শিরোনাম :
সৌদিতে হুথি হামলার শঙ্কায় আক্রান্ত এশিয়ান কাপ আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে ভয় দেখাতেন ‘সমন্বয়ক’,৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি চরশৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজে ১৯ শিক্ষক কর্মরত, এইচএসসিতে ২৪ শিক্ষার্থীর সবাই ফেল সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৮০ লাখ টাকা ঘুষ চেয়ে দুদকের ফাঁদে লালবাগের সার্ভেয়ার আটক গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে আসছে ৩–৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ: প্রধানমন্ত্রী আইনি ও আনুপাতিক হতে হবে পুলিশের বলপ্রয়োগ: তথ্য উপদেষ্টা ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে উত্তাল আশুলিয়া, মিরপুর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মজুরি বোর্ড গঠনের পরও উত্তাল শিল্পাঞ্চল, কারখানা বন্ধ কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নার্সের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে ভয় দেখাতেন ‘সমন্বয়ক’,৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি

রাজধানীর গুলশানে সাবেক এক নারী সংসদ সদস্যের বাসায় গিয়ে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে স্বামীকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলায় ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র তৈরি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযুক্তরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় অভিযান চালানো হয়। সাবেক এমপি শাম্মী আহম্মেদকে না পেয়ে পুলিশ চলে যায়। কিছুক্ষণ পর অভিযুক্তদের দুজন আবার সেই বাসায় ফিরে এসে তাঁর স্বামীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। দাবি করা ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ আদায় হয়। বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন পাঁচজন, পরে গ্রেপ্তার হন আরও একজন।

মামলার সূত্রপাত

মামলাটি হয়েছে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই, গুলশান থানায়। বাদী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫) গুলশান-২–এর ৮৩ নম্বর সড়কের একটি বাসায় থাকেন। তদন্তের নথি অনুযায়ী, শাম্মী আহম্মেদ তাঁর স্ত্রী। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেছুর রহমান। পরে দায়িত্ব যায় পিবিআইয়ের হাতে। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহম্মেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন।

পিবিআইয়ের ভাষ্য

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। সেই পরিচয়ের সুযোগে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও অবস্থানের তথ্য দিয়ে সহায়তার নামে পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন তাঁরা। এরপর বিভিন্ন মানুষকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করেছেন বলে জানা যায়।

অভিযানের রাত

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে খবর আসে, শাম্মী আহম্মেদ গুলশানের বাসায় আছেন। এ খবরে কয়েকজন নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। রাত আনুমানিক দুইটার দিকে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযানের ব্যবস্থা নিতে বলেন। থানা-পুলিশ বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে জানায়।

১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ সদস্য ওই বাসায় যান। সঙ্গে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন, আমিনুল ইসলামসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন। তাঁরা নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কক্ষে সাবেক এমপিকে খোঁজেন। তাঁকে পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তল্লাশির একটি তালিকা তৈরি করে সবাই বাসা ছেড়ে যান।

ফিরে এসে ভয় দেখানো

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার ওই বাসায় যান। তাঁরা বাদীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান এবং তা এড়াতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। ভয়ে বাদী টাকা দিতে রাজি হন। তখনই ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে আসামিরা চলে যান। টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে।

১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুজন আবার বাসায় যান। ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলেও কেউ দরজা খোলেননি, তাঁরা ফিরে যান। পরে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে ওই সময় ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বলে জানায় পিবিআই।

বাকি টাকা নিতে গিয়ে ধরা

২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আসামিরা আবার বাসার সামনে আসেন। বাদী তখন বাসায় ছিলেন না। নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোনে তাঁকে জানালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেন। পুলিশ দ্রুত পৌঁছে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে যান। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতে স্বীকারোক্তি

গ্রেপ্তারদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। নথি অনুযায়ী, দুজনই টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি, তিনি বিভিন্ন সময়ে ‘ফ্যাসিবাদী লোকজন’ গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহায়তা করেছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, অভিযানে শাম্মীকে না পেয়ে ফেরার সময় অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন, যাতে লেখা ছিল ‘শাম্মি ইয়ারপড’। সেটি ফেরত দেওয়ার কথা বলে সকাল ১০টার দিকে তাঁরা আবার বাসায় যান। অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে ভেতরে ঢোকেন। এরপর বাদীকে বলা হয়, তাঁরা বুঝতে পারছেন স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হলেও বাদী ১০ লাখ টাকার প্রস্তাব দিলে তাঁরা রাজি হন। সেই টাকা নিয়ে সমান ভাগ করে নেওয়া হয়।

