শিরোনাম :
আদর্শবান সাংবাদিকরাই স্বৈরাচার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন: রিজভী বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে ছিটকে গেলেন মেসি-এমবাপ্পে, জানাল এআই কাঁটাতারে আটকা ১৩০ হাতি, কূটনীতির টেবিলেও মিলছে না সমাধান সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি ক্যাঙারু কোর্ট’ মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির আওয়ামীপন্থি দুই আইনজীবী, চাইলেন নিঃশর্ত ক্ষমা কে পাঠালেন উড়োজাহাজে করে পরীমনিকে শিউলি ফুল? ফেব্রুয়ারি ছেড়ে জানুয়ারিতে বইমেলা, প্রশ্ন উঠছে একুশের চেতনা নিয়ে পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড় ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা নিয়ে গেম ‘বাপের রাস্তা’

কাঁটাতারে আটকা ১৩০ হাতি, কূটনীতির টেবিলেও মিলছে না সমাধান

কাঁটাতারের বেড়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় ভারত সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে আটকা পড়েছে ১৩০টিরও বেশি বন্য হাতি। বিষয়টি এখন কূটনৈতিক আলোচনার পর্যায়েও পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ভারতকে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, কিন্তু সমাধানের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

সীমান্তের একপাশে ভারতের মেঘালয়, অন্যপাশে বাংলাদেশের শেরপুরসহ ময়মনসিংহ অঞ্চল। দুই দেশের মাঝখানে গারো পাহাড়ের বন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে এই হাতিদের বিচরণ।

বন্ধ হয়ে গেছে চলার পথ

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় হাতি চলাচলের জন্য ৪৪টি গেট এবং ১১টি নদী বা ছড়াপথ ছিল। বছরের পর বছর এসব পথ ধরে দুই দেশেই ঘুরে বেড়াত হাতির দলগুলো। দুই দেশের সীমানা পেরিয়ে চলাচল করে বলেই এদের বলা হয় ‘ক্রস বাউন্ডারি এলিফ্যান্ট’।

ময়মনসিংহের বন বিভাগ ও গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মেঘালয় অংশে হাতি চলাচলের এমন বেশ কিছু পথে কাঁটাতারের বেড়া ও গেট বসানো হয়েছে। আবার ভারতের যেসব জায়গায় হাতি আগে বিচরণ করত, তার কিছু অংশে কৃষকরা কাজুবাদামের চাষ শুরু করেছেন। ফলে সেখানেও হাতির যাওয়ার উপায় নেই।

নালিতাবাড়ি বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জের কর্মকর্তা আব্দুল করিম এই এলাকায় হাতির আচরণ ও গতিবিধি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তিনি বলেন, হাতি যেসব পথে চলাচল করত, সেগুলো এখন কাঁটাতারে আটকানো, কোথাও কোথাও গেটও বসানো। এর ওপর ওপারে অনেক জায়গায় কাজুবাদামের চাষ হওয়ায় হাতি সেখানে খাবারও পায় না। এ কারণেই হাতিগুলো এখন বাংলাদেশেই থেকে যাচ্ছে।

গবেষক সারোয়ার আলম দীপুর বক্তব্যও একই রকম। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের এই প্রোগ্রাম ম্যানেজার বলেন, বেড়া ও গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতি আর ওপারে যেতে পারছে না। নদীপথের কিছু ফাঁক গলে কিছু হাতি গেলেও সেখানে খাবার মিলছে না।

বন বিভাগ ও গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরেকটি পরিবর্তনও ধরা পড়েছে। আগে এই হাতিগুলো বেশির ভাগ সময় ভারত অংশে থাকত, বছরে অন্তত দুইবার বাংলাদেশে আসত। এখন সারা বছরই এদের বাংলাদেশ অংশে দেখা যাচ্ছে।

এক দশকে বেড়েছে হাতির সংখ্যা

আইইউসিএনের তথ্য বলছে, মাত্র এক দশক আগেও এই সীমান্ত এলাকায় ৫০টির মতো হাতি ছিল। সংস্থাটির সর্বশেষ গবেষণা হয় ২০১৬ সালে। তাতে শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৫১টির মতো হাতি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ অংশে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এখন সংস্থাটির ধারণা, এই সংখ্যা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫-এ দাঁড়িয়েছে।

খাবারের খোঁজে লোকালয়ে

শেরপুরের নালিতাবাড়ির পানিহাটা সীমান্তে একটি বড় হাতির দলের খবর পেয়ে সেখানে যাওয়া হয়। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঘন জঙ্গল থেকে খাবারের খোঁজে ফাঁকা জায়গায় নেমে আসে অন্তত ২২টি হাতি। ছোট-বড় সব বয়সের হাতি কাদাপানিতে খেলায় মেতে ওঠে। মা হাতি শাবককে পানি খাওয়াতে ব্যস্ত, কোনো শাবক আবার গায়ে ধুলোমাটি ছিটাচ্ছে।

