শিরোনাম :
বিকাশ-নগদ-রকেটের বাড়তি চার্জ কেন অবৈধ নয়, হাইকোর্টের রুল ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সাজেকে ফের অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডলারের অস্ত্রকে ভোঁতা করতে রেনমিনবির পথে এগোচ্ছে চীন, কীভাবে জুলাই হত্যাকাণ্ড: আওয়ামী লীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল সকল মাদরাসায় সরকারের নতুন নির্দেশনা মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ফের উত্তাল গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুর আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন ৩ জেলার ৭০ চরমপন্থি চার মাসে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ১০ মিনিটে হামলার হুমকি ট্রাম্পের, পাল্টা আক্রমণের জবাবের নির্দেশ খামেনির

ডলারের অস্ত্রকে ভোঁতা করতে রেনমিনবির পথে এগোচ্ছে চীন, কীভাবে

একাত্তর সালের কথা। আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা তখন ভেঙে পড়ার মুখে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী জন কনেলি উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় অর্থমন্ত্রীদের উদ্দেশে একটি কথা বলেছিলেন। ডলার ‘আমাদের মুদ্রা, কিন্তু সমস্যাটা আপনাদের’। প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে সেই কথাটি নতুন করে ভাবাচ্ছে বেইজিংকে।

ডলারকে কোনো একদিন চীনের জন্য ‘সমস্যা’ বানিয়ে তুলতে পারে ওয়াশিংটন, এমন আশঙ্কা থেকেই চীন নিজস্ব সমাধানের পথ খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জোংইউয়ান জোই লিউ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে এক বিশ্লেষণে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। তাঁর যুক্তি, রেনমিনবির আন্তর্জাতিকীকরণ আসলে ডলারকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা নয়। এটি মূলত আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একধরনের সুরক্ষা।

ডলারের ইতিহাস ও চীনের উদ্বেগ

১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক রিজার্ভ মুদ্রার স্বীকৃতি পায়। ফলে চুক্তিতে সই করা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের পর এবং বিশ্বের বহু মুদ্রা মুক্তভাবে ভাসমান হওয়ার পরেও ডলারের আধিপত্য থেকে গেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক ভাষণে চীনের নেতা সি চিন পিং দেশটিকে একটি ‘শীর্ষস্থানীয় আর্থিক শক্তিতে’ রূপান্তরের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী মুদ্রা এই শক্তির অন্যতম অপরিহার্য ভিত্তি। লিউয়ের মতে, ডলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে বড় শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সর্বশেষ অধ্যায় এটি। তবে ইউরোপ বা জাপানের সঙ্গে চীনের তফাত হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক ইচ্ছা চীনের আছে।

নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি, বিমার ভাবনা

লিউ মনে করিয়ে দেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডলারকে শাস্তিমূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো চীনের ক্ষেত্রেও তেমন পথ নেয়, তখন রেনমিনবির আন্তর্জাতিকীকরণ বেইজিংয়ের জন্য টিকে থাকার একধরনের আর্থিক বিমা হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার সরবরাহই নিয়ন্ত্রণ করে না, সেই মুদ্রা যেসব জটিল আর্থিক নেটওয়ার্কে আবর্তিত হয়, তারও মূল নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। ওয়াশিংটন চাইলে চীনকে ডলারের তরলতা থেকে তীব্রভাবে বঞ্চিত করতে পারে। লিউয়ের ভাষ্যে, তাতে চীনের আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামবে, বাণিজ্যের খরচ বাড়বে এবং রপ্তানি খাত বড় ধাক্কা খাবে। চীনের জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই খাত থেকে।

তবে টিকে থাকার ব্যবস্থা কেবল প্রথম শর্ত। যুক্তরাষ্ট্রকে ডলার-অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে বেইজিংয়ের ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ দরকার। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ রেনমিনবিভিত্তিক নেটওয়ার্কে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

বিশ্লেষকের মতে, সি চিন পিং রেনমিনবি দিয়ে ডলারকে প্রতিস্থাপন করতে চান, এমন নিশ্চয়তা নেই। ২০২৪ সালের ভাষণে তিনি মুদ্রার শক্তির কথা বলেছিলেন, আধিপত্যের কথা নয়। ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা সীমিত করতে চীনের জন্য সম্মানজনক দ্বিতীয় বা প্রভাবশালী তৃতীয় স্থানই যথেষ্ট।

