তাজমহল কি মন্দির ছিল, আবারও উঠল প্রশ্ন 

সাদা মার্বেলে গড়া অপূর্ব স্থাপত্য, খোদাই করা মিনার আর গম্বুজ-খিলানের অনন্য নকশা—তাজমহলের নাম শুনলেই এই ছবিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। দিল্লি থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অংশ এই স্থাপনা প্রায় ৪০০ বছর ধরে পরিচিত ‘প্রেমের প্রতীক’ হিসেবে। তবে এবার সেই তাজমহলকে ঘিরে আবারও দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।

একজন বিজেপি নেতা দাবি করেছেন, মমতাজ মহলের স্মৃতিতে নির্মিত এই স্থাপনার জায়গায় এক সময় ছিল একটি মন্দির, আর তার প্রমাণ নাকি আজও লুকিয়ে আছে তাজমহলের বেসমেন্টে। এই দাবি জানিয়ে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের জেলা আদালতে জরিপের আর্জিসহ পিটিশন দাখিল করেছিলেন তিনি। জেলা আদালত সেই পিটিশন খারিজ করলে তিনি দ্বারস্থ হন এলাহাবাদ হাই কোর্টের। এরপর হাই কোর্ট কেন্দ্র সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে নোটিশ পাঠিয়ে জরিপ প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৫ সালের আগে তাজমহল নিয়ে এমন কোনো বিতর্কই ছিল না, আর এর নির্মাণ সংক্রান্ত সব প্রমাণও যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। বিবিসির সঙ্গে আলাপে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা।

ইতিহাস বলছে, ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে মৃত্যু হয় মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের। তার স্মৃতিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন শাহজাহান এবং এ জন্য বেছে নেন আগ্রায় যমুনা নদীর তীরের একটি জায়গা, যা তখন ছিল রাজা জয় সিংয়ের অধিকারে। ইতিহাসবিদ আব্দুল হামিদ লাহোরির ‘বাদশাহনামা’ গ্রন্থ অনুযায়ী, ভিত্তিস্থাপনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল তাজমহলের নির্মাণকাজ, যা মূলত শেষ হয় ১৬৪৮ সালে, তবে খোদাই ও উদ্যানের কাজ শেষ হতে সময় লাগে আরও পাঁচ বছর।

তাজমহল ঘিরে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও তার সত্যতার কোনো প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন ড. শর্মা। এর মধ্যে একটি প্রচলিত গল্প হলো, শাহজাহান নাকি তাজমহল নির্মাণে জড়িত কারিগরদের হাত কেটে নিয়েছিলেন, যাতে দ্বিতীয় কোনো তাজমহল তৈরি না হয়। আরেকটি দাবি অনুযায়ী, তাজমহল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং তাতে হিন্দুদের মৃত্যু হয়—যদিও ড. শর্মার মতে এটি ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ভিত্তিহীন প্রচারণা মাত্র।

তাজমহল নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ১৯৬৫ সালে, যখন লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক দাবি করেন, এটি আসলে চতুর্থ শতাব্দীতে নির্মিত একটি রাজপুত প্রাসাদ, যা পরে তাজমহলে রূপান্তরিত করা হয়। ইতিহাসবিদ জাইলস টিলটসনের মতে, তাজমহলের মতো স্থাপনা নির্মাণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রাক-মুঘল আমলে ভারতে ছিলই না। পরে ১৯৮৯ সালে আরেকটি বইয়ে ওক দাবি করেন, এটি ছিল দ্বাদশ শতাব্দীর একটি মন্দির। প্রকৃতপক্ষে পিএন ওক ইতিহাসবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন আইনজীবী ও সাংবাদিক। ২০০০ সালে এই দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন তিনি, তবে আদালত তা সঙ্গে সঙ্গে খারিজ করে দেয়।

ড. শর্মার মতে, ওকের এই তত্ত্বকে নিছক কল্পনা ভেবে ভুলে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শী অমরনাথ মিশ্র ২০০৫ সালে ফের এলাহাবাদ হাই কোর্টে পিটিশন দাখিল করেন, যা প্রমাণের অভাবে তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ হয়ে যায়। ২০১৭ সালে এএসআইও স্পষ্ট জানায়, তাজমহলে মন্দির থাকার কোনো প্রমাণ নেই।

তারপরও এলাহাবাদ হাই কোর্টের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড. শর্মা। তার ভাষায়, ‘আদালতের আগের নির্দেশের পর কী পরিবর্তন হয়েছে, তা বোঝা সম্ভব নয়।’ তিনি জানান, তাজমহলের বেসমেন্টের ২২টি বন্ধ কক্ষ আসলে পরিবারের সমাধিস্থল, খুলে দিলে জলীয় বাষ্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবনের ভিত্তি—আর সেখানে দেহাবশেষ ছাড়া মিলবে না কিছুই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দাবি আসলে বৃহত্তর এক প্রচারণার অংশ, যেখানে ভারতের ইসলামি স্থাপত্যগুলোকে ‘হিন্দু’ স্থাপনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় উপাসনালয় সুরক্ষা আইন থাকা সত্ত্বেও একাধিকবার তা লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ড. শর্মা।

তবে এসব বিতর্কের বাইরে গিয়ে এটুকু মানতেই হয়, বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে আজও ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য এই তাজমহল। উর্দু কবি শাকিল বাদায়ুনির ভাষায়, ‘একজন সম্রাট তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, সমগ্র বিশ্বকে ভালোবাসার এক প্রতীক উপহার দিয়েছেন।’ ভালোবাসার এই প্রতীক চিরকাল সেভাবেই স্মরণীয় থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা তাজমহলপ্রেমীদের।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা আসামির হাতে হাতকড়া

