ঢাকার আবাসিক ভবনে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যু

রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে সাম্প্রতিক শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের চিকিৎসা অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্ধারিত বিল্ডিং কোড এবং স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত অবকাঠামোগত নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চলছে না। ফলে রোগী এবং চিকিৎসা কর্মী—উভয় পক্ষই এক অদৃশ্য ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।

​’আবাসিক ভবন যখন হাসপাতাল’

​বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতালের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সঠিক স্থাপত্য নকশার ওপর। নগর পরিকল্পনাবিদ আখতার মাহমুদ এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “প্রত্যেক ভবনের ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী তার নকশা হওয়া উচিত। একটি স্কুলের নকশা যেমন স্কুলের উপযোগী হবে, তেমনি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ভবনও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে। কারণ, এগুলো বিশেষায়িত সেবার জায়গা।”

​তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায় আবাসিক ভবনকে রাতারাতি রূপান্তর করে ক্লিনিক বা হাসপাতাল বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। অথচ ওই ভবনগুলো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মোটেও পরিকল্পিত নয়।

​একটি আদর্শ হাসপাতালে করিডর, রোগী চলাচলের ব্যবস্থা, বিশেষায়িত লিফট, প্রশস্ত সিঁড়ি, জরুরি নির্গমন পথ এবং কক্ষের বিন্যাস সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হওয়া জরুরি। হাসপাতালকে একটি ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থান’ হিসেবে বিবেচনা করে বিল্ডিং কোডে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

​প্রতিরোধ নয়, চিকিৎসানির্ভরতা ও মুনাফার সমীকরণ

​বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সংকট হলো এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার চেয়ে চিকিৎসানির্ভর পদ্ধতিতে বেশি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। আর এই সুযোগেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক বাজার।

​নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বেসরকারি অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মূলত লাভকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিচালিত হয়। কম বিনিয়োগে কীভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেই প্রবণতা থেকেই অনেক সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা অবকাঠামোগত নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়। কম জায়গায় বেশি রোগী, বেশি চিকিৎসক বা বেশি সেবা বসাতে পারলেই মুনাফা বাড়ে—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বাজারে।

​ব্যতিক্রমী মডেল: আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন

​তবে দেশের প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারার বাইরে আদ-দ্বীন হাসপাতালকে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখেন সংশ্লিষ্টরা। এটি সাধারণ অর্থে কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক হাসপাতাল নয়, বরং একটি অলাভজনক দাতব্য সংস্থা।

​১৯৮০ সালে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দীন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের যৌথ উদ্যোগে আদ-দ্বীন কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানে ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হচ্ছে। মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে আসছে।

​তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিষ্ঠান দাতব্য হোক কিংবা বাণিজ্যিক—জননিরাপত্তার স্বার্থে ভবনের কারিগরি মান ও বিল্ডিং কোড নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও নিরাপত্তাকে সামনে রেখে যদি দ্রুত কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা অবকাঠামোগত সংকটের মুখে আরও নাজুক হয়ে পড়বে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই আইনি ব্যবস্থা: আইনমন্ত্রী

৩০ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ঢাকার আবাসিক ভবনে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যু

আপডেট সময় ০৩:৪২:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে সাম্প্রতিক শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের চিকিৎসা অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্ধারিত বিল্ডিং কোড এবং স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত অবকাঠামোগত নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চলছে না। ফলে রোগী এবং চিকিৎসা কর্মী—উভয় পক্ষই এক অদৃশ্য ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।

​’আবাসিক ভবন যখন হাসপাতাল’

​বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতালের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সঠিক স্থাপত্য নকশার ওপর। নগর পরিকল্পনাবিদ আখতার মাহমুদ এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “প্রত্যেক ভবনের ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী তার নকশা হওয়া উচিত। একটি স্কুলের নকশা যেমন স্কুলের উপযোগী হবে, তেমনি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ভবনও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে। কারণ, এগুলো বিশেষায়িত সেবার জায়গা।”

​তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায় আবাসিক ভবনকে রাতারাতি রূপান্তর করে ক্লিনিক বা হাসপাতাল বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। অথচ ওই ভবনগুলো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মোটেও পরিকল্পিত নয়।

​একটি আদর্শ হাসপাতালে করিডর, রোগী চলাচলের ব্যবস্থা, বিশেষায়িত লিফট, প্রশস্ত সিঁড়ি, জরুরি নির্গমন পথ এবং কক্ষের বিন্যাস সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হওয়া জরুরি। হাসপাতালকে একটি ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থান’ হিসেবে বিবেচনা করে বিল্ডিং কোডে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

​প্রতিরোধ নয়, চিকিৎসানির্ভরতা ও মুনাফার সমীকরণ

​বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সংকট হলো এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার চেয়ে চিকিৎসানির্ভর পদ্ধতিতে বেশি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। আর এই সুযোগেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক বাজার।

​নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বেসরকারি অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মূলত লাভকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিচালিত হয়। কম বিনিয়োগে কীভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেই প্রবণতা থেকেই অনেক সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা অবকাঠামোগত নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়। কম জায়গায় বেশি রোগী, বেশি চিকিৎসক বা বেশি সেবা বসাতে পারলেই মুনাফা বাড়ে—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বাজারে।

​ব্যতিক্রমী মডেল: আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন

​তবে দেশের প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারার বাইরে আদ-দ্বীন হাসপাতালকে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখেন সংশ্লিষ্টরা। এটি সাধারণ অর্থে কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক হাসপাতাল নয়, বরং একটি অলাভজনক দাতব্য সংস্থা।

​১৯৮০ সালে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দীন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের যৌথ উদ্যোগে আদ-দ্বীন কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানে ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হচ্ছে। মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে আসছে।

​তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিষ্ঠান দাতব্য হোক কিংবা বাণিজ্যিক—জননিরাপত্তার স্বার্থে ভবনের কারিগরি মান ও বিল্ডিং কোড নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও নিরাপত্তাকে সামনে রেখে যদি দ্রুত কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা অবকাঠামোগত সংকটের মুখে আরও নাজুক হয়ে পড়বে।

Share this news as a Photo Card