শিরোনাম :
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে পাঁচজন, হামের উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যু আওয়ামী লীগ ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’: স্পিকার ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভ হুতি হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের ঘুম ভাঙিয়ে ঢাকা জাগালেন তারেক রহমান জানা গেল রমজান শুরু তারিখ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা মনে করে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখুন: প্রধানমন্ত্রী ব্যালন ডি’অরের সেরা মৌসুমের ভোটে মেসিকে ছাড়িয়ে ২০০৮ সালের রোনালদো ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাট, চাপে ম্যাক্রোঁ, জরুরি বৈঠক ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী

ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভ

ইউরোপের অন্তত সাতটি দেশে চলতি মাসে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখা গেছে ফ্রান্সে। ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন, গ্রিস, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে সুর চড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁদের দাবি, অস্থিরতার পেছনে অভিবাসীরাই দায়ী। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ইউরোপের মানুষ কি সত্যিই অভিবাসনে ক্ষুব্ধ, নাকি জীবনযাত্রার চাপই তাঁদের পথে নামিয়েছে?

সাত দেশ, সাত রকম ক্ষোভ

এএফপি, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, দেশগুলোর রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, দাবিও এক নয়। মিল শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা আর জনসেবার মান নিয়ে উদ্বেগে।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। প্রথমে ক্ষোভ ছিল স্কুলে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষে আসনের সংকট নিয়ে। পরে এর সঙ্গে যোগ হয় জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি, পেনশন ও সরকারি সেবার প্রশ্ন। শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে সমর্থন দেয়। বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিলেও গত শনিবার কিছু গোষ্ঠী লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

বেলজিয়ামে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। ইতালিতে অসন্তোষের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য। পর্তুগালে তরুণদের বড় দুশ্চিন্তা আবাসন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে আবাসনব্যয় ১২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।

স্পেনে বাড়িভাড়া, উচ্ছেদ ও আবাসনকে বিনিয়োগের পণ্য বানানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। একই সময়ে সরকার পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছে। গ্রিসে শিক্ষা ও আবাসনে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ চেয়েছেন।

উল্লিখিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিবাসনবিরোধিতাকে বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি হিসেবে পাওয়া যায়নি। সামনে এসেছে শিক্ষা, আবাসন, মজুরি, কর্মসংস্থান ও জনসেবার প্রশ্ন।

তাহলে আলোচনায় অভিবাসন কেন?

শনিবার ফ্রান্সের বিক্ষোভ সহিংস হওয়ার পর অভিবাসনের প্রসঙ্গ তোলেন ভ্যান্স। তাঁর দাবি, পশ্চিমা উদারপন্থিরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে ‘তৃতীয় বিশ্বকে’ আমদানি করেছে। রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা ও অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা মানুষের অভিবাসন একসময়ের মহান দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্রান্স এখন জ্বলছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন। জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি পিছিয়ে আছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের অস্থিরতাকে অভিবাসননীতির পরিণতি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

অন্যদিকে ফ্রান্স, ইতালি বা আলবেনিয়ার সরকারপ্রধানেরা অভিবাসনকে সরাসরি অস্থিরতার কারণ বলেছেন, এমন তথ্য মেলেনি। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার দায় দিয়েছেন উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও লুটপাটকারীদের। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, পর্তুগালের লুইস মন্টিনিগ্রো ও আলবেনিয়ার রামা নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন। অর্থাৎ দেশে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক থাকা এক কথা, আর নির্দিষ্ট বিক্ষোভের মূল কারণ অভিবাসন হওয়া আরেক কথা। সহিংসতার দৃশ্যের আড়ালে অভিবাসনকে দায়ী করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু তাতে বিক্ষোভকারীদের আসল দাবি চাপা পড়ার ঝুঁকিও থাকে।

অভিবাসীদের জন্য কী বার্তা

সামনে একের পর এক নির্বাচন। স্পেনে ভোট ২৯ নভেম্বর। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর প্রায় ছয় মাস বাকি। ইতালি ও গ্রিসে ভোট হওয়ার কথা আগামী বছর।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন লো পেন এগিয়ে। দলটি নথিহীন অভিবাসীদের বহিষ্কারসহ কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে। পলিটিকোর ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন বলছে, স্পেনের আসন্ন নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী দল ভক্স তৃতীয় স্থানে আছে। রক্ষণশীল পিপলস পার্টির সঙ্গে জোট হলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেতে পারে তারা। পর্তুগালে ২০২৪ সালের নির্বাচনে শেগা তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হয়ে ওঠে; সেখানে পরবর্তী নির্বাচন ২০২৯ সালে। ইতালি ও গ্রিস আগেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয়েছে, আর বেলজিয়াম ইইউর নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়নের পথে।

