আগস্টেই শ্রমিক যাওয়া শুরু

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ফের খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ভিত্তিতে এখন থেকে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর পথ সুগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সুখবর জানান। দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষায় থাকা লাখো কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এই ঘোষণা এনে দিয়েছে নতুন এক আশার বার্তা।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, দুই দেশ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, যার আওতায় আগামী মাস অর্থাৎ আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাত্রা শুরু হবে। এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও। তার উপস্থিতিতে ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত প্রবাসী শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে, কারণ বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা এই বাজার পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নানা মহলে সংশয় ছিল।

শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার এই পদক্ষেপের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার আন্তরিক সহযোগিতায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই নীতিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে কর্মী যাত্রা শুরু হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি জানান, বর্তমান নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেন। তিনি বলেন, যেহেতু শ্রমবাজার খুলে যাচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী এক মাসের মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক ভাই-বোন এখানে এসে কাজ শুরু করবেন, তাই সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের সতর্কবার্তাও দিয়ে রাখেন, যাতে কেউ তাড়াহুড়ো করে ভুল পথে পা না বাড়ান।

দালাল ও অসাধু চক্রের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, দেশে ফিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে কেউ কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন। একই সঙ্গে প্রতারক চক্রের বিষয়ে সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। এই বার্তা এমন এক সময়ে এল, যখন অতীতে শ্রমবাজার নিয়ে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে এবং বহু কর্মী প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।

কারিগরি কার্যক্রম ও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, খুব শিগগিরই টেকনিক্যাল পর্যায়ে কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ঢাকায় অবস্থিত মালয়েশিয়ান হাইকমিশন যৌথভাবে এই কাজ এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্তে গোটা প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, মালয়েশিয়া সরকার খুব শিগগিরই তাদের কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানাবে এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরা হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আরও জনবান্ধব করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন যাতে সাধারণ কর্মীদের আস্থার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীরা যেন যেকোনো সমস্যায় সহজেই হাইকমিশনের সহায়তা পেতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

প্রথম ধাপের কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে প্রথম ধাপের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বোয়েসেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তিকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রক্রিয়াটিকে যতটা সম্ভব সরকারি তত্ত্বাবধানে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বেসরকারি এজেন্সিনির্ভরতার কারণে অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠানো ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকা বর্তমান সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এজেন্সির চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান—এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করার জন্য মালয়েশিয়া সরকারকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

ফ্যাসিবাদ ও দুর্নীতিতে জড়িতদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বিগত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত, বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তিনি জানান, মালয়েশিয়া সরকারের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, যারা ফ্যাসিবাদী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিংবা সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে দুর্নীতি করেছে, তাদের কেউই নতুন তালিকায় স্থান পাবেন না। মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ অচিরেই বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে জানান তিনি।

মাহদী আমিন বলেন, নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি পুনরায় শুরু করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকার সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, শুধু বাজার খুলে দেওয়াই নয়, বরং প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কর্মীবান্ধব করে তোলাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সূচনা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের যাত্রা শুরুর কথা স্মরণ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, প্রবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি ইশতেহারেও তাদের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপি সবসময় একটি প্রবাসীবান্ধব দল হিসেবে প্রবাসীদের স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে বলে জানান তিনি। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি দলীয় অবস্থান ও ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তা ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত হয়। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দুই দেশের সম্পর্ককে বর্তমান সরকার কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে জোরালো আলোচনা চলছে। এছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সংস্কৃতিসহ বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

দুই দেশের সম্পর্ককে একটি কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যেসব মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে, তাদের কার্যপরিধি আরও কীভাবে সম্প্রসারিত করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন খাতের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মালয়েশিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি অ্যাজিয়াটা এবং এমএমসি পোর্টসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন।

