কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে গত ছয় বছরে পাঁচটি শিশুকে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামবাসীর দাবি, শিশুদের বিক্রি করেছেন তাদের নিজেদের বাবা-মা। অভিযোগের চারটি ঘটনা গত দুই বছরের, আর দুটি শিশু একই দম্পতির সন্তান। অভিযুক্ত দুই বাবা বলছেন, তাঁরা সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন, কোনো টাকার লেনদেন হয়নি। তিনটি শিশুর খোঁজ তাদের পরিবারও জানে না। সর্বশেষ ঘটনাটি গড়িয়েছে থানা পর্যন্ত।
নবজাতকের খোঁজ নেই
গত ২ সেপ্টেম্বর ফারজানা বেগম একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। তাঁর স্বামী অটোরিকশাচালক জাকির মিয়া ৬ সেপ্টেম্বর কটিয়াদী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্ত্রী শিশুটিকে বিক্রি করে দিয়েছেন। অভিযোগটি করা হয়েছে স্ত্রী ও স্বজনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জাকিরের বাড়িটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর, দেয়ালে মরিচা আর ফুটো। জাকির বলেন, ফারজানা তাঁকে জানিয়েছেন, ছেলের বিনিময়ে তিনি ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন। জাকিরের আক্ষেপ, ‘পুতের মুখটাও দেখতে পারলাম না। এখন তিন বাচ্চার একটাও আমার কাছে নাই। আমার পুত কোনখানে আছে, তা-ও জানি না। বউও নাকি জানে না।’
জাকিরের ভাষ্য, ঘটনার পর ফারজানা মায়ের বাড়িতে ছিলেন, এখন বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে লুকিয়ে আছেন। মুঠোফোনে ফারজানা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর কথা, ‘আমি না, আমার সন্তান বেইছা দিছে আমার স্বামী।’ তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত। দুজনের বক্তব্যে মিল একটাই: নবজাতক এখন কোথায়, তা কেউ জানেন না।
কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম ২৯ সেপ্টেম্বর জানান, জাকির মিয়া তাঁর অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।
দত্তক, না বিক্রি
গ্রামের আরও কয়েকটি পরিবারের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আছে। ‘বল জাকির’ নামে পরিচিত আরেক জাকির মিয়া ও তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুই বছর আগে তাঁরা তৃতীয় সন্তানকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। কয়েকজন গ্রামবাসীর ভাষ্য, ওই সময় দুজনই মাদকে আসক্ত ছিলেন। অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় এক বছর আগে ফেরদৌসী দুই সন্তান নিয়ে অন্যত্র চলে যান।
বল জাকিরের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘নেশাফেশার টেহার লাইগ্গা এই সব কিছু না, পালক (দত্তক) দিছি।’ কার কাছে দিয়েছেন, বলতে পারেননি। সন্তানের সঙ্গে দুই বছরে দেখা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে প্রথমে বলেন ‘হইছে’, পরে ‘না’, শেষে বলেন তিনি তার খোঁজ জানেন না।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে দুই সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী রেহেনা বেগম (৬০) বলেন, এক দশকে সাদ্দাম তিনটি বিয়ে করেছেন এবং তিনি মাদকাসক্ত। প্রথম স্ত্রীর মেয়েকে ছয় বছর আগে অন্যের কাছে দিয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা জানান, তৃতীয় স্ত্রী সোহেনা বেগমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে তিনি নবজাতক ছেলে আলহাতকে বিক্রি করেছেন। রেহেনা চার-পাঁচ মাস আগেও এই দম্পতিকে দেখেছেন, কিন্তু তখন আলহাত ছিল না। এখন কাউকেই দেখেন না।
সাদ্দামের মা নূর জাহান বেগম বলেন, ‘প্রায় ছয় মাস ধইরা পুতেরওই (সাদ্দাম) খবর নাই, নাতি পাইব কই?’ তাঁর ভাষ্য, বড় নাতনিকে পালক দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তার খোঁজ জানেন। আলহাতকেও পালক দেওয়া হয়েছে বলে জানান, তবে কোথায়, তা জানেন না।
আসাদ ফকির ও তাঁর স্ত্রী সোমা আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রায় ১০ মাস আগে তাঁরা সদ্যোজাত সন্তানকে বিক্রি করেছেন। আসাদ বলেন, প্রতিবেশী কুতুব মিয়ার মাধ্যমে শিশুটিকে আত্মীয়ের কাছে পালক দিয়েছেন, টাকা নেননি। তাঁর দাবি, শিশুটি এক প্রবাসী পরিবারে আছে এবং তাঁরা মাঝেমধ্যে খোঁজ নেন। কুতুব বলেন, তাঁর মেয়ে শিশুটিকে দত্তক নিয়েছেন, কোনো লেনদেন হয়নি।
হাতবদলের কোনো ঘটনারই সাক্ষী পাওয়া যায়নি। জাকির মিয়ার সন্তান বাদে বাকিদের জন্ম বাড়িতে, কারও জন্মনিবন্ধনের তথ্যও মেলেনি।

মাদক আর দারিদ্র্যের ছায়া
গ্রামের অনেকে কারণ হিসেবে মাদকাসক্তির কথা বলেছেন। অন্তত ছয়জন একই কথা বলেন। প্রতিবেশী সুমন মিয়ার আক্ষেপ, ‘চরপুক্ষিয়া আর চরপুক্ষিয়া নাই। মাদকপুক্ষিয়া হইয়া গেছে।’ কয়েকজনের দাবি, গ্রামে ইয়াবা ও গাঁজার নেশা বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে বলেও তাঁদের বক্তব্য।
কটিয়াদী থানার একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, গ্রামটিতে মাদকের সমস্যা আছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাঁরা তাৎক্ষণিক দিতে পারেননি। তাঁদের মতে, দারিদ্র্য আরও বড় সমস্যা। নতুন যোগ দেওয়া ওসি রফিকুল ইসলামও দারিদ্র্য ও অসচেতনতাকে বিক্রি বা দত্তক দেওয়ার বড় কারণ মনে করেন।
কৃষিনির্ভর এই গ্রামের অধিকাংশ পরিবার দরিদ্র। এক চায়ের দোকানে বসে প্রবীণ আবু কালাম বলেন, বাচ্চা বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যায় দেখে কারও কারও লোভ হয়, কারও আবার এটা স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশাসনের অবস্থান
কটিয়াদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ জানান, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকেরা চাইলে পাঁচ শিশুকে ফিরিয়ে আনতে তিনি সহযোগিতা করবেন। তবে এর জন্য বাবা-মাকে আগ্রহী হতে হবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 


















