বাংলাদেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত পাঁচ মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৭৭৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে লক্ষাধিক। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ক্যাম্পেইন শেষের এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি করা হলেও, বাস্তবে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। মাঠ পর্যায়ের দুর্বল পরিকল্পনা এবং টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাওয়া লক্ষাধিক শিশুই এখন এই প্রাণঘাতী সংক্রমণের মূল শিকার হচ্ছে বলে মনে করছেন দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
টিকার বাইরে রয়ে গেছে লাখো শিশু
সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নিয়মানুযায়ী, সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। তবে চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের জন্য একটি বিশেষ হাম-রুবেলা জাতীয় ক্যাম্পেইন চালু করে। ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ কর্মসূচি শেষ হয় ২০ মে।
নথিপত্র অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০৩ শতাংশ টিকাদানের দাবি করা হলেও মাঠের বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা না থাকায় কয়েক লাখ শিশু এই বিশেষ টিকার আওতাভুক্ত হতে পারেনি। জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, দেশে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ১ কোটি ৮০ লাখের কিছু বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা সংক্রমণ অব্যাহত থাকার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা ও আইসিইউ সংকট
কেবল টিকার অভাবই নয়, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকেও এই বিপুল সংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী করছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস: হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৩৪ শিশুর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সেখানে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭১ শতাংশই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সুবিধা পায়নি। এছাড়া সঠিক ও জরুরি চিকিৎসার খোঁজে প্রায় ৮২ শতাংশ শিশুকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব, জীবনদায়ী অক্সিজেন ও জরুরি ওষুধের সীমাবদ্ধতা এবং এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তরে বিলম্বের কারণে শিশুরা চরম জীবনঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১০ জন হামাক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এদের বড় অংশই কোনো টিকা পায়নি।
পরিকল্পনার অভাব ও হার্ড ইমিউনিটি ঘাটতি
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ পুরোপুরি রুখতে হলে ন্যূনতম ৯৫ শতাংশ কার্যকর কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু এবার মাঠ পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকৃত শিশু সনাক্ত করার কাজে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।
রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, “সঠিক মাইক্রোপ্ল্যানিং ও প্রচারণার অভাবে বহু শিশু বাদ পড়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।” এছাড়া টিকা দেওয়ার পর শিশুদের শরীরে আদৌ কোনো প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা না করাকে বড় ফাঁক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকার বাইরেও মৃত্যুর ভয়ংকর থাবা
হামের এই ভয়াবহতা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই, ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখন পর্যন্ত ৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ফুলবাড়িয়া থেকে আসা এক শিশু হাসপাতালে মারা যায়। অন্যদিকে রংপুর বিভাগেও গত তিন মাসে ৯ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে আটজনই শিশু।
ভয়াবহ এই পরিস্থিতি থেকে শিশুদের বাঁচাতে টিকাদানের ভুলত্রুটি খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সুরক্ষার আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 





















