দেশের মহাসড়কগুলোতে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। প্রতিদিনের মতো আরেকটি দুর্ঘটনার খবর, আরও কিছু প্রাণহানি আর স্বজনহারানো মানুষের আর্তনাদ—এই চিত্র এখন যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যাটি তিন হাজার পাঁচশত ষোলো। প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি করে পরিবার, একটি করে অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি করে শূন্যতা—যা কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
এই ভয়াবহ প্রবণতার সবশেষ সংযোজন হয়ে এলো গতকালের দুটি পৃথক দুর্ঘটনা। উত্তরবঙ্গের বগুড়া আর পূর্বাঞ্চলের সিলেট—দেশের দুই প্রান্তে একই দিনে ঘটে গেল দুটি হৃদয়বিদারক ঘটনা, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ষোলোজন মানুষ। বগুড়ায় বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আর সিলেটে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে গেছে নয়টি তাজা প্রাণ। তবে সিলেটের এই দুর্ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে এমন এক প্রশ্ন, যা বহুদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের পরিবহন খাতে—মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা অবৈধ স্লিপার বাসগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
শুক্রবার সকালের ঘটনা। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকা তখন সবে জেগে উঠছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে চলছে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল। ঠিক তখনই ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যার একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস তখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাসটি ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশের খাদে। এই সংঘর্ষে নিহত সবাই ছিলেন ইউনিক পরিবহনের যাত্রী, জানিয়েছে পুলিশ। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই বাসের অন্তত চব্বিশ যাত্রী, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন এখনও চিকিৎসাধীন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বেপরোয়া স্লিপার বাসগুলো আসলে কীভাবে মহাসড়কে চলার অনুমতি পায়? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, এই ধরনের বাসগুলো মূলত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ থেকে সাধারণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বা এসি বাসের অনুমোদন নিয়ে থাকে। কিন্তু অনুমোদন নেওয়ার পর বাস মালিকরা স্থানীয় ওয়ার্কশপে সেই বাসকে রূপান্তরিত করেন স্লিপার কোচে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে যা একটি সাধারণ যাত্রীবাহী বাস, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাহন—যার নিরাপত্তা মান নিয়ে থেকে যায় গুরুতর প্রশ্ন।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই অবৈধ বাসগুলোর নিবন্ধন নম্বর বরাদ্দ হয় মূলত বিআরটিএর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সার্কেল থেকে। কিছু কিছু বাস আবার একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে দিব্যি চলাচল করছে দিনের পর দিন। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অবৈধ বাসের নিবন্ধন সিরিয়াল হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয় থেকে। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় প্রশাসন ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে এসব যান চালু রাখে মহাসড়কে। সাধারণ একটি এসি বাসে যেখানে থাকে ছত্রিশটি আসন, সেখানে এই অবৈধ স্লিপার বাসগুলোতে ওপরে-নিচে মিলিয়ে বসানো হয় পঁয়তাল্লিশটিরও বেশি আসন। শুধু তাই নয়, বেপরোয়া কিছু তরুণ-তরুণীর অসামাজিক কার্যকলাপের জন্যও এসব বাস পরিণত হয়েছে এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ে—যা সামাজিকভাবে চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই স্লিপার বাসের দুর্ঘটনা কিন্তু নতুন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের শুরু থেকেই একের পর এক এমন মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে দেশের মহাসড়কগুলো। জানুয়ারি মাসের নয় তারিখে ভোররাতে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় একটি এসি ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস দাঁড়িয়ে থাকা কাঠবোঝাই একটি ট্রাকের পেছনে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনজন যাত্রী, আহত হন আরও অন্তত পাঁচজন। এর ঠিক দুই মাস পর, মার্চ মাসের ঊনত্রিশ তারিখে দিনাজপুরের বিরামপুরে ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা। মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয় ঢাকাগামী একটি স্লিপার বাস। সেখানে প্রাণ হারান দুজন, আহত হন আরও ছয়জন। তারপর মে মাসের একত্রিশ তারিখে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার তাজপুর কদমতলা এলাকায় ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী বাসকে বেপরোয়া গতিতে ধাক্কা দেয় একটি স্লিপার কোচ। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুজন, আহত হন অন্তত পনেরোজন—যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক, উন্নত চিকিৎসার জন্য যাদের ভর্তি করতে হয় হাসপাতালে।