এই প্রবণতা চলতে থাকলে কঠোর নীতির পক্ষে চাপ বাড়তে পারে। বিপাকে পড়তে পারেন অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীরা।

ইউরোপে বাংলাদেশিরা

বৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিসংখ্যান জানা যায়নি। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম গত মার্চে জানায়, ২০২৪ সালের শেষে ইইউর ২৭ দেশে ৪ লাখ ২ হাজার বাংলাদেশির বৈধ বসবাসের অনুমতি ছিল। এর দুই লাখের বেশি ইতালিতে। ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও গ্রিসে প্রতিটিতে সংখ্যাটি ৫০ হাজারের কম। গত বছর সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছান ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশি; তাঁদের ৮৩ শতাংশ ইতালিতে, ১৬ শতাংশ গ্রিসে।

শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা কী বলছে

অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে প্রায়ই বলা হয়, বিদেশি কর্মীরা স্থানীয়দের চাকরি কেড়ে নেন বা মজুরি কমান। ইউরোপীয় কমিশনের ‘মাইগ্রেশন, মবিলিটি অ্যান্ড দ্য ইইউ লেবার মার্কেট: রিসেন্ট ডেভেলপমেন্টস’ গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই গবেষণা অনুযায়ী, ইইউর কর্মক্ষম জনসংখ্যায় বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত ২০১৪ সালের প্রায় ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অভিবাসন কর্মসংস্থান বাড়াতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি কমাতেও সহায়তা করেছে।

ফলে ইউরোপের রাজনীতির সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ: স্থানীয় ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখা এবং অভিবাসননীতি সামলানো। এই দুইয়ের ভারসাম্য না থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষোভ তীব্র হয়ে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে নতুন শক্তি জোগাতে পারে। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে কমানো যতটা কঠিন, অভিবাসনকে সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা ততটাই সহজ।

সূত্র: এএফপি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, পলিটিকো, আইওএম, ইউরোপীয় কমিশন

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাট, চাপে ম্যাক্রোঁ, জরুরি বৈঠক ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী

১৯ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইউরোপ জুড়ে বিক্ষোভ

আপডেট সময় ০৬:০৭:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ইউরোপের অন্তত সাতটি দেশে চলতি মাসে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখা গেছে ফ্রান্সে। ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন, গ্রিস, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে সুর চড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁদের দাবি, অস্থিরতার পেছনে অভিবাসীরাই দায়ী। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ইউরোপের মানুষ কি সত্যিই অভিবাসনে ক্ষুব্ধ, নাকি জীবনযাত্রার চাপই তাঁদের পথে নামিয়েছে?

সাত দেশ, সাত রকম ক্ষোভ

এএফপি, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, দেশগুলোর রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, দাবিও এক নয়। মিল শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা আর জনসেবার মান নিয়ে উদ্বেগে।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। প্রথমে ক্ষোভ ছিল স্কুলে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষে আসনের সংকট নিয়ে। পরে এর সঙ্গে যোগ হয় জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি, পেনশন ও সরকারি সেবার প্রশ্ন। শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে সমর্থন দেয়। বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিলেও গত শনিবার কিছু গোষ্ঠী লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

বেলজিয়ামে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। ইতালিতে অসন্তোষের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য। পর্তুগালে তরুণদের বড় দুশ্চিন্তা আবাসন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে আবাসনব্যয় ১২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।

স্পেনে বাড়িভাড়া, উচ্ছেদ ও আবাসনকে বিনিয়োগের পণ্য বানানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। একই সময়ে সরকার পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছে। গ্রিসে শিক্ষা ও আবাসনে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ চেয়েছেন।

উল্লিখিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিবাসনবিরোধিতাকে বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি হিসেবে পাওয়া যায়নি। সামনে এসেছে শিক্ষা, আবাসন, মজুরি, কর্মসংস্থান ও জনসেবার প্রশ্ন।

তাহলে আলোচনায় অভিবাসন কেন?

