গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সরবরাহের তীব্র ঘাটতি, যা দেশের নড়বড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে সারা দেশে লোডশেডিং সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বাইরে প্রায় সব জায়গাতেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি চরম নাজুক হয়ে পড়েছে।
গত রোববার বিকাল তিনটায় সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার সাতশ মেগাওয়াটে। এতে তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কয়লা ও গ্যাসের সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতীয় একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি। গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট, যেখানে রোববার তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ছয়শ একাত্তর মেগাওয়াটে। পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সব বিতরণ সংস্থা। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে দশ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন সংকটজনক অবস্থা অতীতে খুব বেশি দেখা যায়নি।
পাওয়ার গ্রিড সংশ্লিষ্ট হিসাব বলছে, রোববার বিকাল তিনটায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ষোলো হাজার ঊনষাট মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ করা গেছে মাত্র বারো হাজার তিনশ আটাশি মেগাওয়াট। বিকাল পাঁচটায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে তেরো হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও তখনও ঘাটতি ছিল প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট।
জানা গেছে, ভারতীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সাধারণত পিক আওয়ারে যেখানে ষোলোশ মেগাওয়াট দেওয়া হতো, রোববার বিকাল পাঁচটায় তা নেমে আসে আটশ পনেরো মেগাওয়াটে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় মজুত কমে গেছে, তাই উৎপাদনও কমাতে হয়েছে। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ কর্তৃপক্ষের হাতে নেই বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশের একাধিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর রাতে সচল হয়। ফলে তেরোশ বিশ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র সাতশ দশ মেগাওয়াট। যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি কেন্দ্রের যান্ত্রিক দুর্বলতার কারণে সেখান থেকেও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা একশ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র সত্তর কোটি ঘনফুট। এ কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোরও একই দশা—পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
গত ২১ জুলাই একটি মার্কিন কোম্পানি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দৈনিক গ্যাস সরবরাহ একান্ন কোটি ঘনফুট কমে যায়, যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। মেরামত শেষে গত ৫ আগস্ট রাত থেকে আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হয়েছে। রোববার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে সরবরাহ হয়েছে পঁচাত্তর কোটি সত্তর লাখ ঘনফুট, যেখানে আগে সরবরাহ হতো একশ দশ কোটি ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ সোমবার রাত এগারোটার পর ওই টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে, যদিও বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তখন দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক দুইশ পঁয়ষট্টি কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিরোনাম :
দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং, বিপর্যস্ত জনজীবন
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১০:০০:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- 5
জনপ্রিয় সংবাদ




















