শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে রংপুরে গিয়ে সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নগরের ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি বলেন, এই সরকার যেমন ভোটদাতাদের, তেমনি যাঁরা ভোট দেননি, তাঁদেরও। সব ধর্মের মানুষ মিলে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে, তাই আমরা চাই সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে রংপুরে এটিই তাঁর প্রথম সফর। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রংপুরের দিকে আসার সময় মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে তিনি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় দুটি সংক্ষিপ্ত পথসভায়ও বক্তব্য দেন।
দুপুর ১২টার কিছুক্ষণ পর মন্দিরে পৌঁছালে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। শিশুরা নৃত্য পরিবেশন করে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। তারেক রহমান মন্দিরের পুরোহিত ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। মন্দিরের উন্নয়নে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক হস্তান্তরের পাশাপাশি আরও উদ্যোগ নিতে স্থানীয় সরকারকে নির্দেশনাও দেন তিনি।
ভোট দিন বা না দিন, সরকার সবার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ বর্তমান সরকারকে নির্বাচিত করেছে। কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, কোনো এলাকায় হননি। তবে সরকার হতে চায় সব মানুষের। যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের যেমন; যাঁরা দেননি, তাঁদেরও।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ন্যায্যভাবে সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে সারা দেশে সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার, জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একনেক সভায় রংপুর মহানগরের উন্নয়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জেলা পরিষদের মাধ্যমে রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে সেতু, কালভার্ট, স্কুল-কলেজসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ধাপে ধাপে গড়ে তোলা হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও যেন রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সুফল পান, সেটাই লক্ষ্য। তাঁর কথায়, এসব কাজে ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে
সরকার ঐক্যের ডাক দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য, অতীতে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি; দেশের মানুষ তা ভালোভাবে নেয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে হেয় বা বিতর্কিত না করার আহ্বান জানান তিনি।
১৯৭১ সালে ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন বলে মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ২০২৪ সালে স্বৈরাচারী সরকারকে সরিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, বলেন তিনি।
কারও ভিন্নমত থাকলে তা সংসদে তুলে ধরার পরামর্শ দেন তারেক রহমান। তাঁর কথায়, সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আলোচনা করে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন; ভালো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতেও বলেন তিনি।
অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সন্তানদের পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়েছে। আমরা আর এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই না। জনগণ এখন দেশে স্থিতিশীলতা চায়।’
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, অতীতে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখা গেছে, তা বদলাতে চায় সরকার; আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যেভাবে হাজার বছর ধরে শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করছেন, আগামী হাজার বছরও তাঁরা সেভাবেই থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এই দেশ আমাদের সবার। দেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিভ্রান্তি ও বিভেদ পেছনে ফেলে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথাও বলেন তারেক রহমান।
পাগলাপীরের পথসভায় যা বললেন
রংপুরের পাগলাপীরে এক পথসভায় সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে দেশ স্বাধীন হওয়ার কথা আবারও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সব ধর্মের মানুষ মিলে এই দেশকে স্বাধীন করেছে, তাই আমরা চাই—সকল ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই দেশকে গড়ার জন্য।’ শারদীয় দুর্গাপূজাকে সনাতনী সম্প্রদায়ের উৎসব উল্লেখ করে এ কথা বলেন তিনি।
সরকারের নানা উদ্যোগের কথাও সেখানে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার দিন থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে, চালু হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। কৃষক কার্ডও চালু করে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি। ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা আছেন আমার সঙ্গে?’ তখন উপস্থিত সবাই হাত তুলে সম্মতি জানান। এরপর নিজের প্রতিজ্ঞার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—যাঁরাই এই বাংলাদেশে আছেন, এই দেশ তাঁদের সবার। সবাই মিলে পরিশ্রম করে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক এখনকার প্রত্যাশা।
সফরসঙ্গী ও পরবর্তী কর্মসূচি
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার। উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
ধর্মসভায় বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন। সেখান থেকে তাঁর রাজশাহী যাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রেক্ষাপট
মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—এই তিন অধ্যায়েই সব ধর্ম ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণের কথা বারবার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। রংপুরের সফরে তাঁর বার্তার মূল সুর ছিল ঐক্য, সমবণ্টনভিত্তিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, সব এলাকার সমান উন্নয়নে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থাকেই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