জ্বালানি খাতের সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট রয়েছে, তা নিরসনে মালয়েশিয়ার সরকারি জ্বালানি জায়ান্ট পেট্রোনাস কীভাবে দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির বিশাল বাজার হিসেবে মালয়েশিয়ায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এর আগে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে মাহদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্প্রতি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট রয়েছে, তার আলোকে পেট্রোনাস কীভাবে দ্রুততম সময়ে এই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ও শ্রমবাজার বন্ধের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বহুমাত্রিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা। তাদের শ্রম ও নিষ্ঠা যেমন মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেও গতিশীল রেখেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে মালয়েশিয়ায় এই শ্রমবাজারের সূচনা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে কারণে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সঙ্গে এই বাজারের একটি গভীর আবেগ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজারটি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে মাহদী আমিন জানান, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের কারণেই মূলত বাজারটি বন্ধ হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও নানামুখী জটিলতার কারণে তা এতদিন বন্ধই ছিল। তবে বর্তমান সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অবশেষে তা আবার উন্মুক্ত হলো।

বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পূর্বের সফরের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এর আগেও তারা মালয়েশিয়ায় এসেছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান এবং তার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গসহ সব অংশীদারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছিলেন তারা। সেই ধারাবাহিকতা ও অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই তারা আবারও মালয়েশিয়া সফরে এসেছেন বলে জানান তিনি।

গত দুই দিনের বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, সহকারী সচিব এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল নীতি ছিল দেশের স্বার্থ রক্ষা করা—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলোচনার মূল ভিত্তিই ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, অর্থাৎ বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, দুই দেশই অবিলম্বে এই শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। একটি নতুন ও আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে, যাতে বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার দুয়ার খুলে যায়। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে সব খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথাও জানান তিনি।

বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, দ্বিপাক্ষিক ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে আগামী আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশি শ্রমিকদের আগমন শুরু হতে পারে। এই ঘোষণা প্রবাসী শ্রমবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে নতুন করে আশা জাগিয়ে তুলেছে।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। আগামীকাল শুক্রবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে মন্ত্রী ও উপদেষ্টার। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক মাত্রায় পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ায় লাখো কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এটি এক বড় স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও কর্মীবান্ধব উপায়ে এগিয়ে যায়, সে দিকেই এখন নজর থাকবে সবার।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা আসামির হাতে হাতকড়া

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

আগস্টেই শ্রমিক যাওয়া শুরু

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

আপডেট সময় ০৫:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ফের খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ভিত্তিতে এখন থেকে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর পথ সুগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সুখবর জানান। দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষায় থাকা লাখো কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এই ঘোষণা এনে দিয়েছে নতুন এক আশার বার্তা।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, দুই দেশ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, যার আওতায় আগামী মাস অর্থাৎ আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাত্রা শুরু হবে। এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও। তার উপস্থিতিতে ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত প্রবাসী শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে, কারণ বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা এই বাজার পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নানা মহলে সংশয় ছিল।

শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার এই পদক্ষেপের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার আন্তরিক সহযোগিতায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই নীতিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে কর্মী যাত্রা শুরু হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি জানান, বর্তমান নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেন। তিনি বলেন, যেহেতু শ্রমবাজার খুলে যাচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী এক মাসের মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক ভাই-বোন এখানে এসে কাজ শুরু করবেন, তাই সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের সতর্কবার্তাও দিয়ে রাখেন, যাতে কেউ তাড়াহুড়ো করে ভুল পথে পা না বাড়ান।

দালাল ও অসাধু চক্রের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, দেশে ফিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে কেউ কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন। একই সঙ্গে প্রতারক চক্রের বিষয়ে সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। এই বার্তা এমন এক সময়ে এল, যখন অতীতে শ্রমবাজার নিয়ে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে এবং বহু কর্মী প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।

কারিগরি কার্যক্রম ও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, খুব শিগগিরই টেকনিক্যাল পর্যায়ে কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ঢাকায় অবস্থিত মালয়েশিয়ান হাইকমিশন যৌথভাবে এই কাজ এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্তে গোটা প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, মালয়েশিয়া সরকার খুব শিগগিরই তাদের কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানাবে এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো তুলে ধরা হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আরও জনবান্ধব করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন যাতে সাধারণ কর্মীদের আস্থার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীরা যেন যেকোনো সমস্যায় সহজেই হাইকমিশনের সহায়তা পেতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

