কবরীর স্বপ্নের সিনেমা: পাঁচ বছর পরও কেন বন্দি বাক্সে?
বিনোদন প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৬
ঢাকার চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম সারাহ বেগম কবরী। আজ এই ‘মিষ্টি মেয়ে’র জন্মদিনে যখন অনুসারীরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন, তখনই সামনে এসেছে তাঁর এক অপূর্ণ স্বপ্নের কথা। কবরীর মৃত্যুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর পরিচালিত শেষ সিনেমা ‘এই তুমি সেই তুমি’ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ছবিটির মুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। একদিকে নির্মাতার পরিবারের দাবি সিনেমাটি মুক্তির জন্য প্রস্তুত, অন্যদিকে সরকারি দপ্তরগুলো বলছে ভিন্ন কথা।
যেভাবে থেমে গেল ‘মিষ্টি মেয়ে’র স্বপ্নযাত্রা
২০০৬ সালে ‘আয়না’ সিনেমা দিয়ে পরিচালনার খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন কবরী। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতি ভেঙে সরকারি অনুদানে শুরু করেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘এই তুমি সেই তুমি’। এই সিনেমার কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ তিনি নিজেই লিখেছিলেন। এমনকি করোনাকালের চরম ঝুঁকির মধ্যেও ছবিটির কাজ প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। বাকি ছিল মাত্র দুই দিনের শুটিং।
কিন্তু ২০২১ সালের এপ্রিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনকে কাঁদিয়ে বিদায় নেন এই কিংবদন্তি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে মাঝপথেই থমকে যায় সিনেমার কাজ।
মায়ের অসমাপ্ত কাজ হাতে নেন ছেলে
কবরীর মৃত্যুর পর ছবিটির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর ছেলে শাকের চিশতী। চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশোনা করা চিশতী মায়ের রেখে যাওয়া স্টোরিবোর্ড ও ডায়েরির পরিকল্পনা অনুসরণ করে বাকি থাকা অংশের শুটিং শেষ করেন। এরপর ডাবিং, সম্পাদনা ও আবহসংগীতের কাজও সম্পন্ন করা হয়।
২০২৩ সালের শেষের দিকে চিশতী জানিয়েছিলেন যে, সিনেমাটির কাজ পুরোপুরি শেষ। এটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হবে। সম্প্রতি তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ছবিটি বর্তমানে সার্টিফিকেশন বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে এবং ছাড়পত্র পেলেই এটি মুক্তি পাবে।
সরকারি তথ্যে গরমিল: আসল জট কোথায়?
নির্মাতাপক্ষের এই দাবির বিপরীতে সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যে বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের উপপরিচালক মঈনউদ্দীন জানিয়েছেন, আজ (রোববার) পর্যন্ত ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমাটি অনুমোদনের জন্য তাঁদের কাছে জমা পড়েনি। ফলে ছবিটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বোর্ডের কাছে কোনো দাপ্তরিক তথ্য নেই।
”সরকারি অনুদানের কোনো চলচ্চিত্র বিদেশের উৎসবে পাঠাতে হলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আগাম অনুমতি এবং সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।”
অন্য দিকে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী সরকারি অনুদানের ছবির শুটিং শেষ হলে মন্ত্রণালয়কে তা অবহিত করতে হয়। এরপরই অনুদানের শেষ কিস্তির টাকা ছাড় করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শুটিং শেষ হওয়ার কোনো লিখিত তথ্য বা শেষ কিস্তির অর্থের জন্য কোনো আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েনি।
অনিশ্চিত অপেক্ষায় কবরীর শেষ সৃষ্টি
মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিশাত সালওয়া ও রায়হান রিয়াদ। এই সিনেমার বিশেষত্ব হলো, কবরী তাঁর ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো এই ছবির জন্য গান লিখেছিলেন। বরেণ্য সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের সুরে গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন ইমরান ও কোনাল।
মায়ের স্বপ্নের সিনেমাটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে ছেলে শাকের চিশতীর চেষ্টার কমতি না থাকলেও, প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার এই জটিলতা পুরো বিষয়টিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ঢাকার চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম এই রূপকারের শেষ সৃষ্টি কবে বড় পর্দায় আসবে—সেই উত্তর পেতে দর্শকদের হয়তো আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 

