শাবকের ত্বক সংবেদনশীল। পোকামাকড়ের কামড় আর রোদের তাপ থেকে বাঁচতে তারা প্রায়ই গায়ে ধুলোবালি মাখে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে হাতি দীর্ঘ সময় ধরে শাবকের যত্ন নেয়, এই দলেও মা হাতিদের সন্তানদের আগলে রাখতে দেখা গেছে।

বনের ভেতরের ছোট নালায় কিছু পানি থাকলেও খাবারের সংকট যে প্রকট, তা বোঝা যায় হাতিগুলোর আকাশমণি গাছের বাকল ছিঁড়ে খাওয়া দেখে। ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম বলেন, একটি এশীয় বন্য হাতির প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং প্রায় সমপরিমাণ পানি লাগে। এটি জোগাড় করতে তাদের অনেক পথ ঘুরতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে বনে খাবার কমে গেলে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে। সন্ধ্যার ঠিক আগে পানিহাটায়ও সেই দৃশ্যই দেখা গেছে।

হাতি ও মানুষের সংঘাত

গারো পাহাড়ের এই বনে হাতির অভয়ারণ্য অনেক আগে থেকেই ছিল। কিন্তু আইইউসিএনের সারোয়ার আলম দীপুর ভাষ্যে, সময়ের সঙ্গে সেখানে ফসলি জমি, গবাদিপশুর বিচরণ ও মানুষের বসতি বেড়েছে। হাতির আবাস ছোট হয়ে আসায় সংঘাতও বাড়ছে।

হাতির হানা ঠেকাতে শেরপুর ও ময়মনসিংহের অনেক ফসলি জমি ও বাড়ির চারপাশে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। নালিতাবাড়ির কৃষক মোস্তাক হোসেন জানান, তিনি ধানখেতে তারের বেড়া দিয়ে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছেন। সন্ধ্যা নামলেই হাতি খেতে ও লোকালয়ে আসে, তাই এই ব্যবস্থা। হালুয়াঘাটের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, বিদ্যুতের ছোঁয়া পেলে হাতি সরে যায়। এ ছাড়া পটকা ফুটিয়ে ও মশাল জ্বালিয়েও তারা হাতি তাড়ান।

বনের ভেতরের নানা জায়গায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। পাহারার জন্য ছোট টিলার ওপর খুপরি ঘর তোলা হয়েছে, আর খেতের চারপাশে তারের বেড়ায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পানিহাটা সীমান্তে সন্ধ্যার কিছু আগে একদল হাতি এলে স্থানীয় কৃষকদের ধারালো অস্ত্র হাতে সেগুলোকে ধাওয়া করতেও দেখা গেছে।

বন বিভাগের তথ্যে, গত এক যুগে শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অন্তত ৩৫টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, গুলিতে এবং কখনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতেও হাতির মৃত্যু হয়েছে।

শেরপুরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার বলেন, সন্ধ্যার পর, কখনো কখনো দিনের আলোতেও মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত হচ্ছে। সচেতনতা তৈরির চেষ্টাও চলছে। এলাকায় হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষায় স্থানীয়দের নিয়ে একটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এত উদ্যোগের পরও সংকট তেমন কমেনি।

কাজী নুরুল করিমের ভাষ্য, মানুষ বিরক্ত না করলে হাতি সাধারণত ক্ষতি করে না। সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রেখেছে এবং প্রাণহানি বা ফসলের ক্ষতি হলে তদন্ত করে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। সভা-সেমিনারেও হাতির ক্ষতি না করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকেই হাতিকে বিরক্ত করছেন, ফলে ক্ষুব্ধ হাতি হামলা চালায় এবং কখনো মানুষও মারা যায়।

কূটনৈতিক উদ্বেগ, ভারতের জবাব নেই

এই হাতিগুলো শুধু বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নয়, দুই দেশের সীমান্ত এলাকাতেই এদের বসবাস। বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংকটের বিষয়ে উদ্বেগের কথা ইতোমধ্যে ভারতকে জানানো হয়েছে।

বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভারতকে বলা হয়েছে যে সুন্দরবনের বাঘ যেমন দুই দেশেই যাতায়াত করে, হাতির ক্ষেত্রেও তেমন পথ খুলে দিতে হবে, নইলে সংকট থেকেই যাবে। তিনি আশা করছেন, ভারত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। তাঁর মতে, ভারত উদ্যোগী না হলে সংকট সহজে কাটবে না।