ডলারের সুবিধা ভোগীও চীন

লিউয়ের পর্যবেক্ষণ, ডলারের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থেকে সম্ভবত অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনই বেশি সুবিধা পায়। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশটির পণ্য ডলারে মূল্য নির্ধারণ ও অর্থায়ন হওয়ায় প্রায় যেকোনো বাজারের ক্রেতার কাছে সহজে পৌঁছায়। বিপরীতে বৈশ্বিক ডলার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশিদের হাতে থাকা ক্রমবর্ধমান ডলারের দাবির বোঝা বইতে হয়। আর্থিক সংকটের সময় ফেডারেল রিজার্ভকে ব্যালান্স শিট সম্প্রসারণ করতে হয়।

চীনের নেতারা এমন বিনিময়ে আগ্রহী নন বলে মনে করেন লিউ। বৈশ্বিক রেনমিনবি ব্যবস্থা চালু রাখা চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেলের পরিপন্থী। রেনমিনবিকে ডলারের ভূমিকা নিতে হলে দ্বিমুখী আর্থিক পথ তৈরি করতে হবে, যাতে বিদেশি ধারকেরা সেই অর্থ আবার চীনের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু তাতে যে মূলধনপ্রবাহ তৈরি হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক বাজারকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।

আরেকটি দিকও আছে। চীনের অনেক বিত্তবান নাগরিকের, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কিছু সদস্যেরও, কাছে ডলার রাজনৈতিক ঝুঁকির বিমার মতো। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামান্য আইনি প্রক্রিয়া মেনেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা কারাদণ্ড হতে পারে। অফশোর ডলার ডিপোজিট ও বিদেশি করপোরেট কাঠামো তাঁদের সম্পদ নানা মুদ্রা ও বিচারব্যবস্থায় ছড়িয়ে রাখার সুযোগ দেয়। কেউই এই আশ্রয় হারাতে চান না।

পাঁচ ধাপের লড়াই

লিউ বলছেন, শতাধিক দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য লেনদেন নিষ্পত্তি, বাণিজ্য-বিনিয়োগের অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় রেনমিনবির ব্যবহার সহজ করে চীন ভিত্তি গড়েছে। এখানে গভীরতার চেয়ে পরিধিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রস্তুতকৃত পণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশ ছিল চীনের।

২০০৫ সালে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার তৎকালীন গভর্নর জৌ জিয়াওচুয়ান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারে জনসমক্ষে উৎসাহ দেন। ২০০৯ সালে সীমান্ত পেরোনো লেনদেন নিষ্পত্তির পাইলট প্রকল্প চালু হয়। ২০১৫ সালে গড়া হয় ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’, যা আন্তর্জাতিক রেনমিনবি নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি।

কিন্তু পেমেন্ট দেখে মুদ্রার আসল ক্ষমতা মাপা যায় না। লিউয়ের ব্যাখ্যায়, একটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে পাঁচ ধাপের আর্থিক পরিষেবা লাগে: মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন, ঝুঁকি হস্তান্তর, পেমেন্ট ও পুনর্বিনিয়োগ। ডলার প্রতিটি ধাপে ডিফল্ট মুদ্রা, আর এক ধাপের শক্তি অন্য ধাপে তার অবস্থান জোরদার করে। রেনমিনবিকে জায়গা নিতে হলে প্রতিটি ধাপেই প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।

মূল্য নির্ধারণ: ‘চায়না প্রাইসেস’

পেমেন্টের ধাপে উপস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে বেইজিং। এখন তারা মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন ও ঝুঁকি হস্তান্তরের দিকে এগোচ্ছে, সতর্কভাবে পুনর্বিনিয়োগের দিকেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আনুমানিক হিসাবে ২০২৩ সালে চীনের রপ্তানি পণ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশের ইনভয়েস রেনমিনবিতে হয়েছিল। অন্যদিকে চীনা সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য বাণিজ্য রেনমিনবিতে নিষ্পত্তি হয়।

