শিরোনাম :
রাজশাহীতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপন, ১৩০ জনের মাঝে ২৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা বিতরণ রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষবাষ্প আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে ইউপি নির্বাচন চুয়েটে তালা ভেঙে দপ্তরে নতুন উপাচার্য রুশ ডিজেল আমদানির পরিকল্পনায় ট্রাম্পকে ঘিরে ওয়াশিংটনে বিতর্ক জ্যাম কমাতে রাস্তায় নামলেন ঢাকার বাস মালিকরা পূজায় তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন, পাঁচ ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি প্রত্যাহার জনগণের অর্থের প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যয় নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রূপপুরে প্রথমবার পারমাণবিক বিক্রিয়া, নভেম্বরের শেষে গ্রিডে বিদ্যুৎ সৌদি আরব থেকে এক সপ্তাহে বিতাড়িত ১০ হাজার বাংলাদেশি

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষবাষ্প

ধর্মের আশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পায়তারা কেন? আল-কোরআন কি বলে? আসুন প্রথমে আলোচনা করা যাক। আল কুরআন ন্যায়বিচার, তাকওয়া, সত্যনিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার কথা বলে। নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসা, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচারের অনুমতি দেয় না। আল-কুরআন মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা গোষ্ঠীগত অহংকারের ভিত্তিতে অন্যায় করতে নিষেধ করে। ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সত্যনিষ্ঠা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করা কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আর এটাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন ধর্ম থাকা উচিত নয়, রাষ্ট্রে যারা জন্মগ্রহণ করেছে তারা ধর্মস্রিত বা তাদের ধর্ম আছে বা থাকা উচিত।রাষ্ট্র, প্রত্যেক ধর্মের মানুষেরই রাষ্ট্র এবং তারা সকলে দেশেরই নাগরিক। তাহলে অন্য ধর্মের প্রতি হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ কোরআন অনুমতি দেয় না।এবং দুদিন আগে যেটা ঘটে গেল শিল্পকলা একাডেমির সম্মুখে, সেটা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এরা কারা? এদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছে। গ্রাফিতিতে কালি দিয়ে এরা সেই বিষবাষ্প বপন করতে চায়। সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮ আয়াতের আলোকে- “মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন আল্লাহ ছাড়া যাদের অন্যরা উপাসনা করে তাদের গালমন্দ না করে। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত তারা শত্রুতার কারণে আল্লাহকে গালি দিতে পারে।”

জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি জাতি কেবল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের সমষ্টি নয়; তার ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, স্মৃতি, সংগীত, জীবনাচার, মূল্যবোধ ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতাও জাতীয় পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে।

“জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে একটি জাতির সদস্য হিসেবে অনুভব করে এবং সেই জাতির আত্মপরিচয়, স্বার্থ, মর্যাদা কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়।”

“সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রকাশ”। একটি জাতি যখন নিজের ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন তার মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে নোবেল পাওয়া একমাত্র কবি ও বিশ্বকবি, তাকে অবহেলা করার দায় বাংলাদেশ নিতে পারেনা। কিছুদিন আগে দৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি সমস্ত লেখা বৌদির জন্যই লিখেছেন। এটা অজ্ঞতা ও সাম্প্রদায়িক নোংরামি ছাড়া কোনভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

“পরশ যাঁরে যায় না করা
সকল দেহে দিলেন ধরা”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটা কোন বৌদির জন্য লিখেছিলেন?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা এই আত্মপরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দেখায়, সাংস্কৃতিক প্রকাশ মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও মর্যাদাবোধকে শক্তিশালী করতে পারে। সংস্কৃতি যদি মানবিকতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দেয়, তবে জাতীয়তাবাদও এই মূল্যবোধগুলো থেকে শক্তি পেতে পারে।