এ বিষয়ে মেঘালয় রাজ্যের বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তারা জবাব দেয়নি।

গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, হাতির অবাধ চলাচল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধান না হলে কয়েক বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতন: মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা, প্রশ্নের মুখে নজরদারি

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ঢাকার সড়কে অটোরিকশার উল্টো পথে চলা নিয়ে গেম ‘বাপের রাস্তা’

২৫ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

কাঁটাতারে আটকা ১৩০ হাতি, কূটনীতির টেবিলেও মিলছে না সমাধান

আপডেট সময় ০৩:৪০:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কাঁটাতারের বেড়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় ভারত সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে আটকা পড়েছে ১৩০টিরও বেশি বন্য হাতি। বিষয়টি এখন কূটনৈতিক আলোচনার পর্যায়েও পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ভারতকে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, কিন্তু সমাধানের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

সীমান্তের একপাশে ভারতের মেঘালয়, অন্যপাশে বাংলাদেশের শেরপুরসহ ময়মনসিংহ অঞ্চল। দুই দেশের মাঝখানে গারো পাহাড়ের বন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে এই হাতিদের বিচরণ।

বন্ধ হয়ে গেছে চলার পথ

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় হাতি চলাচলের জন্য ৪৪টি গেট এবং ১১টি নদী বা ছড়াপথ ছিল। বছরের পর বছর এসব পথ ধরে দুই দেশেই ঘুরে বেড়াত হাতির দলগুলো। দুই দেশের সীমানা পেরিয়ে চলাচল করে বলেই এদের বলা হয় ‘ক্রস বাউন্ডারি এলিফ্যান্ট’।

ময়মনসিংহের বন বিভাগ ও গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মেঘালয় অংশে হাতি চলাচলের এমন বেশ কিছু পথে কাঁটাতারের বেড়া ও গেট বসানো হয়েছে। আবার ভারতের যেসব জায়গায় হাতি আগে বিচরণ করত, তার কিছু অংশে কৃষকরা কাজুবাদামের চাষ শুরু করেছেন। ফলে সেখানেও হাতির যাওয়ার উপায় নেই।

নালিতাবাড়ি বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জের কর্মকর্তা আব্দুল করিম এই এলাকায় হাতির আচরণ ও গতিবিধি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তিনি বলেন, হাতি যেসব পথে চলাচল করত, সেগুলো এখন কাঁটাতারে আটকানো, কোথাও কোথাও গেটও বসানো। এর ওপর ওপারে অনেক জায়গায় কাজুবাদামের চাষ হওয়ায় হাতি সেখানে খাবারও পায় না। এ কারণেই হাতিগুলো এখন বাংলাদেশেই থেকে যাচ্ছে।

গবেষক সারোয়ার আলম দীপুর বক্তব্যও একই রকম। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের এই প্রোগ্রাম ম্যানেজার বলেন, বেড়া ও গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতি আর ওপারে যেতে পারছে না। নদীপথের কিছু ফাঁক গলে কিছু হাতি গেলেও সেখানে খাবার মিলছে না।

বন বিভাগ ও গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরেকটি পরিবর্তনও ধরা পড়েছে। আগে এই হাতিগুলো বেশির ভাগ সময় ভারত অংশে থাকত, বছরে অন্তত দুইবার বাংলাদেশে আসত। এখন সারা বছরই এদের বাংলাদেশ অংশে দেখা যাচ্ছে।

এক দশকে বেড়েছে হাতির সংখ্যা

আইইউসিএনের তথ্য বলছে, মাত্র এক দশক আগেও এই সীমান্ত এলাকায় ৫০টির মতো হাতি ছিল। সংস্থাটির সর্বশেষ গবেষণা হয় ২০১৬ সালে। তাতে শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৫১টির মতো হাতি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ অংশে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এখন সংস্থাটির ধারণা, এই সংখ্যা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫-এ দাঁড়িয়েছে।

খাবারের খোঁজে লোকালয়ে

শেরপুরের নালিতাবাড়ির পানিহাটা সীমান্তে একটি বড় হাতির দলের খবর পেয়ে সেখানে যাওয়া হয়। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঘন জঙ্গল থেকে খাবারের খোঁজে ফাঁকা জায়গায় নেমে আসে অন্তত ২২টি হাতি। ছোট-বড় সব বয়সের হাতি কাদাপানিতে খেলায় মেতে ওঠে। মা হাতি শাবককে পানি খাওয়াতে ব্যস্ত, কোনো শাবক আবার গায়ে ধুলোমাটি ছিটাচ্ছে।

