সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় বাস্তবায়নে তৎপরতা
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়।
মঙ্গলবার চিঠিটি পাঠানো হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর সই করা চিঠির বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব ও আইনমন্ত্রীর একান্ত সচিবকে অবগত করা হয়েছে।
চিঠিতে কী আছে
চিঠির বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর রায়ে দণ্ডিত পলাতক দুই আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ বাস্তবায়ন। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর একটি মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই রায়ে দুজনের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই শহীদ পরিবার ও ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিবন্দোবস্ত করার আদেশও এসেছে। আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ট্রাইব্যুনাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, অবিলম্বে এই সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে না নিলে দণ্ডিত ব্যক্তিরা যেকোনো সময় তা ভোগ, বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে পারেন। তাতে ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশ নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে। তাই দুজনের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিবন্দোবস্ত করার ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্পদ
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে শেখ হাসিনা (গোপালগঞ্জ-৩) ও আসাদুজ্জামান খান (ঢাকা-১২) হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তাঁদের ঘোষিত সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।
হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে মোট ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন। তাঁর হাতে নগদ ছিল সাড়ে ২৮ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ছিল।
তিনটি মোটরগাড়ির তথ্য দিয়েছিলেন তিনি। এর একটি উপহার পাওয়া, যার দাম উল্লেখ করা হয়নি। বাকি দুটির দাম সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দাম ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আসবাবের দাম ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল।
নিজের নামে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমির কথা বলেছিলেন শেখ হাসিনা। টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে থাকা এই জমির ক্রয় করা অংশের মূল্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক (আংশিক) জমির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যার অর্জনকালীন মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। ঢাকার পূর্বাচলে তাঁর নামে একটি প্লট আছে, যার দাম ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
গাজীপুরের বাগানবাড়ি ও পূর্বাচলের প্লট
গাজীপুর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ঘেঁষে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি জমিটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে লিখে দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরে তাঁরা জমির কিছু অংশ সন্তানদের লিখে দেন। ফলে সজীব ওয়াজেদ, সায়মা ওয়াজেদ, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকও এর মালিক হন। নথিপত্রে জমির পরিমাণ ২৯৭ শতক, অর্থাৎ ৯ বিঘা।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে পূর্বাচলে তাঁর নিজের, ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, বোন শেখ রেহানা এবং রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের (রূপন্তী) নামে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। ছয়জনে মিলে মোট ৬০ কাঠা জমি পেয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে এসব প্লট বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলছে।
হলফনামার তথ্য নিয়ে দুদকের বক্তব্য
দুদক এক ব্রিফিংয়ে জানায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা অসত্য তথ্য দিয়েছিলেন। ওই হলফনামায় তিনি নিজের নামে ৬ দশমিক ৫০ একর জমির কথা বলেছিলেন, যার ক্রয়মূল্য দেখানো হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দুদকের যাচাইয়ে তখন তাঁর নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদক নির্বাচন কমিশনকে চিঠিও দেয়।
ভূমি কার্যালয়ের সূত্র বলছে, ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটির মালিকানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের হাতে। শেখ হাসিনার বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদের নামে।
আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় আসাদুজ্জামান খান হাতে নগদ দেখিয়েছিলেন ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ৮২ লাখ টাকা। বন্ড ও শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা, আর ডাকঘর সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানত ছিল ২ কোটি ১ লাখ টাকার।
তাঁর দুটি মোটরগাড়ির দাম ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও আসবাবের মূল্য ২ লাখ টাকা। ঋণ বাবদ ব্যবসার মূলধন দেখিয়েছিলেন ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। সোনা ছিল ১০ ভরি, তবে দাম উল্লেখ করা হয়নি।
হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর কৃষিজমি ১৭১ শতাংশ (৫ বিঘার বেশি), অর্জনকালীন মূল্য এক কোটি ছয় লাখ টাকা। অকৃষিজমি সাড়ে ১৮ শতাংশ, যার অর্জনকালীন মূল্য সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা। একটি গ্রামের বাড়ির মূল্য ৮০ লাখ টাকা এবং আরেকটি সম্পদের মূল্য প্রায় ১৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ১০ ভরি সোনার মূল্য বাদে তাঁর ঘোষিত সম্পদের অর্থমূল্য ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকার মতো।
দুদক তাঁর সম্পদের অনুসন্ধানও করছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্ঞাত আয়ের বাইরেও তাঁর সম্পদ রয়েছে। এ বিষয়ে দুদক মামলা করেছে। আদালতে বলা হয়েছে, তিনি অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন করে দখলে রেখেছেন।
আব্দুল্লাহ আল রাহাত ,ঢাকা 



















