জ্বালানির চড়া দামের চাপ সামলাতে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার পথে হাঁটছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতিতে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটনে উঠেছে সমালোচনার ঝড়।
শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে তিন লাখ টন ডিজেল পাঠাতে রাজি হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এরপর আরও কয়েক দফায় সরবরাহ আসবে। প্রথম চালানের পর নভেম্বরে আসবে পাঁচ লাখ টন, তারপর ১০ লাখ টন। পরে আরও ৩০ লাখ টনের কথা রয়েছে, যা “অল্প সময়ের মাঝে” পাঠানো হতে পারে। তবে সবই নির্ভর করছে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর অবস্থার ওপর। ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দেশটির বেশ কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে এসব সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মাসে রপ্তানির পরিমাণ ৩০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, আমেরিকানদের, বিশেষ করে কৃষক, পশুপালক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোই তাঁর সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের অনুমতি দিয়ে একটি আইনে সই করেছিলেন তিনি। চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রেখেছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে মার্কিন ব্যাংকে থাকা রুশ সম্পদসহ অন্য নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে।
রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে সাতজন মার্কিন সিনেটর দাবি করেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আইনের লঙ্ঘন। তাঁরা ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। সই করা সিনেটরদের মধ্যে চারজন রিপাবলিকান: সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস। তিনজন ডেমোক্র্যাট: জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষ হত্যা চালিয়ে যাওয়ার সময় পুতিনকে আর্থিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তাঁদের মতে, মার্কিন অর্থ যেন এই যুদ্ধে ব্যবহার না হয়, সে জন্যই ২০২২ সালে কংগ্রেস রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল।
তবে সবাই বিরোধী নন। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা টমাস ম্যাসি বলেছেন, সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স নিউজকে জানান, বিদ্যমান আইনের মধ্যেই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব। যাঁরা উল্টো কথা বলছেন, তাঁরা ভুল বলছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও আপত্তি উঠেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সহ কয়েকজন নেতা বলেছেন, যুদ্ধ থামাতে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোই মিত্রদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা উচিত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চুক্তিটিকে পুতিনের জন্য “পুরস্কার” বলেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক যুদ্ধে বিনিয়োগ, যার অবসান জরুরি।
প্রেক্ষাপট
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, অথচ এটিই পেট্রোল ও ডিজেলের প্রধান কাঁচামাল। আগামী মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে কি না, তা ঠিক হবে। জনমত জরিপে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ সামলানোয় ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করছেন না। কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলো যন্ত্রপাতি চালাতে ও ফসল বাজারে পৌঁছাতে ডিজেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল বলে সেখানে ক্ষতির প্রভাবও বেশি।
মার্কিন অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন এএএ-র তথ্যে, বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬.২৮ ডলার। সেপ্টেম্বরের শেষে তা রেকর্ড ৬.৫৩ ডলারে পৌঁছেছিল। বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, রাশিয়া প্রতিশ্রুত পরিমাণ দিতে পারবে কি না এবং তাতে দাম কতটা কমবে। যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক ডিজেল ব্যবহার প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল।
এদিকে রোববার ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি”তে পৌঁছেছে, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি। জেলেনস্কি ঘোষণাটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। মস্কোর প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 



