বাকি টাকার প্রসঙ্গে রিয়াদের ভাষ্য, ২৬ জুলাই বিকেল ৫টায় তিনি ইব্রাহিম, সিয়াম ও সাদমানকে বাসায় পাঠান। তাঁর দাবি, পুলিশই তাঁকে ফাঁদে ফেলতে বাসায় যেতে বলেছিল। জবানবন্দির শেষে তিনি বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’

অপুর জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে ফের বাসায় গেলে বাদী প্রথমে ৫ লাখ টাকা দিতে চান, রিয়াদ চান এক কোটি। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখে রফা হয় এবং ১০ লাখ দেওয়া হয়। এরপর রিয়াদের বাড্ডার বাসায় গিয়ে পাঁচ লাখ করে ভাগ করে নেওয়া হয়। নিজের অংশ থেকে ৩ লাখ ৭ হাজার টাকায় তিনি একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন, কিছু টাকা ধার শোধে খরচ করেন। আরও ৫০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে গিয়ে ভুল নম্বরে চলে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। অপুর দাবি, বাকি টাকা আদায়ের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে পিবিআইয়ের ভাষ্য, তিনি সেখানে ছিলেন এবং পালিয়ে যান।

জব্দ করা জিনিস

নথি অনুযায়ী, রাজ্জাকের দেখানো পূর্ব বাড্ডার বৈঠাকালী এলাকার একটি বাসা থেকে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। ফোনগুলোর মধ্যে ছিল একটি রেডমি নোট ১০ প্রো ও দুটি আইফোন ১৩। অপুর দেওয়া তথ্যে মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার একটি বাসার গ্যারেজ থেকে মোটরসাইকেলটি, একটি আইফোন ১১ ও নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ হয়।

কোন আসামির বিরুদ্ধে কোন ধারা

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ ও জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আসামিদের একজন শিশু হওয়ায় তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে। আগামী ১০ নভেম্বর মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে, ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হওয়ার কথা। ছয় আসামিই এখন জামিনে। তবে ১ নভেম্বর পর্যন্ত থানার জিআরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি এখনো আদালতে জমা পড়েনি।

রিয়াদের আইনজীবী আকরাম হোসাইন বলেন, তাঁরা এখনো অভিযোগপত্র দেখেননি এবং রিয়াদের পক্ষে আদালতে আবেদন করবেন। রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর নম্বরটি এখন ব্যবহার করছেন বড় ভাই মো. রেজাউল করিম, যিনি জানান, রিয়াদ এখনই এ বিষয়ে কথা বলতে চান না।

মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পরিচয়দাতা রিয়াদই এই চাঁদাবাজির হোতা। তাঁকে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগপত্রে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থার কথা বলেন। বাদীর আইনজীবী জহুরুল আলম জানান, সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট; তাঁরা ন্যায়বিচার চান।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদিতে হুথি হামলার শঙ্কায় আক্রান্ত এশিয়ান কাপ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নার্সের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

০২ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে ভয় দেখাতেন ‘সমন্বয়ক’,৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি

আপডেট সময় ০৪:২৭:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

রাজধানীর গুলশানে সাবেক এক নারী সংসদ সদস্যের বাসায় গিয়ে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে স্বামীকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলায় ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র তৈরি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযুক্তরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রথমে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় অভিযান চালানো হয়। সাবেক এমপি শাম্মী আহম্মেদকে না পেয়ে পুলিশ চলে যায়। কিছুক্ষণ পর অভিযুক্তদের দুজন আবার সেই বাসায় ফিরে এসে তাঁর স্বামীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। দাবি করা ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ আদায় হয়। বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন পাঁচজন, পরে গ্রেপ্তার হন আরও একজন।

মামলার সূত্রপাত

মামলাটি হয়েছে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই, গুলশান থানায়। বাদী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫) গুলশান-২–এর ৮৩ নম্বর সড়কের একটি বাসায় থাকেন। তদন্তের নথি অনুযায়ী, শাম্মী আহম্মেদ তাঁর স্ত্রী। শুরুতে মামলাটি তদন্ত করেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেছুর রহমান। পরে দায়িত্ব যায় পিবিআইয়ের হাতে। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহম্মেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন।

পিবিআইয়ের ভাষ্য

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। সেই পরিচয়ের সুযোগে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। মামলার আসামি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও অবস্থানের তথ্য দিয়ে সহায়তার নামে পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন তাঁরা। এরপর বিভিন্ন মানুষকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করেছেন বলে জানা যায়।

অভিযানের রাত

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে খবর আসে, শাম্মী আহম্মেদ গুলশানের বাসায় আছেন। এ খবরে কয়েকজন নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। রাত আনুমানিক দুইটার দিকে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযানের ব্যবস্থা নিতে বলেন। থানা-পুলিশ বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে জানায়।