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

তাজমহল কি মন্দির ছিল, আবারও উঠল প্রশ্ন 

আপডেট সময় ০৩:৫১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সাদা মার্বেলে গড়া অপূর্ব স্থাপত্য, খোদাই করা মিনার আর গম্বুজ-খিলানের অনন্য নকশা—তাজমহলের নাম শুনলেই এই ছবিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। দিল্লি থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অংশ এই স্থাপনা প্রায় ৪০০ বছর ধরে পরিচিত ‘প্রেমের প্রতীক’ হিসেবে। তবে এবার সেই তাজমহলকে ঘিরে আবারও দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক।

একজন বিজেপি নেতা দাবি করেছেন, মমতাজ মহলের স্মৃতিতে নির্মিত এই স্থাপনার জায়গায় এক সময় ছিল একটি মন্দির, আর তার প্রমাণ নাকি আজও লুকিয়ে আছে তাজমহলের বেসমেন্টে। এই দাবি জানিয়ে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের জেলা আদালতে জরিপের আর্জিসহ পিটিশন দাখিল করেছিলেন তিনি। জেলা আদালত সেই পিটিশন খারিজ করলে তিনি দ্বারস্থ হন এলাহাবাদ হাই কোর্টের। এরপর হাই কোর্ট কেন্দ্র সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে নোটিশ পাঠিয়ে জরিপ প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৬৫ সালের আগে তাজমহল নিয়ে এমন কোনো বিতর্কই ছিল না, আর এর নির্মাণ সংক্রান্ত সব প্রমাণও যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। বিবিসির সঙ্গে আলাপে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা।

ইতিহাস বলছে, ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে মৃত্যু হয় মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের। তার স্মৃতিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন শাহজাহান এবং এ জন্য বেছে নেন আগ্রায় যমুনা নদীর তীরের একটি জায়গা, যা তখন ছিল রাজা জয় সিংয়ের অধিকারে। ইতিহাসবিদ আব্দুল হামিদ লাহোরির ‘বাদশাহনামা’ গ্রন্থ অনুযায়ী, ভিত্তিস্থাপনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল তাজমহলের নির্মাণকাজ, যা মূলত শেষ হয় ১৬৪৮ সালে, তবে খোদাই ও উদ্যানের কাজ শেষ হতে সময় লাগে আরও পাঁচ বছর।

তাজমহল ঘিরে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও তার সত্যতার কোনো প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন ড. শর্মা। এর মধ্যে একটি প্রচলিত গল্প হলো, শাহজাহান নাকি তাজমহল নির্মাণে জড়িত কারিগরদের হাত কেটে নিয়েছিলেন, যাতে দ্বিতীয় কোনো তাজমহল তৈরি না হয়। আরেকটি দাবি অনুযায়ী, তাজমহল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং তাতে হিন্দুদের মৃত্যু হয়—যদিও ড. শর্মার মতে এটি ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ভিত্তিহীন প্রচারণা মাত্র।

তাজমহল নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ১৯৬৫ সালে, যখন লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক দাবি করেন, এটি আসলে চতুর্থ শতাব্দীতে নির্মিত একটি রাজপুত প্রাসাদ, যা পরে তাজমহলে রূপান্তরিত করা হয়। ইতিহাসবিদ জাইলস টিলটসনের মতে, তাজমহলের মতো স্থাপনা নির্মাণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রাক-মুঘল আমলে ভারতে ছিলই না। পরে ১৯৮৯ সালে আরেকটি বইয়ে ওক দাবি করেন, এটি ছিল দ্বাদশ শতাব্দীর একটি মন্দির। প্রকৃতপক্ষে পিএন ওক ইতিহাসবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন আইনজীবী ও সাংবাদিক। ২০০০ সালে এই দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন তিনি, তবে আদালত তা সঙ্গে সঙ্গে খারিজ করে দেয়।

ড. শর্মার মতে, ওকের এই তত্ত্বকে নিছক কল্পনা ভেবে ভুলে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শী অমরনাথ মিশ্র ২০০৫ সালে ফের এলাহাবাদ হাই কোর্টে পিটিশন দাখিল করেন, যা প্রমাণের অভাবে তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ হয়ে যায়। ২০১৭ সালে এএসআইও স্পষ্ট জানায়, তাজমহলে মন্দির থাকার কোনো প্রমাণ নেই।

তারপরও এলাহাবাদ হাই কোর্টের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড. শর্মা। তার ভাষায়, ‘আদালতের আগের নির্দেশের পর কী পরিবর্তন হয়েছে, তা বোঝা সম্ভব নয়।’ তিনি জানান, তাজমহলের বেসমেন্টের ২২টি বন্ধ কক্ষ আসলে পরিবারের সমাধিস্থল, খুলে দিলে জলীয় বাষ্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবনের ভিত্তি—আর সেখানে দেহাবশেষ ছাড়া মিলবে না কিছুই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দাবি আসলে বৃহত্তর এক প্রচারণার অংশ, যেখানে ভারতের ইসলামি স্থাপত্যগুলোকে ‘হিন্দু’ স্থাপনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় উপাসনালয় সুরক্ষা আইন থাকা সত্ত্বেও একাধিকবার তা লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ড. শর্মা।

তবে এসব বিতর্কের বাইরে গিয়ে এটুকু মানতেই হয়, বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে আজও ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য এই তাজমহল। উর্দু কবি শাকিল বাদায়ুনির ভাষায়, ‘একজন সম্রাট তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, সমগ্র বিশ্বকে ভালোবাসার এক প্রতীক উপহার দিয়েছেন।’ ভালোবাসার এই প্রতীক চিরকাল সেভাবেই স্মরণীয় থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা তাজমহলপ্রেমীদের।

Share this news as a Photo Card