কিন্তু সংস্কৃতিকে যদি কেবল অতীতের গৌরব প্রচার, অন্য জাতিকে হেয় করা অথবা একটি গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা জাতীয়তাবাদের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। ৫২ এর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে রূপান্তরিত করেছিল। মাতৃভাষার স্বীকৃতি ছিল আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের দাবি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রাজনৈতিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা-সংস্কৃতি এবং বৈষম্যের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য কবিরা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে আর আমরা সেটা বহন করে চলেছি। এখন রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলবেন? না বাংলা ভাষাকে মুছে ফেলবেন?গভীরভাবে বিবেককে প্রশ্ন করুন? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেবল সাংস্কৃতিক আবেগ বা কেবল রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, দর্শন ও সমাজচিন্তায় সাম্প্রদায়িকতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক বিভাজন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িকতা এক বিষয় নয়। ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হতে পারে; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় যখন অন্য মানুষকে ঘৃণা, অবজ্ঞা কিংবা বঞ্চনা করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা মানবতার পরিপন্থী। সাম্প্রদায়িকতা বলতে সাধারণত এমন মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে মানুষ নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থকে সর্বোচ্চ বলে মনে করে এবং অন্য সম্প্রদায়কে প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু কিংবা অধিকারহীন হিসেবে দেখতে শুরু করে। প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা সহনাগরিককে আর স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে দেখা হয় একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে। আর এর জ্বলন্ত উদাহরণ হল বর্তমান ভারত। সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প এমন ভাবে ছড়িয়েছে যে পুরো ভারতকেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছে, আর মুক্তচিন্তার মানুষগুলো সম্ভবত অসহায়। ফলে যা ঘটার তাই ঘটছে। আরশোলারা খেপেছে, যন্তর মন্তরে গত দু-তিন দিন যাবত তারই চিত্রায়ন ঘটছে। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এবং দলীয় বিবেচনায় নিজ দেশের নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বা নাগরিকত্বকে অস্বীকার করছে, ভোটাধিকার খর্ব করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে, ভাবা যায়? কত গভীর ষড়যন্ত্র, বিবেকহীনতা ও বিচার শূন্যতা! তারাই আবার আমাদের দেশকে সাম্প্রতিকতার ছবক দেয়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যাবত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। দুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফীতিতে যে কালি দেওয়া হলো সেটা বাংলাদেশ নয়! এটা সাম্প্রতিকতার বিষ বাষ্প এই উপমহাদেশে ভারত-ই আমদানি করে ছেড়ে দিয়েছে। আর তার উত্তাপ থেকে বাংলাদেশও রেহাই পাচ্ছে না এটাই বাস্তবতা।

রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় ফেরা যাক , রবীন্দ্রনাথের সমাজদর্শনের আলোকে এই প্রক্রিয়ার মূল বিপদ হলো—মানুষের বিবেক, বিচারবুদ্ধি ও ব্যক্তিসত্তা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে পরাজিত হয়। ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সা, আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিক আপসের প্রবণতা কাজ করে। মানুষকে চিন্তা করতে শেখানোর পরিবর্তে উত্তেজিত করে তোলা হয়।

কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পদ্ধতি সমর্থন না করলে তাকে দেশবিরোধী বলে সন্দেহ করার প্রবণতা দেখা দেয়। নৈতিক অবস্থানের সংঘাতের মাধ্যমে আবেগনির্ভর রাজনীতির বিপদ উন্মোচন করেছে।

কোনো রাজনৈতিক আদর্শ তখনই মহৎ, যখন তা মানুষের জীবন ও মর্যাদাকে রক্ষা করে। দেশপ্রেম মানে দেশের সব মানুষের কল্যাণ কামনা করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ করার নৈতিক অনুমতি দেয় না।  রাজনৈতিক নেতা যখন মানুষের বিবেকের চেয়ে তার আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন দেশপ্রেমও বিভেদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। একটি দেশের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসারী হতে পারেন। কারও বংশ বা ধর্মের ভিত্তিতে তাকে উচ্চ কিংবা নীচ বলে বিচার করা অন্যায়। কোনো সম্প্রদায়কে জাতির বাইরে রেখে সর্বজনীন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা স্ববিরোধী। কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ধর্মীয় আচার পালন করেও যদি অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করেন, দুর্বলকে বঞ্চিত করেন কিংবা মিথ্যা প্রচার করেন, তবে তাঁর আচরণের সঙ্গে ধর্মের নৈতিক আদর্শের সংঘাত তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দৃষ্টিতে মানুষের মূল্য নির্ধারণে তার মানবিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় পরিচয়কে নৈতিকতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। যখন কোনো জাতি বা সম্প্রদায় নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মকে সর্বোচ্চ প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যদের অবদান অস্বীকার করে, তখন আত্মমর্যাদা আত্মগরিমায় পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বাংলার মানুষের ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ দিক হলো—তিনি কেবল রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলেননি; তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে প্রকৃত সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হোক।

