দেশে হাম রোগের বিস্তার শুধু স্বাস্থ্য খাতেই নয়, বরং আক্রান্ত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক জীবনেও গভীর সংকট তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে, আর অর্ধেকের বেশি পরিবার নিজেদের সঞ্চয় পুরোপুরি খরচ করে ফেলেছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস-রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই জরিপে অংশ নেয় দুই হাজার সাতশ ছেচল্লিশটি পরিবার। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই জরিপ চালানো হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোর সবাই কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার ওষুধ কেনার সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি বলে উল্লেখ করেছে। এরপরই রয়েছে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন, যা জানিয়েছে প্রায় তেত্রিশ শতাংশ পরিবার। খাদ্য সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বাইশ শতাংশ পরিবার। এ ছাড়া কিছু পরিবার চিকিৎসার খরচ যোগাতে ঘরের সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্ভর করেছে আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর দানের ওপর।
এই মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে বিপর্যস্ত দুই হাজার চারশ পরিবারকে চিহ্নিত করে জরুরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, পাশাপাশি হাম রোগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা। নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকি বিশ্লেষণের পর এসব পরিবারকে সহায়তার জন্য বাছাই করা হয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। অংশগ্রহণকারীদের তিন-চতুর্থাংশের বয়স চার বছরের কম, প্রায় উনিশ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে সতেরো বছরের মধ্যে, আর মাত্র ছয় শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক। গড় হিসাবে প্রতিটি পরিবারকে চিকিৎসাজনিত খরচে প্রায় ষোলো হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। সন্তানের পাশে হাসপাতালে দীর্ঘদিন কাটানোর কারণে অনেক অভিভাবক নিয়মিত রোজগার হারিয়েছেন, এমনকি কারও কারও চাকরিও চলে গেছে।
রংপুরের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন জানান, এগারো মাস বয়সি মেয়ের চিকিৎসার জন্য রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে এসে তাদের এখন পর্যন্ত সত্তর হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও যাতায়াত, খাবার ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ মেটাতে আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে তাদের। সৌদি আরবপ্রবাসী স্বামীর বেতন এ মাসে না আসায় পরিবারটি আরও কঠিন সময় পার করছে বলে জানান তিনি।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য বলছে, এদের প্রায় আটাত্তর শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের মাসিক আয় ছয় থেকে বিশ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আয় বন্ধ হয়ে গেলে এই শ্রেণির মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ড. কবির এম. আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়ন স্পষ্ট করেছে যে অনেক পরিবার একইসঙ্গে স্বাস্থ্য সংকট আর তীব্র আর্থিক দুর্দশার মুখোমুখি হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সংস্থাটি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা মন্তব্য করেন, হামের প্রভাব কেবল স্বাস্থ্য খাতে সীমাবদ্ধ নেই; অসুস্থ সন্তানের সেবাযত্নে গিয়ে অনেক পরিবার তীব্র আর্থিক চাপে পড়ছে। তাই জনস্বাস্থ্য সংকটকালে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি টেকসই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতেও সহযোগিতা করছে রেড ক্রিসেন্ট। হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা এবং মানুষকে দ্রুত চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছেন।
এদিকে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ধারা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন সুনামগঞ্জের ও একজন ঢাকার। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট আটশ সাতচল্লিশ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ছিয়ানব্বই জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে এক লাখ একত্রিশ হাজারের বেশি, আর নিশ্চিত রোগী ষোলো হাজার চারশর বেশি।
শিরোনাম :
হাম চিকিৎসায় ঋণে জর্জরিত দেশের অধিকাংশ পরিবার
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১২:৪০:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- 7
ট্যাগস
সঞ্চয় হারিয়েছে ৬১ শতাংশ পরিবার — জরিপে উঠে এলো আর্থিক সংকটের চিত্র। হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ৮৯ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত
জনপ্রিয় সংবাদ





