প্রথম ধাপের কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে প্রথম ধাপের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বোয়েসেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তিকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রক্রিয়াটিকে যতটা সম্ভব সরকারি তত্ত্বাবধানে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বেসরকারি এজেন্সিনির্ভরতার কারণে অতীতে যেসব অনিয়ম হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠানো ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকা বর্তমান সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এজেন্সির চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান—এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করার জন্য মালয়েশিয়া সরকারকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

ফ্যাসিবাদ ও দুর্নীতিতে জড়িতদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বিগত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত, বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তিনি জানান, মালয়েশিয়া সরকারের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, যারা ফ্যাসিবাদী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিংবা সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে দুর্নীতি করেছে, তাদের কেউই নতুন তালিকায় স্থান পাবেন না। মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ অচিরেই বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে জানান তিনি।

মাহদী আমিন বলেন, নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি পুনরায় শুরু করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকার সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, শুধু বাজার খুলে দেওয়াই নয়, বরং প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কর্মীবান্ধব করে তোলাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সূচনা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের যাত্রা শুরুর কথা স্মরণ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, প্রবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি ইশতেহারেও তাদের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপি সবসময় একটি প্রবাসীবান্ধব দল হিসেবে প্রবাসীদের স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে বলে জানান তিনি। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি দলীয় অবস্থান ও ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তা ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত হয়। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দুই দেশের সম্পর্ককে বর্তমান সরকার কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে জোরালো আলোচনা চলছে। এছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সংস্কৃতিসহ বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

দুই দেশের সম্পর্ককে একটি কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যেসব মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে, তাদের কার্যপরিধি আরও কীভাবে সম্প্রসারিত করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন খাতের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মালয়েশিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি অ্যাজিয়াটা এবং এমএমসি পোর্টসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন।

জ্বালানি খাতের সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট রয়েছে, তা নিরসনে মালয়েশিয়ার সরকারি জ্বালানি জায়ান্ট পেট্রোনাস কীভাবে দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির বিশাল বাজার হিসেবে মালয়েশিয়ায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এর আগে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে মাহদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্প্রতি দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট রয়েছে, তার আলোকে পেট্রোনাস কীভাবে দ্রুততম সময়ে এই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ও শ্রমবাজার বন্ধের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বহুমাত্রিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা। তাদের শ্রম ও নিষ্ঠা যেমন মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেও গতিশীল রেখেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে মালয়েশিয়ায় এই শ্রমবাজারের সূচনা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে কারণে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সঙ্গে এই বাজারের একটি গভীর আবেগ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজারটি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে মাহদী আমিন জানান, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের কারণেই মূলত বাজারটি বন্ধ হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও নানামুখী জটিলতার কারণে তা এতদিন বন্ধই ছিল। তবে বর্তমান সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অবশেষে তা আবার উন্মুক্ত হলো।

বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পূর্বের সফরের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এর আগেও তারা মালয়েশিয়ায় এসেছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান এবং তার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গসহ সব অংশীদারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছিলেন তারা। সেই ধারাবাহিকতা ও অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই তারা আবারও মালয়েশিয়া সফরে এসেছেন বলে জানান তিনি।

গত দুই দিনের বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, সহকারী সচিব এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল নীতি ছিল দেশের স্বার্থ রক্ষা করা—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলোচনার মূল ভিত্তিই ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, অর্থাৎ বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, দুই দেশই অবিলম্বে এই শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। একটি নতুন ও আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে, যাতে বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার দুয়ার খুলে যায়। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে সব খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথাও জানান তিনি।

বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, দ্বিপাক্ষিক ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে আগামী আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশি শ্রমিকদের আগমন শুরু হতে পারে। এই ঘোষণা প্রবাসী শ্রমবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে নতুন করে আশা জাগিয়ে তুলেছে।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। আগামীকাল শুক্রবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে মন্ত্রী ও উপদেষ্টার। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক মাত্রায় পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ায় লাখো কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এটি এক বড় স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও কর্মীবান্ধব উপায়ে এগিয়ে যায়, সে দিকেই এখন নজর থাকবে সবার।

Share this news as a Photo Card