বাংলার সমাজ গড়ে উঠেছে বহু ধর্ম, ভাষা, আচার ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সম্মিলনে। কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি হিসেবে এই সমাজকে দেখা যায় না। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখেও অন্যের বিশ্বাস, অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করা সম্ভব। সম্প্রীতির জন্য সবাইকে একই ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করতে হয় না। রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক—প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, বিপদে সাহায্য, ন্যায্য অধিকার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সম্প্রীতির শক্তিশালী ভিত্তি।

কোনো মহৎ উদ্দেশ্যই মানবিক বিবেক ও নৈতিক দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নয়। ধর্মীয় পরিচয়কে ভোট, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে সম্প্রদায়গত বিভাজন গভীর হতে পারে।কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সহিংসতা বা অন্যায়ের প্রতিকার না হলে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

বাংলার সাহিত্য, সংগীত, ভাষা ও লোকসংস্কৃতি বিভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করার অর্থ ধর্মীয় পার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং পার্থক্য বজায় রেখেও একটি যৌথ সমাজ গড়ে তোলা।

রবীন্দ্রনাথের চিন্তার আলোকে বলা যায়, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ঐক্যের স্লোগান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান, সামাজিক সহযোগিতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিকত্ব।

সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা, ন্যায়সংগত আইন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথের রচনায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে নৈতিক অবস্থান ফুটে ওঠে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন বিবেক, ন্যায়বোধ এবং ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা। ঘরে বাইরে দেখায়, দেশপ্রেমের নামে আবেগকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। গোরা দেখায়, ধর্মীয় ও জন্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক পরিচয় উপলব্ধি করার সম্ভাবনা। চার অধ্যায় সতর্ক করে দেয়, কোনো আদর্শের নামে অন্ধ আনুগত্য ও সহিংসতা কীভাবে মানুষের স্বাধীনতা ও নৈতিকতাকে বিপন্ন করতে পারে। আপনার বিবেচনার জন্যই রবীন্দ্র দর্শনকে বারবার তুলে এনেছি।

একটি জাতি তখনই তার সংস্কৃতির প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করতে পারে, যখন সেই সংস্কৃতির ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে, নাগরিকদের যুক্ত করে এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অধিকারকে সম্মান করতে শেখায়।

লেখক : কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জ রায়গঞ্জে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠন নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সৌদি আরব থেকে এক সপ্তাহে বিতাড়িত ১০ হাজার বাংলাদেশি

১১ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষবাষ্প

আপডেট সময় ০২:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

ধর্মের আশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পায়তারা কেন? আল-কোরআন কি বলে? আসুন প্রথমে আলোচনা করা যাক। আল কুরআন ন্যায়বিচার, তাকওয়া, সত্যনিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার কথা বলে। নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসা, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচারের অনুমতি দেয় না। আল-কুরআন মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা গোষ্ঠীগত অহংকারের ভিত্তিতে অন্যায় করতে নিষেধ করে। ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সত্যনিষ্ঠা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করা কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আর এটাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন ধর্ম থাকা উচিত নয়, রাষ্ট্রে যারা জন্মগ্রহণ করেছে তারা ধর্মস্রিত বা তাদের ধর্ম আছে বা থাকা উচিত।রাষ্ট্র, প্রত্যেক ধর্মের মানুষেরই রাষ্ট্র এবং তারা সকলে দেশেরই নাগরিক। তাহলে অন্য ধর্মের প্রতি হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ কোরআন অনুমতি দেয় না।এবং দুদিন আগে যেটা ঘটে গেল শিল্পকলা একাডেমির সম্মুখে, সেটা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এরা কারা? এদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছে। গ্রাফিতিতে কালি দিয়ে এরা সেই বিষবাষ্প বপন করতে চায়। সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮ আয়াতের আলোকে- “মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন আল্লাহ ছাড়া যাদের অন্যরা উপাসনা করে তাদের গালমন্দ না করে। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত তারা শত্রুতার কারণে আল্লাহকে গালি দিতে পারে।”

জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি জাতি কেবল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের সমষ্টি নয়; তার ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, স্মৃতি, সংগীত, জীবনাচার, মূল্যবোধ ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতাও জাতীয় পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে।

“জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে একটি জাতির সদস্য হিসেবে অনুভব করে এবং সেই জাতির আত্মপরিচয়, স্বার্থ, মর্যাদা কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়।”

“সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রকাশ”। একটি জাতি যখন নিজের ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন তার মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে নোবেল পাওয়া একমাত্র কবি ও বিশ্বকবি, তাকে অবহেলা করার দায় বাংলাদেশ নিতে পারেনা। কিছুদিন আগে দৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি সমস্ত লেখা বৌদির জন্যই লিখেছেন। এটা অজ্ঞতা ও সাম্প্রদায়িক নোংরামি ছাড়া কোনভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

“পরশ যাঁরে যায় না করা
সকল দেহে দিলেন ধরা”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটা কোন বৌদির জন্য লিখেছিলেন?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা এই আত্মপরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দেখায়, সাংস্কৃতিক প্রকাশ মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও মর্যাদাবোধকে শক্তিশালী করতে পারে। সংস্কৃতি যদি মানবিকতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দেয়, তবে জাতীয়তাবাদও এই মূল্যবোধগুলো থেকে শক্তি পেতে পারে।

কিন্তু সংস্কৃতিকে যদি কেবল অতীতের গৌরব প্রচার, অন্য জাতিকে হেয় করা অথবা একটি গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা জাতীয়তাবাদের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। ৫২ এর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে রূপান্তরিত করেছিল। মাতৃভাষার স্বীকৃতি ছিল আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের দাবি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রাজনৈতিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা-সংস্কৃতি এবং বৈষম্যের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য কবিরা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে আর আমরা সেটা বহন করে চলেছি। এখন রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলবেন? না বাংলা ভাষাকে মুছে ফেলবেন?গভীরভাবে বিবেককে প্রশ্ন করুন? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেবল সাংস্কৃতিক আবেগ বা কেবল রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, দর্শন ও সমাজচিন্তায় সাম্প্রদায়িকতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক বিভাজন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িকতা এক বিষয় নয়। ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হতে পারে; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় যখন অন্য মানুষকে ঘৃণা, অবজ্ঞা কিংবা বঞ্চনা করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা মানবতার পরিপন্থী। সাম্প্রদায়িকতা বলতে সাধারণত এমন মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে মানুষ নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থকে সর্বোচ্চ বলে মনে করে এবং অন্য সম্প্রদায়কে প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু কিংবা অধিকারহীন হিসেবে দেখতে শুরু করে। প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা সহনাগরিককে আর স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে দেখা হয় একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে। আর এর জ্বলন্ত উদাহরণ হল বর্তমান ভারত। সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প এমন ভাবে ছড়িয়েছে যে পুরো ভারতকেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছে, আর মুক্তচিন্তার মানুষগুলো সম্ভবত অসহায়। ফলে যা ঘটার তাই ঘটছে। আরশোলারা খেপেছে, যন্তর মন্তরে গত দু-তিন দিন যাবত তারই চিত্রায়ন ঘটছে। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এবং দলীয় বিবেচনায় নিজ দেশের নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বা নাগরিকত্বকে অস্বীকার করছে, ভোটাধিকার খর্ব করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে, ভাবা যায়? কত গভীর ষড়যন্ত্র, বিবেকহীনতা ও বিচার শূন্যতা! তারাই আবার আমাদের দেশকে সাম্প্রতিকতার ছবক দেয়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যাবত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। দুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফীতিতে যে কালি দেওয়া হলো সেটা বাংলাদেশ নয়! এটা সাম্প্রতিকতার বিষ বাষ্প এই উপমহাদেশে ভারত-ই আমদানি করে ছেড়ে দিয়েছে। আর তার উত্তাপ থেকে বাংলাদেশও রেহাই পাচ্ছে না এটাই বাস্তবতা।

রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় ফেরা যাক , রবীন্দ্রনাথের সমাজদর্শনের আলোকে এই প্রক্রিয়ার মূল বিপদ হলো—মানুষের বিবেক, বিচারবুদ্ধি ও ব্যক্তিসত্তা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে পরাজিত হয়। ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সা, আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিক আপসের প্রবণতা কাজ করে। মানুষকে চিন্তা করতে শেখানোর পরিবর্তে উত্তেজিত করে তোলা হয়।

কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পদ্ধতি সমর্থন না করলে তাকে দেশবিরোধী বলে সন্দেহ করার প্রবণতা দেখা দেয়। নৈতিক অবস্থানের সংঘাতের মাধ্যমে আবেগনির্ভর রাজনীতির বিপদ উন্মোচন করেছে।

কোনো রাজনৈতিক আদর্শ তখনই মহৎ, যখন তা মানুষের জীবন ও মর্যাদাকে রক্ষা করে। দেশপ্রেম মানে দেশের সব মানুষের কল্যাণ কামনা করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ করার নৈতিক অনুমতি দেয় না।  রাজনৈতিক নেতা যখন মানুষের বিবেকের চেয়ে তার আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন দেশপ্রেমও বিভেদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। একটি দেশের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসারী হতে পারেন। কারও বংশ বা ধর্মের ভিত্তিতে তাকে উচ্চ কিংবা নীচ বলে বিচার করা অন্যায়। কোনো সম্প্রদায়কে জাতির বাইরে রেখে সর্বজনীন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা স্ববিরোধী। কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ধর্মীয় আচার পালন করেও যদি অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করেন, দুর্বলকে বঞ্চিত করেন কিংবা মিথ্যা প্রচার করেন, তবে তাঁর আচরণের সঙ্গে ধর্মের নৈতিক আদর্শের সংঘাত তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দৃষ্টিতে মানুষের মূল্য নির্ধারণে তার মানবিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় পরিচয়কে নৈতিকতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। যখন কোনো জাতি বা সম্প্রদায় নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মকে সর্বোচ্চ প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যদের অবদান অস্বীকার করে, তখন আত্মমর্যাদা আত্মগরিমায় পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বাংলার মানুষের ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ দিক হলো—তিনি কেবল রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলেননি; তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে প্রকৃত সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হোক।

বাংলার সমাজ গড়ে উঠেছে বহু ধর্ম, ভাষা, আচার ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সম্মিলনে। কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি হিসেবে এই সমাজকে দেখা যায় না। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখেও অন্যের বিশ্বাস, অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করা সম্ভব। সম্প্রীতির জন্য সবাইকে একই ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করতে হয় না। রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক—প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, বিপদে সাহায্য, ন্যায্য অধিকার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সম্প্রীতির শক্তিশালী ভিত্তি।

কোনো মহৎ উদ্দেশ্যই মানবিক বিবেক ও নৈতিক দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নয়। ধর্মীয় পরিচয়কে ভোট, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে সম্প্রদায়গত বিভাজন গভীর হতে পারে।কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সহিংসতা বা অন্যায়ের প্রতিকার না হলে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

বাংলার সাহিত্য, সংগীত, ভাষা ও লোকসংস্কৃতি বিভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করার অর্থ ধর্মীয় পার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং পার্থক্য বজায় রেখেও একটি যৌথ সমাজ গড়ে তোলা।

রবীন্দ্রনাথের চিন্তার আলোকে বলা যায়, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ঐক্যের স্লোগান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান, সামাজিক সহযোগিতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিকত্ব।

সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা, ন্যায়সংগত আইন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথের রচনায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে নৈতিক অবস্থান ফুটে ওঠে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন বিবেক, ন্যায়বোধ এবং ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা। ঘরে বাইরে দেখায়, দেশপ্রেমের নামে আবেগকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। গোরা দেখায়, ধর্মীয় ও জন্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক পরিচয় উপলব্ধি করার সম্ভাবনা। চার অধ্যায় সতর্ক করে দেয়, কোনো আদর্শের নামে অন্ধ আনুগত্য ও সহিংসতা কীভাবে মানুষের স্বাধীনতা ও নৈতিকতাকে বিপন্ন করতে পারে। আপনার বিবেচনার জন্যই রবীন্দ্র দর্শনকে বারবার তুলে এনেছি।

একটি জাতি তখনই তার সংস্কৃতির প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করতে পারে, যখন সেই সংস্কৃতির ভালোবাসা মানুষকে মানবিক করে, নাগরিকদের যুক্ত করে এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অধিকারকে সম্মান করতে শেখায়।

লেখক : কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

Share this news as a Photo Card