শনিবার ফ্রান্সের বিক্ষোভ সহিংস হওয়ার পর অভিবাসনের প্রসঙ্গ তোলেন ভ্যান্স। তাঁর দাবি, পশ্চিমা উদারপন্থিরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে ‘তৃতীয় বিশ্বকে’ আমদানি করেছে। রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা ও অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা মানুষের অভিবাসন একসময়ের মহান দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্রান্স এখন জ্বলছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন। জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি পিছিয়ে আছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের অস্থিরতাকে অভিবাসননীতির পরিণতি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

অন্যদিকে ফ্রান্স, ইতালি বা আলবেনিয়ার সরকারপ্রধানেরা অভিবাসনকে সরাসরি অস্থিরতার কারণ বলেছেন, এমন তথ্য মেলেনি। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার দায় দিয়েছেন উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও লুটপাটকারীদের। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, পর্তুগালের লুইস মন্টিনিগ্রো ও আলবেনিয়ার রামা নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন। অর্থাৎ দেশে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক থাকা এক কথা, আর নির্দিষ্ট বিক্ষোভের মূল কারণ অভিবাসন হওয়া আরেক কথা। সহিংসতার দৃশ্যের আড়ালে অভিবাসনকে দায়ী করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু তাতে বিক্ষোভকারীদের আসল দাবি চাপা পড়ার ঝুঁকিও থাকে।

অভিবাসীদের জন্য কী বার্তা

সামনে একের পর এক নির্বাচন। স্পেনে ভোট ২৯ নভেম্বর। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর প্রায় ছয় মাস বাকি। ইতালি ও গ্রিসে ভোট হওয়ার কথা আগামী বছর।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন লো পেন এগিয়ে। দলটি নথিহীন অভিবাসীদের বহিষ্কারসহ কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে। পলিটিকোর ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন বলছে, স্পেনের আসন্ন নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী দল ভক্স তৃতীয় স্থানে আছে। রক্ষণশীল পিপলস পার্টির সঙ্গে জোট হলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেতে পারে তারা। পর্তুগালে ২০২৪ সালের নির্বাচনে শেগা তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হয়ে ওঠে; সেখানে পরবর্তী নির্বাচন ২০২৯ সালে। ইতালি ও গ্রিস আগেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয়েছে, আর বেলজিয়াম ইইউর নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়নের পথে।

এই প্রবণতা চলতে থাকলে কঠোর নীতির পক্ষে চাপ বাড়তে পারে। বিপাকে পড়তে পারেন অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীরা।

ইউরোপে বাংলাদেশিরা

বৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিসংখ্যান জানা যায়নি। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম গত মার্চে জানায়, ২০২৪ সালের শেষে ইইউর ২৭ দেশে ৪ লাখ ২ হাজার বাংলাদেশির বৈধ বসবাসের অনুমতি ছিল। এর দুই লাখের বেশি ইতালিতে। ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও গ্রিসে প্রতিটিতে সংখ্যাটি ৫০ হাজারের কম। গত বছর সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছান ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশি; তাঁদের ৮৩ শতাংশ ইতালিতে, ১৬ শতাংশ গ্রিসে।

শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা কী বলছে

অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে প্রায়ই বলা হয়, বিদেশি কর্মীরা স্থানীয়দের চাকরি কেড়ে নেন বা মজুরি কমান। ইউরোপীয় কমিশনের ‘মাইগ্রেশন, মবিলিটি অ্যান্ড দ্য ইইউ লেবার মার্কেট: রিসেন্ট ডেভেলপমেন্টস’ গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই গবেষণা অনুযায়ী, ইইউর কর্মক্ষম জনসংখ্যায় বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত ২০১৪ সালের প্রায় ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অভিবাসন কর্মসংস্থান বাড়াতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি কমাতেও সহায়তা করেছে।

ফলে ইউরোপের রাজনীতির সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ: স্থানীয় ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখা এবং অভিবাসননীতি সামলানো। এই দুইয়ের ভারসাম্য না থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষোভ তীব্র হয়ে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে নতুন শক্তি জোগাতে পারে। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে কমানো যতটা কঠিন, অভিবাসনকে সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা ততটাই সহজ।

সূত্র: এএফপি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, পলিটিকো, আইওএম, ইউরোপীয় কমিশন

Share this news as a Photo Card