দুই বছর আগের সেই দিনটির স্মৃতি এখনো তাড়া করে মো. শাকিল আহমেদকে। রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরের কাছে গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তে তাঁর মনে প্রথম যে চিন্তা এসেছিল, তা ছিল মায়ের কথা। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল অবিরাম, দুজন তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন রাস্তা দিয়ে। সেই অবস্থায় তিনি একজনকে বলেছিলেন একটি মুঠোফোন নম্বর মুখস্থ রাখতে, যাতে মৃত্যুর পর অন্তত মা তাঁর লাশ খুঁজে পান।
একুশ বছর বয়সী শাকিল তখন প্রথম বর্ষের একজন পলিটেকনিক শিক্ষার্থী। আন্দোলনের শুরুর দিকে তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলেও রংপুরে একজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু এবং সাভারে মরদেহ পোড়ানোর দৃশ্য দেখে তাঁর মনে জেগে ওঠে প্রতিরোধের তীব্র তাগিদ। এরপর থেকেই তিনি রাস্তায় নামতে শুরু করেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে একবার রাবার বুলেটও তাঁর শরীরে লেগেছিল।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শাকিল বলেন, প্রথমে তীব্র ব্যথা অনুভব করেননি, বরং মনে হয়েছিল কিছু একটা কামড় দিয়েছে। প্যান্টের দিকে চোখ পড়তেই দেখেন রক্তে ভিজে গেছে সবকিছু। তখন একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরছিল—দৌড়ে সহযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাতে হবে, কারণ পড়ে গেলে পুলিশ প্রাণে বাঁচাবে না। কয়েক সেকেন্ড দৌড়ানোর পরই শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করে তাঁর।
সহঅবস্থানকারীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে একের পর এক হাসপাতাল বদল করতে হয়। ক্ষমতার পরিবর্তনের সেই উত্তাল দিনে উল্টো পথে অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়েছিল, যখন রাস্তায় ভিড় করেছিল হাজারো মানুষ।
শারীরিক জটিলতা এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে দেশের চিকিৎসকেরা একসময় তাঁর পা কেটে ফেলার কথাও বলেছিলেন পরিবারকে। মলত্যাগের স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ দেড় বছর তাঁকে পেটে কৃত্রিম ব্যাগ ব্যবহার করে চলতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, উন্নত চিকিৎসা ছাড়া সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে প্রথমে সিঙ্গাপুর পাঠানোর পরিকল্পনা হলেও পরে তাঁকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়, যেখানে আটটি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। সেখানেই কোলোস্টমি ব্যাগ খুলে ফেলা সম্ভব হয়, যদিও জাতীয় নির্বাচনের আগে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে।
আজও ডান পায়ে ঝিমঝিম অনুভূতি লেগে থাকে সারাক্ষণ, মানসিক যন্ত্রণাও কমেনি। তবু জীবনের সঙ্গে লড়াই থামাননি শাকিল। পড়াশোনায় আবার মনোযোগ দিয়েছেন, পাশাপাশি ভিডিও সম্পাদনার কাজ শিখে ঘরে বসেই কিছু আয় করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে ‘এ’ শ্রেণির যোদ্ধা হিসেবে এককালীন আর্থিক সহায়তা এবং মাসিক ভাতা পাচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও কিছু সহায়তা এসেছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও ছেলে থাকেন মিরপুরের একটি ভাড়া বাসায়। ছেলের প্রাণে বেঁচে ফেরায় কৃতজ্ঞ মা এখন উদ্বিগ্ন তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আর কিছু চাওয়ার নেই তাঁর।
কথা বলতে বলতে শাকিলের কণ্ঠে ফুটে ওঠে ক্ষোভও। তাঁর মতে, স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ছাড়া বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। তিনি মনে করেন, শুধু আহত ও শহীদ পরিবারদের ভাতা দেওয়াই যথেষ্ট নয়—দেশ গড়ার কাজে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল দেশের আপামর জনতা।
শিরোনাম :
গুলিবিদ্ধ শাকিলের ফিরে আসার গল্প, এখনো থামেনি কষ্ট
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১২:৫১:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- 8
জনপ্রিয় সংবাদ






