শাবকের ত্বক সংবেদনশীল। পোকামাকড়ের কামড় আর রোদের তাপ থেকে বাঁচতে তারা প্রায়ই গায়ে ধুলোবালি মাখে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে হাতি দীর্ঘ সময় ধরে শাবকের যত্ন নেয়, এই দলেও মা হাতিদের সন্তানদের আগলে রাখতে দেখা গেছে।

বনের ভেতরের ছোট নালায় কিছু পানি থাকলেও খাবারের সংকট যে প্রকট, তা বোঝা যায় হাতিগুলোর আকাশমণি গাছের বাকল ছিঁড়ে খাওয়া দেখে। ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম বলেন, একটি এশীয় বন্য হাতির প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং প্রায় সমপরিমাণ পানি লাগে। এটি জোগাড় করতে তাদের অনেক পথ ঘুরতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে বনে খাবার কমে গেলে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে। সন্ধ্যার ঠিক আগে পানিহাটায়ও সেই দৃশ্যই দেখা গেছে।

হাতি ও মানুষের সংঘাত

গারো পাহাড়ের এই বনে হাতির অভয়ারণ্য অনেক আগে থেকেই ছিল। কিন্তু আইইউসিএনের সারোয়ার আলম দীপুর ভাষ্যে, সময়ের সঙ্গে সেখানে ফসলি জমি, গবাদিপশুর বিচরণ ও মানুষের বসতি বেড়েছে। হাতির আবাস ছোট হয়ে আসায় সংঘাতও বাড়ছে।

হাতির হানা ঠেকাতে শেরপুর ও ময়মনসিংহের অনেক ফসলি জমি ও বাড়ির চারপাশে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। নালিতাবাড়ির কৃষক মোস্তাক হোসেন জানান, তিনি ধানখেতে তারের বেড়া দিয়ে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছেন। সন্ধ্যা নামলেই হাতি খেতে ও লোকালয়ে আসে, তাই এই ব্যবস্থা। হালুয়াঘাটের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, বিদ্যুতের ছোঁয়া পেলে হাতি সরে যায়। এ ছাড়া পটকা ফুটিয়ে ও মশাল জ্বালিয়েও তারা হাতি তাড়ান।

বনের ভেতরের নানা জায়গায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। পাহারার জন্য ছোট টিলার ওপর খুপরি ঘর তোলা হয়েছে, আর খেতের চারপাশে তারের বেড়ায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পানিহাটা সীমান্তে সন্ধ্যার কিছু আগে একদল হাতি এলে স্থানীয় কৃষকদের ধারালো অস্ত্র হাতে সেগুলোকে ধাওয়া করতেও দেখা গেছে।

বন বিভাগের তথ্যে, গত এক যুগে শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অন্তত ৩৫টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, গুলিতে এবং কখনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতেও হাতির মৃত্যু হয়েছে।

শেরপুরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার বলেন, সন্ধ্যার পর, কখনো কখনো দিনের আলোতেও মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত হচ্ছে। সচেতনতা তৈরির চেষ্টাও চলছে। এলাকায় হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষায় স্থানীয়দের নিয়ে একটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এত উদ্যোগের পরও সংকট তেমন কমেনি।

কাজী নুরুল করিমের ভাষ্য, মানুষ বিরক্ত না করলে হাতি সাধারণত ক্ষতি করে না। সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রেখেছে এবং প্রাণহানি বা ফসলের ক্ষতি হলে তদন্ত করে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। সভা-সেমিনারেও হাতির ক্ষতি না করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকেই হাতিকে বিরক্ত করছেন, ফলে ক্ষুব্ধ হাতি হামলা চালায় এবং কখনো মানুষও মারা যায়।

কূটনৈতিক উদ্বেগ, ভারতের জবাব নেই

এই হাতিগুলো শুধু বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নয়, দুই দেশের সীমান্ত এলাকাতেই এদের বসবাস। বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংকটের বিষয়ে উদ্বেগের কথা ইতোমধ্যে ভারতকে জানানো হয়েছে।

বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভারতকে বলা হয়েছে যে সুন্দরবনের বাঘ যেমন দুই দেশেই যাতায়াত করে, হাতির ক্ষেত্রেও তেমন পথ খুলে দিতে হবে, নইলে সংকট থেকেই যাবে। তিনি আশা করছেন, ভারত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। তাঁর মতে, ভারত উদ্যোগী না হলে সংকট সহজে কাটবে না।

এ বিষয়ে মেঘালয় রাজ্যের বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তারা জবাব দেয়নি।

গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, হাতির অবাধ চলাচল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধান না হলে কয়েক বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card