১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ সদস্য ওই বাসায় যান। সঙ্গে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন, আমিনুল ইসলামসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন। তাঁরা নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কক্ষে সাবেক এমপিকে খোঁজেন। তাঁকে পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তল্লাশির একটি তালিকা তৈরি করে সবাই বাসা ছেড়ে যান।

ফিরে এসে ভয় দেখানো

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আবার ওই বাসায় যান। তাঁরা বাদীকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান এবং তা এড়াতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। ভয়ে বাদী টাকা দিতে রাজি হন। তখনই ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে আসামিরা চলে যান। টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে।

১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুজন আবার বাসায় যান। ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলেও কেউ দরজা খোলেননি, তাঁরা ফিরে যান। পরে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে ওই সময় ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বলে জানায় পিবিআই।

বাকি টাকা নিতে গিয়ে ধরা

২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আসামিরা আবার বাসার সামনে আসেন। বাদী তখন বাসায় ছিলেন না। নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোনে তাঁকে জানালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেন। পুলিশ দ্রুত পৌঁছে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে যান। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতে স্বীকারোক্তি

গ্রেপ্তারদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। নথি অনুযায়ী, দুজনই টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি, তিনি বিভিন্ন সময়ে ‘ফ্যাসিবাদী লোকজন’ গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহায়তা করেছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, অভিযানে শাম্মীকে না পেয়ে ফেরার সময় অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন, যাতে লেখা ছিল ‘শাম্মি ইয়ারপড’। সেটি ফেরত দেওয়ার কথা বলে সকাল ১০টার দিকে তাঁরা আবার বাসায় যান। অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে ভেতরে ঢোকেন। এরপর বাদীকে বলা হয়, তাঁরা বুঝতে পারছেন স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হলেও বাদী ১০ লাখ টাকার প্রস্তাব দিলে তাঁরা রাজি হন। সেই টাকা নিয়ে সমান ভাগ করে নেওয়া হয়।

বাকি টাকার প্রসঙ্গে রিয়াদের ভাষ্য, ২৬ জুলাই বিকেল ৫টায় তিনি ইব্রাহিম, সিয়াম ও সাদমানকে বাসায় পাঠান। তাঁর দাবি, পুলিশই তাঁকে ফাঁদে ফেলতে বাসায় যেতে বলেছিল। জবানবন্দির শেষে তিনি বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’

অপুর জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে ফের বাসায় গেলে বাদী প্রথমে ৫ লাখ টাকা দিতে চান, রিয়াদ চান এক কোটি। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখে রফা হয় এবং ১০ লাখ দেওয়া হয়। এরপর রিয়াদের বাড্ডার বাসায় গিয়ে পাঁচ লাখ করে ভাগ করে নেওয়া হয়। নিজের অংশ থেকে ৩ লাখ ৭ হাজার টাকায় তিনি একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন, কিছু টাকা ধার শোধে খরচ করেন। আরও ৫০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে গিয়ে ভুল নম্বরে চলে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। অপুর দাবি, বাকি টাকা আদায়ের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে পিবিআইয়ের ভাষ্য, তিনি সেখানে ছিলেন এবং পালিয়ে যান।

জব্দ করা জিনিস

নথি অনুযায়ী, রাজ্জাকের দেখানো পূর্ব বাড্ডার বৈঠাকালী এলাকার একটি বাসা থেকে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। ফোনগুলোর মধ্যে ছিল একটি রেডমি নোট ১০ প্রো ও দুটি আইফোন ১৩। অপুর দেওয়া তথ্যে মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার একটি বাসার গ্যারেজ থেকে মোটরসাইকেলটি, একটি আইফোন ১১ ও নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ হয়।

কোন আসামির বিরুদ্ধে কোন ধারা

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ ও জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আসামিদের একজন শিশু হওয়ায় তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে। আগামী ১০ নভেম্বর মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে, ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হওয়ার কথা। ছয় আসামিই এখন জামিনে। তবে ১ নভেম্বর পর্যন্ত থানার জিআরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি এখনো আদালতে জমা পড়েনি।

রিয়াদের আইনজীবী আকরাম হোসাইন বলেন, তাঁরা এখনো অভিযোগপত্র দেখেননি এবং রিয়াদের পক্ষে আদালতে আবেদন করবেন। রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর নম্বরটি এখন ব্যবহার করছেন বড় ভাই মো. রেজাউল করিম, যিনি জানান, রিয়াদ এখনই এ বিষয়ে কথা বলতে চান না।

মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পরিচয়দাতা রিয়াদই এই চাঁদাবাজির হোতা। তাঁকে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগপত্রে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থার কথা বলেন। বাদীর আইনজীবী জহুরুল আলম জানান, সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট; তাঁরা ন্যায়বিচার চান।

Share this news as a Photo Card