প্রাণের অস্তিত্ব আছে, এমন একমাত্র গ্রহ এখন পর্যন্ত পৃথিবীই। তবে মহাবিশ্বের কোথাও পৃথিবীর চেয়েও প্রাণের উপযোগী গ্রহ থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের ধারণা, সেখানে জলবায়ু উষ্ণ, পানি প্রচুর, আর প্রাণ টিকে থাকা ও বিবর্তিত হওয়ার জন্য পৃথিবীর তুলনায় কয়েক শ কোটি বছর বেশি সময় পাওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের গ্রহকে বলা হচ্ছে ‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস’, বাংলায় অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর চেয়ে সামান্য বড় কিছু গ্রহ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকা গ্রহ প্রাণের জন্য আরও উপযোগী হতে পারে।
সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ কী
বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, যেসব গ্রহে প্রাণের উদ্ভব, বিকাশ ও টিকে থাকার পরিবেশ পৃথিবীর চেয়েও ভালো হতে পারে, সেগুলোই সুপারহ্যাবিটেবল। এমন গ্রহ পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত হতে পারে, ভর হতে পারে পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ।
অভিকর্ষ বল বেশি হওয়ায় গ্রহগুলো ঘন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে। ফলে সেখানকার জলবায়ু তুলনামূলক উষ্ণ ও স্থিতিশীল থাকতে পারে। বড় লৌহকেন্দ্রের কারণে তৈরি হতে পারে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র, যা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে প্রাণকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে।
গবেষকদের ধারণা, এসব গ্রহে বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ ও দ্বীপ থাকতে পারে। পৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ ও অগভীর জলরাশিতে জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র দেখা যায়। এমন পরিবেশ কোনো গ্রহের বিশাল এলাকাজুড়ে থাকলে সেখানে আরও বেশি প্রজাতির প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
কমলা নক্ষত্র কেন গুরুত্ব পাচ্ছে
গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামের এক ধরনের বামন নক্ষত্র। এগুলো সূর্যের চেয়ে আকারে ছোট, শীতল ও কমলা রঙের। এসব নক্ষত্র জ্বালানি পোড়ায় খুব ধীরে, তাই কয়েক শ কোটি নয়, বরং কয়েক হাজার কোটি বছর পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে আলো ছড়াতে পারে। ফলে এমন নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরা গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের জন্য অনেক বেশি সময় মিলতে পারে।
জার্মানির বার্লিনের একটি গবেষণাগারে জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচ ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নক্ষত্রের আলোর মতো কৃত্রিম আলো তৈরি করে একটি পরীক্ষা চালান। সেই কমলা আলোয় তিনি শাক চাষ করেন। দেখা যায়, কৃত্রিম সূর্যালোকের তুলনায় কমলা আলোয় উদ্ভিদগুলো দ্রুত বেড়েছে এবং বেশি লম্বা হয়েছে। এ থেকে ধারণা মেলে, ওই ধরনের নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরা গ্রহেও সালোকসংশ্লেষণ, অর্থাৎ আলো ব্যবহার করে উদ্ভিদের শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া, কার্যকরভাবে ঘটতে পারে।
বর্তমানে জার্মানির লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসে কর্মরত ভিলোভিচ দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানে এসব নক্ষত্রের আলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
পৃথিবীই কি সবচেয়ে উপযোগী
পৃথিবীর চেয়েও বাসযোগ্য গ্রহ থাকার ধারণাটি ২০১০-এর দশকে বিজ্ঞানীদের আলোচনায় আসে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং এ নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের মত, প্রাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশের মানদণ্ড হিসেবে শুধু পৃথিবীকে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ২০১৪ সালে তাঁরা এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কেবল পৃথিবীর মতো গ্রহ খোঁজার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
পৃথিবীতে প্রাণের বৈচিত্র্য বিপুল হলেও এখানে প্রাণের টিকে থাকা বেশ কিছু সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী সূর্যের সামান্য কাছাকাছি থাকলে এর সমুদ্রগুলো হয়তো বর্তমানের মতো তৈরি হতে পারত না। আবার সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা পৃথিবীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। গবেষকদের হিসাবে, প্রায় ৫০ কোটি বছর পর উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ জটিল জীবনের জন্য পৃথিবী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সূর্যের তুলনায় কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রের বিবর্তন ঘটে অনেক ধীরগতিতে। তাই এসব নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরা গ্রহ আরও দীর্ঘ সময় প্রাণের উপযোগী থাকতে পারে। এতে আরও জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণের উদ্ভবের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সেখানে কি ভিনগ্রহের প্রাণী থাকতে পারে
কিছু গবেষক এমন গ্রহের কল্পনা করছেন, যেখানে আছে অগভীর সমুদ্র, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ আর প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর সামুদ্রিক পরিবেশ। তবে পৃথিবীর বাইরে এমন বাস্তুতন্ত্রের কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। অনুকূল পরিবেশ থাকলেই যে সেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
এ কারণে গবেষকেরা এমন গ্রহ শনাক্তের চেষ্টা করছেন, যেখানে উপযুক্ত তাপমাত্রা, তরল পানি ও বায়ুমণ্ডল আছে। পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে প্রাণের ইঙ্গিত দিতে পারে, এমন কোনো গ্যাস আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সন্ধান মিলবে কীভাবে
সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করতে শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ অভিযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালে। এর মাধ্যমে প্রাণের উপযোগী হতে পারে, এমন গ্রহ শনাক্ত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরা বড় আকারের পাথুরে গ্রহও থাকতে পারে। এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হেলারের ধারণা, এতে প্রাণের জন্য সম্ভাবনাময় বেশ কয়েকটি গ্রহের খোঁজ মিলতে পারে।
তবে গ্রহ শনাক্ত করা হবে কেবল প্রথম ধাপ। এরপর সেগুলোর বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করে দেখতে হবে, প্রাণের ইঙ্গিতবাহী কোনো গ্যাস আছে কি না। এ ক্ষেত্রে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ থেকেও আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। ২০৪০-এর দশকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র। এটি দূরবর্তী গ্রহে প্রাণের সম্ভাব্য লক্ষণ খোঁজার কাজে আরও উন্নত সক্ষমতা দিতে পারে।
এখনো অনুমানের স্তরে
সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের ধারণা এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের কোনো গ্রহের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। আপাতত এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, নিশ্চিত কোনো আবিষ্কার নয়। ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানগুলো হয়তো একদিন সেই ধারণা বদলে দিতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
চলমান বার্তা ডেস্ক : 























