বিশেষ প্রতিবেদন, ঢাকা
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁকে ঘিরে নানামুখী তৎপরতা ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন স্পষ্ট। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এবং বিশ্লেষকদের দাবি, ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের মিত্রদের প্রধান লক্ষ্য বা ‘টার্গেট’ এখন ড. ইউনূস।
কিন্তু কেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে চাইছে আওয়ামী লীগ? এর পেছনে কি কেবলই ক্ষমতার ক্ষোভ, নাকি আগামী আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক শোডাউনের নীল নকশা তৈরি হচ্ছে? এসব প্রশ্ন এখন ঢাকার রাজনৈতিক অলিন্দে বেশ জোরেশোরেই আলোচিত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র ও আইনি ব্যবস্থার চাপ
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিগত সরকারের আমলের বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে অর্থনীতি, প্রশাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখতে কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি বিশদ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের শীর্ষ নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স এই প্রসঙ্গে বলেন,
”অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিগত আমলের সমস্ত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের চিত্র তুলে ধরে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা জরুরি। একই সাথে যারা এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাই আওয়ামী লীগকে নতুন করে ড. ইউনূস বিরোধী অবস্থানে আরও উগ্র করে তুলেছে। নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা এবং আইনি চাপ থেকে বাঁচতে তারা ড. ইউনূসের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে।
শেখ হাসিনা ও ভারতের ‘প্রধান টার্গেট’ ড. ইউনূস?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আগমনকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা এবং খোদ ভারতের নীতি নির্ধারকদের একটি বড় অংশের নজর এখন ঢাকার ওপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এই বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে:
”সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধান টার্গেট বা লক্ষ্যই এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কারণ, ড. ইউনূসের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর যে মজবুত নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা শেখ হাসিনা ও তাঁর মিত্রদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।”
দিলারা চৌধুরীর এই বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, ড. ইউনূসকে যদি আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করা না যায়, তবে আওয়ামী লীগের পক্ষে পুনরায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। ফলে, দেশীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এই লড়াই এখন আন্তর্জাতিক স্তরে রূপ নিয়েছে।
কেন ড. ইউনূসকে ‘শত্রু’ মনে করে আওয়ামী লীগ?
আওয়ামী লীগের রাজনীতির দীর্ঘদিনের ধারা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি দলটির মনোভাব কখনোই ইতিবাচক ছিল না। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তীতে গ্রামীণ ব্যাংক ও পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে ড. ইউনূসের সাথে দলটির দূরত্ব তৈরি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, আওয়ামী লীগ মনে করে ড. ইউনূসের কর্মকাণ্ড ও দৃষ্টিভঙ্গি ‘মুক্তিযুদ্ধ ও দেশবিরোধী’ শক্তির সমার্থক। বিগত দেড় দশক ধরে দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার ড. ইউনূসকে লক্ষ্য করে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন তিনি দেশের ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন দলটির পুরনো সেই ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বৈরিতা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা মনে করছে, ড. ইউনূসকে সফল হতে দিলে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পড়বে।
আগস্টে বড় ধরনের শোডাউনের রূপরেখা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আগামী আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে গুঞ্জন। দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে ঢাকা এবং সারা দেশে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক শোডাউন বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ড. ইউনূস বিরোধী নানামুখী প্রোপাগান্ডা ও কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—আগস্টের শোকের মাসকে কেন্দ্র করে আবেগ ও রাজনৈতিক শক্তি খাটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইউনূসবিরোধী তৎপরতা
কেবল দেশের রাজপথেই নয়, ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে লবিস্ট নিয়োগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে লবিংয়ের খবরও চাউর হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক ফোরামে ড. ইউনূসের বক্তব্য ও গ্রহণযোগ্যতাকে ম্লান করতে নানামুখী এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে একটি মহল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দাবি, বিশ্ব দরবারে ড. ইউনূসের যে সুনাম ও সততার ভাবমূর্তি রয়েছে, তা কোনো ধরনের লবিং বা প্রোপাগান্ডা দিয়ে নষ্ট করা সম্ভব নয়। বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনতে আন্তর্জাতিক মহল ড. ইউনূসকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
শেষ কথা: কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি?
আওয়ামী লীগের এই ড. ইউনূস কেন্দ্রিক ‘টার্গেট পলিটিক্স’ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতিবাজদের বিচার এবং একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আপ্রাণ চেষ্টা; অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতা হারানো দলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও প্রতিশোধের রাজনীতি।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগস্টের শোডাউন কিংবা যেকোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড রুখতে হলে বর্তমান সরকারকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ড. ইউনূসকে কেন্দ্র করে যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলা চলছে, তা সুচতুর কূটনীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার কবলে পড়তে পারে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















