বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। কে কোন দলের হয়ে কাজ করছেন, কার আনুগত্য কোথায়, কে অনুপ্রবেশকারী আর কে প্রক্সি, এসব প্রশ্ন ঘিরে বিভিন্ন দলের নেতারা এখন একে অপরকে অভিযুক্ত করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও জামায়াতের জবাব
আলোচনার সাম্প্রতিক সূত্রপাত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্য। অক্টোবরের পহেলা তারিখে ফেনীর এক জনসভায় তিনি গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। সেখানে তিনি বলেন, “তাদেরকে কখনো রাজপথে দেখেছেন? তারা রাজপথে ছিলো না। এই তারা এবং ওরা, ঐযে যারা পালিয়ে গেছে, স্বৈরাচার এবং গুপ্ত, তারা আবার একসঙ্গে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বরাবরই তো তারা একসঙ্গে ছিল। ১৯৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিল, ১৯৮৬ সালেও একসঙ্গে ছিল। গত নির্বাচনের সময়ও তারা একসঙ্গেই ছিল, তলে তলে কাজ করেছিল। এজন্য তাদেরকে গুপ্ত বলা হয়।”
বক্তব্যটি জামায়াতকে ইঙ্গিত করে দেওয়া বলে ধরা হয়েছে। দুই দিন পর ঢাকার বাইতুল মোকাররমের সামনে এক সমাবেশে জবাব দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “বিশাল বিশাল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। বিএনপি আসার কথা আসে নাই, জামায়াত-শিবির লড়াই করে জীবন দিয়েছে। আপনি সেই জামায়াত-শিবিরকে আজ গুপ্ত বলেন। আপনার লজ্জা পাওয়া উচিত।”
বিতর্ক শুধু শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে থামেনি। অন্য নেতা ও দলীয় কর্মীরাও এতে যুক্ত হন। সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নুর অভিযোগ করেন, জামায়াত নানা প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে।
বিতর্কের শুরু যেভাবে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতি নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একে একে প্রকাশ্যে আসতে থাকেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা। তখনই অভিযোগ ওঠে, তাঁদের কেউ কেউ আগে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগগুলো মূলত তোলে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের ভাষ্য, “তাদেরকে তো চেনাই যাচ্ছে না। তাদের পলিটিক্সে কারা, কী করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। তাদের কমিটিগুলোও তারা প্রকাশ করে না।” তাঁর দাবি, শিবির কাউকে ডিবেটিং সোসাইটিতে, কাউকে সাংবাদিক সমিতিতে পাঠিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে প্রভাব তৈরি করে। এসব সংগঠনে দলীয় পদ-পদবি থাকলে নেতৃত্বে আসা যায় না। তাই গোপন থেকে তারা সুবিধা নেয় এবং ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের ‘মব’ তৈরি করতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল প্রকাশ্যে তেমন কার্যক্রম চালাতে পারেনি। ছাত্রশিবিরও ওই সময় একরকম নিষিদ্ধ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের প্রকাশ্য কমিটি থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবির প্রকাশ্যে কমিটি দেয়নি। ৫ আগস্টের পরের উন্মুক্ত রাজনীতিতেও দলটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করছে না বলে বলা হচ্ছে।
শিবিরের বক্তব্য
ছাত্রশিবির এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদের ভাষ্য, ছাত্রদল তিন-চার বছরে ত্রিশ থেকে চল্লিশটি কমিটি দিতে পেরেছে। অথচ শিবির প্রতিবছর জানুয়ারিতে ১৩২টি শাখায় কমিটি করে, যা সংগঠনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিও সেখানে আছে।
হলভিত্তিক কমিটি না দেওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে রাজনীতি থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে এবং শিক্ষার্থীরা এর বিপক্ষে। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে পক্ষে মত জানালে হলগুলোতেও কমিটি দেওয়া হবে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমস্যা নেই, সেখানে হল পর্যায়েও কমিটি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, শিবিরের কমিটি ছোট হয়। দুই-তিনশ বা তার বেশি সদস্য নিয়ে ঢালাও কমিটি তারা করে না।
ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেন ফরহাদ। তাঁর ভাষ্য, ছাত্রলীগের এক নেতার সঙ্গে যে ছবি প্রচার করা হয়, তা দলীয় কর্মসূচির নয়, ডিবেটিং ক্লাবের অনুষ্ঠানের। ডাকসু নির্বাচনের আগে একটি গ্রুপ তাঁর প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেছিল। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি, ফলে তাঁর প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে বলে তিনি জানান।
গুপ্ত রাজনীতি কি আগেও ছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিনের মতে, গুপ্ত রাজনীতি বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে নতুন নয়। অতীতে এটা মূলত নিষিদ্ধ দলগুলোই করেছে। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টির মতো বাম দলগুলো নিষিদ্ধ হলে গোপনে কাজ চালাত, যাকে বলা হতো ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’।
তবে গত বিশ বছরে এর ধরন বদলেছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এখন দল নিষিদ্ধ না হলেও কৌশল হিসেবে কেউ কেউ ‘হিডেন পলিটিক্স’ করছে। কখনো অন্য দলের সঙ্গে মিশে, কখনো অন্য দলের তথ্য সংগ্রহ করে।
অভিযোগ বিভিন্ন সময় মূলত জামায়াতের বিরুদ্ধেই উঠেছে। এখন বিএনপি সেগুলো জোরালোভাবে সামনে আনছে, আর জামায়াত তা নাকচ করে পাল্টা বিএনপির বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলছে।
সন্দেহ ছড়াচ্ছে দলের ভেতরেও
জোবাইদা নাসরিনের মতে, এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মূল কারণ অপ্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে দলগুলোর পারস্পরিক সন্দেহ। এখন তা সব দলেই দেখা যাচ্ছে। তাঁর বর্ণনায়, বিএনপি মনে করে তাদের ভেতরে ‘গুপ্ত’ আছে, কখনো আওয়ামী লীগের, কখনো জামায়াতের। আওয়ামী লীগ আবার মনে করে, তাদের সময় সুবিধা নেওয়া অনেকে এখন বিএনপির সুবিধাভোগী, অর্থাৎ ‘বিএনপির গুপ্ত’। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গোপন গ্রুপের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর দলটি বলছে, তাদের মধ্যেও গুপ্ত ঢুকেছে।
এই অবিশ্বাস এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে অতীতে ভিন্ন দলে থাকার ইতিহাস, কিংবা নিরপেক্ষ কারও হঠাৎ দল বা সরকারে যোগ দেওয়াকেও গুপ্ত রাজনীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কখনো নিজ দলের ভেতরেই একে অপরের বিরুদ্ধে ট্যাগটি ব্যবহার হচ্ছে। জোবাইদা নাসরিনের ভাষায়, “একে অন্যকে অবিশ্বাসের ধারা তৈরি হচ্ছে যে, সে তো গুপ্ত। তাকে বিশ্বাস করা যাবে না।”
বিএনপি কেন সরব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো সব কৌশল প্রকাশ্যে আনে না, অনেক সময় অন্য দলের সঙ্গে গোপন সংযোগও রাখে। কিন্তু এর সঙ্গে অনুপ্রবেশের অভিযোগ যুক্ত হলেই বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়।
বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সরব হওয়ার কারণ সরকার পতনের ‘গুপ্ত ষড়যন্ত্র’। অভিযোগের আঙুল জামায়াতের দিকে, বিশেষ করে সংস্কার ও জুলাই সনদ ইস্যুতে তাদের আন্দোলনের দিকে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, “আমরা তো সংস্কারের বিরুদ্ধে না। কিন্তু তারা গুপ্তভাবে কিছুটা ষড়যন্ত্র করছে, এই সংস্কার নিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে যে, আমরা সংস্কার করবো না। … আমরা যদি অন্যায় করি আমাদের সাজা দেবেন জনগণ। কিন্তু কোন মুভমেন্ট করে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে এটা পারবেন না।”
জামায়াতের পাল্টা অবস্থান
জামায়াত গোপন ষড়যন্ত্র বা গুপ্ত রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ নাকচ করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিএনপির কয়েকজন মন্ত্রীকে তিনি চল্লিশ বছরের রাজনীতিতে দেখেননি। ক্যাবিনেটে এমন দশ-পনেরজন আছেন, যাঁদের কেউ চেনে না। তাঁর প্রশ্ন, তাঁদেরও কি তবে গুপ্ত বলা হবে? ট্যাগ দিতে চাইলে তো যে কাউকেই দেওয়া যায়।
তাঁর মতে, বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে নজর সরাতেই সরকার ও সরকারি দল এসব বিষয় সামনে আনছে। জামায়াতের মূল দাবি জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর আলোকে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, আর এসব অভিযোগ সেই দাবি থেকে মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















