ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকার তরুণ আলী হোসেন। ফিরলেন সাত মাসের কারাবাস শেষে, ১৩ অক্টোবর। বিদেশের মাটিতে তাঁর মতো আরও অনেকে বন্দি। সরকারি হিসাবেই সংখ্যাটা ১০ হাজার ৬৬।
ধারদেনা করে যাত্রা, শেষে কারাগার
গরিব কৃষকের সন্তান আলী হোসেনের বয়স ২১। ধারদেনা করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন। তাঁর ভাষ্য, মাসে আড়াই হাজার রিয়াল দেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম কিছুদিন পর মাসে ৫০০ রিয়ালের বেশি মিলত না।
দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। অভিযোগ ছিল মোটরসাইকেল চুরি এবং কফিলের কাছ থেকে আট হাজার রিয়াল ধার নেওয়া। আলী হোসেনের দাবি, দুটিই মিথ্যা। জেদ্দার কারাগারে তাঁকে সাত মাস থাকতে হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর দূতাবাসের কেউ তাঁর খোঁজ নেননি, আদালতেও কখনো তোলা হয়নি। সাত মাসে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন মাত্র চারবার। পরিবারকে বলেছেন, শিগগিরই ছাড়া পাবেন। কারাগারে রেজওয়ান নামে আরেক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যিনি এখনো বন্দি।
শরীয়তপুরের মাহমুদপুরের নয়ন সর্দারও (২৬) অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। ২০২৩ সালে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, রাস্তায় গম বিক্রির মিথ্যা মামলায় মক্কা থেকে ধরে জেদ্দার কারাগারে নেওয়া হয়। ২৯ দিন সেখানে ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, কারাগারে খাবার ঠিকমতো দেওয়া হতো না, বাড়ি থেকে পাঠানো টাকায় কোনোমতে টিকে ছিলেন। একদিন দূতাবাসের একজন এলেও বন্দিদের সহায়তার আর্জি শুনতে চাননি বলে দাবি করেন নয়ন।
সংখ্যায় প্রবাসী বন্দি
সম্প্রতি সৌদি আরবে এক নারীসহ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য সামনে এসেছে। এরপর প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায়।
জাতীয় সংসদে যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য কাজী এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, বিভিন্ন দেশের কারাগারে এখন ১০ হাজার ৬৬ বাংলাদেশি বন্দি। তাঁদের প্রায় সাড়ে সাত হাজার সৌদি আরবে, অর্থাৎ ৭৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্য দেশের হিসাব এ রকম: ভারতে এক হাজার ৫৭৯, তুরস্কে ৫০৮, ওমান ও কাতারে ৪২০ করে, গ্রিসে ৪১৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪০৪, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৮৫ এবং মালয়েশিয়ায় ২১৯ জন।
এ খাতে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি। তাদের বক্তব্য, অনেক দেশে বন্দি বাংলাদেশির আসল সংখ্যা সরকারের কাছেই নেই।
ফেরত আসা মানুষের সারি
ব্র্যাকের তথ্যমতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে ৫৩ হাজার ২১২ জনকে। এর মধ্যে পুরুষ ৫১ হাজার ৫২৫ এবং নারী এক হাজার ৬৮৭ জন। সৌদি আরব থেকেই এসেছেন ৩৩ হাজার ৬১১ জন, যা মোট সংখ্যার ৬৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।
মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন ছয় হাজার ৬৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক হাজার ৮৪৩, লিবিয়া থেকে এক হাজার ৭৯৩ এবং কুয়েত থেকে এক হাজার ৫৭৬ জন। ওমান থেকে ৮৪০, জর্ডান থেকে ৪৭০, লেবানন ও সিঙ্গাপুর থেকে ৩৬২ করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২১৬, ভারত থেকে ১৮১ এবং পাকিস্তান থেকে ১১৩ জন ফিরেছেন। প্রথম ৯ মাসে মোট ৬৮টি দেশ থেকে এভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আগের বছরগুলোর চিত্র: ২০২৫ সালে ফিরেছেন ৭৫ হাজার ১১৭ জন, ২০২৪ সালে ৮৮ হাজার ৮৬৮ এবং ২০২৩ সালে ৮৬ হাজার ৬২১ জন।
সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাঁচ দশকেও প্রবাসীদের জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক সময় লঘু অপরাধেও গুরুদণ্ড পেতে হচ্ছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, দূতাবাসের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টদের দায়িত্ব নিয়মিত কারাগার ও আদালতে যাওয়া। এ কাজে গাফিলতি হলে বন্দিদের সংকট বাড়ে। তিনি জানান, রাষ্ট্রদূত থাকাকালে ১০ থেকে ১২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জীবন বাঁচিয়েছেন। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ কোন বাংলাদেশি কী অপরাধে আটক, সে তথ্য নিয়মিত পাঠাত। তাঁর পরামর্শ, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন, এমন জনবল দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া উচিত।
নারী কর্মীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চুক্তিতে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে উল্লেখ থাকে না। অন্য দেশের তুলনায় বেতনও কম। অনেকে প্রশিক্ষণ ছাড়াই যান, ভাষাগত দক্ষতাও থাকে না। সমস্যার বড় কারণ এটাই।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বন্দিদের কেউ কেউ নিরপরাধ, আবার কারও কারও নথিপত্র ভুয়া। তাঁর ভাষ্য, কারাগারে থাকলে কোথায় যোগাযোগ করলে সহায়তা মিলবে, তা অনেক প্রবাসী ও তাঁদের পরিবার জানেন না। মালয়েশিয়ায় ছোটখাটো অপরাধে বেত্রাঘাত করা হয়, যাকে সেখানে ‘রটান’ বলা হয়। সৌদি আরবে নারী শ্রমিকেরা নির্যাতনের শিকার হলে উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধে চুরিসহ নানা মিথ্যা মামলা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। নিজ দেশের নাগরিকদের পক্ষে সরকারের শক্ত অবস্থান না দেখলে সংশ্লিষ্ট দেশের নীতিনির্ধারকেরা এ ধরনের লঙ্ঘনে আরও সাহস পান বলে তিনি মনে করেন।
মিশনের করণীয়
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো বাংলাদেশির বন্দি থাকার খবর পেলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা মিশনের উচিত কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করা। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, মামলা-সংক্রান্ত পরামর্শ ও আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। বন্দির আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকলে আদালতের মাধ্যমে আইনজীবী দেওয়ার চেষ্টা চালাতে হয়। পরিবার আলাদা আইনজীবী নিতে চাইলে মিশনকে পরামর্শ ও সহায়তা দিতে হয়। তাঁদের মতে, অনেক দেশে এসব বিষয়ে যথাযথ নজর দেওয়া হয় না।
দেশে ফিরেও আলী হোসেনের মতো অনেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















