যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া বাস থামানো ঠেকাতে রাজধানীর রাস্তায় নেমেছেন বাস মালিক ও শ্রমিকরা। রোববার (১১ অক্টোবর) থেকে ঢাকার প্রায় ২০টি পয়েন্টে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির উদ্যোগে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মাঠে কারা, কোথায়
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, ইসিবি চত্বর, কাওরানবাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন ও মতিঝিলে মালিক-শ্রমিকদের সমন্বয়ে আলাদা দল কাজ করছে। গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকাতেও তাদের তৎপরতা দেখা গেছে। সমিতির নেতারা বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে কার্যক্রম পরিদর্শন করছেন।
শাহবাগ মোড়ে কমলা রঙের ভেস্ট পরা কয়েকজনকে লাঠি হাতে চালকদের সিগন্যাল দিতে দেখা গেছে। ভেস্টের পেছনে লেখা ছিল ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নাম। তাদের একজন নিজেকে বাস মালিক পরিচয় দিয়ে বলেন, চালক ও হেল্পারদের বহুবার যত্রতত্র বাস না থামাতে বলা হলেও তারা কথা শোনেননি। তাই মালিকরা নিজেরাই নেমেছেন।
সকালে সমিতির নির্দেশনায় গ্লাস ভাঙা, রং নষ্ট ও ফিটনেসবিহীন বাসের মালিক-চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান গুলিস্তান বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর শিকদার, যিনি ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতিও। সঙ্গে ছিলেন টার্মিনাল মালিক সমিতির সদস্য সচিব আলমগীর কবির। একই নির্দেশনায় যানজট কমাতে কালসি মোড় পরিদর্শন করেন মিরপুর আঞ্চলিক মালিক সমিতির আহ্বায়ক এস এম সোহরাব হোসেন।
সমিতির বক্তব্য
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এ এস এম আহাম্মেদ খোকন জানান, মালিকরা নিজেরা বসেই নিজেদের বাস নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল বাস স্টপেজে দাঁড়ায় না। চালকদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে, যাত্রীদেরও স্টপেজ থেকে ওঠানামা করতে বলা হচ্ছে।
খোকন আরও বলেন, কার্যক্রম আপাতত ২০টি পয়েন্টে শুরু হয়েছে। কত দিন চালানো যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে শৃঙ্খলা না আসা পর্যন্ত চেষ্টা চলবে। তিনি নিজে সকাল আটটা থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান করছেন বলেও জানান।
প্রেক্ষাপট: মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ও সাত সিদ্ধান্ত
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি বাস কোম্পানির মালিক ও সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা এবং ফিটনেস ও আইন মানার বিষয়ে অপারেটরদের দায়িত্ব নিয়ে ঐকমত্য হয়।
বাস মালিকদের বরাতে জানা গেছে, ওই বৈঠকে সাতটি সিদ্ধান্ত হয়েছে:
১. ঢাকায় বাস চলবে কোম্পানির মাধ্যমে। সরকার কোনো ব্যক্তি বা একক মালিকের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা বা লেনদেন করবে না, জবাবদিহি থাকবে সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে।
২. ফিটনেস না থাকা, শৃঙ্খলা ভাঙা বা আইন অমান্য করার দায় বহন করবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। আইন ভাঙলে ওই মালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং তাঁর বাসের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩. বাস কাউন্টারে অতিরিক্ত বুকিং, ট্রিপভিত্তিক চাঁদাসহ যেকোনো অনৈতিক অর্থ আদায় বন্ধে উদ্যোগ নেবে মালিক সমিতি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা ও চালকদের আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির রুট পারমিট বাতিল করে সরকারি উদ্যোগে নতুন কোম্পানি বা বিকল্প ব্যবস্থা আনা হবে।
৪. মালিকরা আগামী দুই মাসের মধ্যে ঢাকায় চলাচলকারী সব বাসের মেরামত ও ডেন্টিং-পেন্টিং শেষ করবেন। তদারকি করবে সমিতি। কাজ শেষ না হলে ওই বাস চলতে পারবে না।
৫. পুলিশের পাশাপাশি সমিতি সড়ক বা এলাকাভিত্তিক দল গঠন করে আইন লঙ্ঘনকারী ও পারমিটবিহীন বাস ঠেকাবে।
৬. সব বাস কাউন্টারভিত্তিক চালানোর উদ্যোগ নেবে সমিতি এবং স্টপেজে থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করবে।
৭. মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের নিয়ে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা নিয়ে বৈঠক করবে।
গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানে এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাস মালিক সমিতিকে।
জ্যামের ক্ষতি
বিশ্বব্যাংকের একটি পুরনো হিসাবে ঢাকায় জ্যামে দিনে প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। নগর পরিকল্পনাবিদদের ধারণা, এখন তা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। তাঁদের হিসাবে বছরে ক্ষতি ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এস কে চন্দন, ঢাকা 





