এই প্রতিটি ঘটনাই যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি—বেপরোয়া গতি, নিয়মহীনতা আর অবহেলার এক করুণ চিত্র। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন তৌহিদুল ইসলাম নামের একজন যাত্রী। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তাদের চলাচল করতে হচ্ছে মহাসড়কে। প্রায়ই চোখে পড়ে, কীভাবে এসব অবৈধ স্লিপার বাস বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহাসড়ক। তার প্রশ্ন—বিআরটিএ আসলে কীভাবে এসব বাসের নিবন্ধন দিচ্ছে? তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার এখনই পরিবহন খাতে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ না নিলে, এই স্লিপার বাসগুলো একদিন দেশের দূরপাল্লার যাত্রাপথকেই পরিণত করবে মৃত্যুফাঁদে।
একই উদ্বেগের কথা শোনা গেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের গাড়ি নিবন্ধনের জন্য বিআরটিএতে যান, তখন পদে পদে তাদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। অথচ এই একই প্রতিষ্ঠান অবৈধ বাসগুলোকে যেন না দেখেই দিয়ে দিচ্ছে নিবন্ধন। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর ধরে এই বিষয়ে কথা বলে আসছেন তারা, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তার প্রশ্ন—আর কতগুলো প্রাণ ঝরলে এসব অবৈধ যানবাহন সরানো হবে মহাসড়ক থেকে? তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি অবিলম্বে এসব অবৈধ স্লিপার বাস মহাসড়ক থেকে সরিয়ে ফেলার।
বিষয়টি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, মহাসড়কে গতিসীমার নিয়ম কেউ মানছে না বললেই চলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা, যার ফলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অনেক চালক বেপরোয়াভাবে ওভারটেক করে ঘটাচ্ছেন দুর্ঘটনা। তার মতে, সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো—বিআরটিএ থেকে অত্যন্ত সহজে মানুষ পেয়ে যাচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যার ফলে সড়কে তৈরি হয়েছে দক্ষ চালকের চরম সংকট। তিনি আরও যোগ করেন, গত কয়েক বছর ধরে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অবৈধ স্লিপার বাসগুলো। তার প্রশ্ন—এসব বাস তৈরির উপকরণ আসলে কীভাবে আমদানি হচ্ছে, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ ও পুলিশ প্রশাসনের আরও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। প্রশাসনের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব বাস অবাধে চলাচল করছে মহাসড়কে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তবে এই অভিযোগের বিপরীতে ভিন্ন কথা বলছে বাস মালিকপক্ষ। বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জুবায়ের মাসুদ বলেন, তাদের সমিতি থেকে সব সময়ই অবৈধ বাস পরিচালনা না করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। তার মতে, সড়কে দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে বিআরটিএ ও পুলিশ প্রশাসন—তারা চাইলে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ বাসগুলো সহজেই সরিয়ে দিতে পারে মহাসড়ক থেকে।
অন্যদিকে, এই অভিযোগের জবাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, কোথাও যদি কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিআরটিএ ইতিমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই আশ্বাসের বাণী শোনা যাচ্ছে বহুদিন ধরেই। অথচ মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই ধরনের প্রতিশ্রুতি, একই ধরনের তদন্তের ঘোষণা—কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের দেখা মেলে না বাস্তবে। এদিকে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ। বিআরটিএ, পুলিশ প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এই অবৈধ স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি চালকদের দক্ষতা যাচাইয়ে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে করতে হবে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ।
সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে একেকটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ। যতদিন না মহাসড়কে সত্যিকারের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, ততদিন এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন একটাই—আর কত প্রাণের বিনিময়ে টনক নড়বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের?
এস কে চন্দন, ঢাকা 























