সরকারকে বলেছে যে, আপনার সঙ্গে আমি আলোচনা করব না, যতদিন তাকে ফেরত না দেওয়া হয়! এটা কি হতে পারে! কানাডায় গিয়ে কখনো বলেছে? সেখানেও তো অনেকে আছে। আমেরিকাতেও তো অনেকে আছে। কিন্তু বলে দেওয়া যে, এর জন্য যাবোই না, বসবোও না— এটা তো হলো না।”

তিনি যোগ করেন, “আমাদের তো অনেক ইস্যু আছে। না বসে তো উপায় নেই। আমি যদি ওটা ধরেই থাকি, তাহলে পানি নিয়ে যে আলোচনা, সেটার কী হবে? সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, সেটার কী হবে? জ্বালানি, সেটার কী হবে?”

অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, যে সময়ের মধ্যে সফরের বিষয়টি আয়োজিত হওয়ার কথা চলছিল, সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ করা আদৌ সম্ভব কিনা, তা বিবেচনা করার সুযোগ ঢাকার ছিল।

কঠোর শর্তের পেছনে তিনটি ব্যাখ্যা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের হঠাৎ এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মূলত তিনটি ব্যাখ্যা ঘুরেফিরে সামনে আসছে।

প্রথমত, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনরায় ফিরে আসার চেষ্টা। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দল মূলত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দলের প্রধান শেখ হাসিনাও পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম।

দলটি দেশের রাজনীতিতে এখন কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দলটি আবারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে, আর সেই চেষ্টাটি চলছে ভারতের মাটি থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার এই বিষয়টিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে।

একই সঙ্গে, শেখ হাসিনার এই প্রেস ব্রিফিং বা এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার পেছনে ভারত সরকারের কোনো সমর্থন আছে কি না, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ রয়েছে ঢাকার মধ্যে। যদিও ভারত সরকার এই ধরনের যেকোনো যোগসূত্রের কথা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।

হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ভূমিকায় ‘অবিশ্বাস’

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সরকারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দেশটির ভেতরে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করছে।

গত ৮ অগাস্ট বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকার এক অনুষ্ঠানে দিল্লিকে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলার বিষয়ে সরাসরি সতর্ক করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের (ভারতের) সঙ্গে সম্পর্ক রাখব। তার মানে এই নয় যে আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও চাইবেন। এই দুটো বিষয় একেবারেই বিপরীতমুখী।”

ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের এই সংশয়ই এখন দ্বিপাক্ষিক সফরের আগে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ আগে এই বিষয়েরই সুরাহা চাইছে— অর্থাৎ সম্পর্কের নতুন খেলা শুরুর আগে সেই খেলার নিয়ম নির্ধারণ করে নিতে চাইছে ঢাকা।

এম হুমায়ুন কবীর এ প্রসঙ্গে বলেন, “যেহেতু উনি (শেখ হাসিনা) ব্যক্তি হিসেবে একজন, কিন্তু তার পাশাপাশি উনার সংগঠন আছে। উনার সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আছে। এই সবগুলো বিষয় একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। যেহেতু আমরা সেই সম্পর্ক থেকে সরে এসে সম্পর্কের একটা পুনর্বিন্যাস করতে চাচ্ছি, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।”

তার মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখন শেখ হাসিনা একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে শেখ হাসিনার উপস্থিতি, তার দলের সংশ্লিষ্টতা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস— সবগুলো বিষয়ই এখানে জড়িয়ে আছে।”

সার্বভৌম সমতা ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’

শুধু প্রত্যর্পণের শর্তেই থেমে থাকেনি ঢাকার বিবৃতি। সেখানে আরও কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে— যেমন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।

এসবের অর্থ কী, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এম হুমায়ুন কবীর বলেন, “এটাকে বলতে পারেন এক ধরনের পুনর্বিন্যাস, বা রিসেট করতে হচ্ছে সম্পর্কটাকে। কারণ বাংলাদেশ এখন বলছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। তার অর্থ হচ্ছে, আমি কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না। এরকম চিন্তা-ভাবনা থেকেই আমরা একটা নতুন বাস্তবতার দিকে এগোতে চাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের দিক থেকে এ ব্যাপারে হয়তো তারাও চিন্তা-ভাবনা করছে। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করলেই তো হবে না। এটাকে বাস্তব একটা জায়গায় আনার জন্য দুই পক্ষের আলাপ-আলোচনা দরকার। এর জন্য আবার যথেষ্ট প্রস্তুতিও দরকার।”

সম্পর্ক কি সত্যিই জটিলতার দিকে যাচ্ছে?

এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে হঠাৎ একটি শীর্ষ বৈঠকের চেয়ে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্বিন্যাস করাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সেটি নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবিশ্বাসও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

কিন্তু এর ফলে সফর অনিশ্চিত হয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সত্যিই জটিলতার দিকে যাচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। তবে সম্পর্কে এখনই কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, কিংবা সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই— বিশ্লেষকরা তেমনটা মনে করছেন না।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “আমি সবসময় মনে করি যে, এখানে যে রাজনীতিটা আছে, সেটা সেভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। হ্যাঁ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিবেচনায় থাকবে, কিন্তু সেটাই সব নয়। ভারতকে রাজনীতির ভাষা দিয়েই বোঝানোর দরকার যে, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে কারণ ভারত এখানে একটি বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে, জনগণের সঙ্গে নয়। এটাই ভারতকে বোঝাতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এর জন্য শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক আটকে যাবে। কথা হবে না, আলোচনা হবে না— এমনটা হতে পারে না।”

অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তার মতে, কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলে তাতে কোনো পক্ষেরই লাভ হবে না। তিনি বলেন, “এটা কি হতে পারে যে, ভারত আর বাংলাদেশ কথাই বলবে না? এটা তো হতে পারে না। মি. রহমান ভারতে এলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে আলাপটা হতো, সেটার তো আর কোনো বিকল্প হতে পারে না। সামনাসামনি দেখা করাটা একটা ভিন্ন অর্থ বহন করে। সেটা না হলে সম্পর্ক কীভাবে এগোবে? সুতরাং এখানে দু’পক্ষের অনেক বক্তব্য আছে। সামনাসামনি বসলেই এগুলোর সমাধান সম্ভব।”

সামনের পথ

বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে হলেও শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সরাসরি সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। এমন একটি সরাসরি বৈঠক হলেই কেবল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব পথ বের হতে পারে।

তবে একবার সফর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর, এই সফরকে ঘিরে ঢাকার দেওয়া শর্ত এবং সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তার সুরাহা কীভাবে হয়— আগামী দিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি অনেকখানি নির্ভর করছে তার ওপরই। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় আপাতত সফরের সম্ভাবনা অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে, আর তার সঙ্গে অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সময়সীমাও।

Share this news as a Photo Card