পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশকে পরিষ্কার ও সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। আসন্ন প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ দেশ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে আজ থেকেই সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বার্তায় তিনি পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং নিজের সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রশ্নটি কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশার মানুষের নয়, বরং এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেই স্পর্শ করে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তিন বা চার দশক আগের তুলনায় আজকের বাংলাদেশে বর্জ্যের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাট ও বাজার এলাকায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, ব্যবহৃত টিস্যুসহ নানা ধরনের আবর্জনা যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
আবর্জনা সঠিক পদ্ধতিতে ধ্বংস করার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হয় পায়ে হেঁটে চলাচল করেন, নয়তো গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন রাস্তা পার হন কিংবা কোনো এলাকা দিয়ে চলাচল করেন, তখন যত্রতত্র জমে থাকা আবর্জনা তাদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধ ছড়ায়, নোংরা পরিবেশ তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সবাই মিলে একটু সচেতন হই, যত্রতত্র ব্যবহৃত আবর্জনা না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা করি এবং যথাযথ পদ্ধতিতে তা পরবর্তীতে ধ্বংস করি, তাহলে আমাদের পরিবেশ যেমন ভালো থাকবে, তেমনি দেশকেও আমরা সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখতে পারব।’
নিজের ঘরের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী একটি সহজ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন দেশবাসীর প্রতি। তিনি বলেন, ‘একবার ভেবে দেখুন তো, আপনি যে ঘরে থাকেন, যে বাসাটিতে বসবাস করেন, সেই ঘরের চারপাশে যদি সবসময় আবর্জনা ছড়িয়ে থাকতো, তাহলে কি সেটি দেখতে আপনার ভালো লাগতো? নিশ্চয়ই না। আমাদের কারো কাছেই তা ভালো লাগতো না।’ এই প্রসঙ্গে তিনি বাংলার প্রকৃতিকে নিয়ে রচিত বিখ্যাত পঙক্তির উল্লেখ করেন—‘সবুজ শ্যামল আমার ভুবন’—এবং প্রশ্ন রাখেন, তাহলে কেন আমরা নিজেদের চারপাশের পরিবেশকে সেই সৌন্দর্যে সাজিয়ে রাখতে পারব না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক মাসে দেশের নানা জায়গায় ভ্রমণের সময় তিনি বহুবার এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে কোনো পুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেছে পুকুরের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা স্তূপ হয়ে জমে আছে। কোথাও আবার পুকুরপাড়েই জমেছে আবর্জনার স্তূপ। অথচ একসময় এসব স্থানে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ বসে গল্পগুজব করতেন, অবসর সময় কাটাতেন। বর্তমানে সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল হয়ে উঠেছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকা তিনি পরিদর্শনে যান, সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা হয়তো নিয়মিতভাবে জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে সেই পরিচ্ছন্নতা বেশিদিন টেকে না। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোনো স্থান থেকে বেরিয়ে আসি, তখন আর সেটি আগের মতো পরিষ্কার থাকে না। কিন্তু যদি আপনি নিজে একটি জায়গা পরিষ্কার করে রেখে আসেন, তাহলে আপনার পরে যিনি সেখানে যাবেন, তিনিও সেই পরিচ্ছন্ন সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন।’
এই প্রসঙ্গে জনসচেতনতার গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আজ থেকেই প্রত্যেকে সচেতন হই, নিজেদের হাতের আবর্জনা বা ব্যবহৃত জিনিসপত্র যদি নির্দিষ্ট স্থানে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখি, তাহলে ধীরে ধীরে আমরা পুরো বাংলাদেশকে আবর্জনামুক্ত করতে সক্ষম হব। এভাবেই একটি সুন্দর, বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, এই পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না, তবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশটা তো আমাদের সবার। আমরা সবাই মিলে যদি চেষ্টা করি, তাহলে আমরা অনেক বড় কিছু অর্জন করতে সক্ষম হব।’ এই বলে তিনি সরাসরি দেশবাসীর কাছে সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আজকে আপনাদের কাছে এই সহযোগিতাটুকুই আমি চাইছি।’
প্রধানমন্ত্রীর এই ভিডিও বার্তা প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই মন্তব্যে জানান, পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সরকারপ্রধানের এমন সরাসরি ও আন্তরিক আহ্বান দেশের সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মহল থেকেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তাদের মতে, শুধু সরকারি নীতিমালা বা প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা সম্ভব নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন আচরণ ও অভ্যাসের পরিবর্তনই এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পণ্য মাটির সঙ্গে মিশে না গিয়ে বছরের পর বছর পরিবেশে থেকে যায়, যা মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করে দেয়। পুকুর, খাল-বিল কিংবা নদীতে জমে থাকা আবর্জনা শুধু দৃশ্যদূষণই ঘটায় না, বরং জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানকে অনেকেই সময়োপযোগী বলে মনে করছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। রাস্তাঘাট, বাজার, পুকুরপাড় কিংবা যেকোনো সাধারণ জায়গা—সব জায়গাতেই এই সচেতনতার চর্চা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তিনি।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আহ্বান একটি বার্তা বহন করে—পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, বরং এটি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিটি নাগরিক যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সামান্য দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য দেশ রেখে যাওয়া সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সম্পা সুত্রধর, ঢাকা 





