এই চিত্র বদলাতে সরকার ‘চায়না প্রাইসেস’ প্রচার করছে। এর অর্থ, চীন যেসব প্রধান কাঁচামাল আমদানি করে, স্থানীয় এক্সচেঞ্জে সেগুলোর রেনমিনবি-মূল্যের বেঞ্চমার্ক তালিকাভুক্ত করা। সংকটপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা আরও জরুরি, কারণ সবুজ শিল্পকে সি চিন পিং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় বিষয় মনে করেন।

লিউয়ের হিসাবে, চীন বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি তৈরি করে। এসব ব্যাটারিতে বিশ্বের ৭৫ শতাংশের বেশি লিথিয়াম, ৭০ শতাংশ কোবাল্ট ও প্রায় ৬০ শতাংশ নিকেল ব্যবহার হয়। তবু এসব খনিজের বিশ্ববাজারে চীনের অবস্থান উৎপাদন ও ব্যবহারের আধিপত্যকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। নিকেল ও কোবাল্ট এখনো লন্ডন ও শিকাগোর ডলার-বেঞ্চমার্কের সঙ্গে বাঁধা। বৃহত্তম ভোক্তা হয়েও চীন এ দুটির আর্থিক রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারেনি। ‘চায়না প্রাইসেস’ উদ্যোগের লক্ষ্য এই গরমিল দূর করা।

অর্থায়ন ও পুনর্বিনিয়োগ

অর্থায়নের ধাপেও গতি এসেছে। ২০২৩ সালে বেইজিং চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে রেনমিনবি অর্থায়ন বাড়াতে নির্দেশ দেয়। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার মতো রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্ট ঋণদাতারা বিদেশে বাণিজ্য ও অবকাঠামো প্রকল্পে রেনমিনবি ঋণ বাড়িয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকও রেনমিনবিতে বাণিজ্য অর্থায়ন জোগাচ্ছে। বিমা ও পুনর্বিমার বাজারে রেনমিনবির উপস্থিতি বাড়াতেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শেষ ধাপ পুনর্বিনিয়োগ। অর্থ পাওয়ার পর প্রাপককে ঠিক করতে হয়, সেটি স্বল্পমেয়াদি অ্যাকাউন্টে থাকবে, দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে যাবে, নাকি অন্য মুদ্রায় রূপান্তরিত হবে। লিউয়ের মতে, মুদ্রাব্যবস্থা টেকসই হয় তখনই, যখন প্রাপকেরা ব্যালান্স রূপান্তরের বদলে ধরে রাখতে ও পুনর্বিনিয়োগ করতে চান। এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় দুশ্চিন্তা এখন বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, বরং বেইজিংয়ের অনির্দেশ্য মূলধন নিয়ন্ত্রণ কখনো তহবিল আটকে দেবে কি না।

সবুজ শক্তি: নতুন নোঙর?

ডলার ব্যবস্থায় জ্বালানি তেলের বাণিজ্য দীর্ঘদিন যে ভূমিকা রেখেছে, যার থেকে ‘পেট্রোডলার’ শব্দের জন্ম, লিউ মনে করেন রেনমিনবির ক্ষেত্রে তার সমতুল্য নোঙর হতে পারে সংকটপূর্ণ খনিজ, ক্লিন এনার্জি সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো। কয়েক দশক ধরে পদ্ধতিগতভাবে চীন এমন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়েছে, যা তাকে সবুজ শক্তি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের শীর্ষ উৎপাদনকারী করেছে।

প্রথম এগিয়ে যাওয়ার সুবিধা নেওয়ার পর বেইজিং এখন স্কেল অব ইকোনমি কাজে লাগিয়ে বাজার সংহত করছে এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কারিগরি মান উঁচু করছে। এ পর্যন্ত শিল্প নেতৃত্বকে আর্থিক শক্তিতে রূপান্তরের চেয়ে নেতৃত্ব বিস্তারেই মনোযোগ ছিল বেশি। লিউয়ের পর্যবেক্ষণ, সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি সবুজ ঋণের বড় অংশকে তদারকিযোগ্য, ট্রেডেবল সিকিউরিটিজে রূপ দিচ্ছে, যাতে বিদেশিরা আন্তর্জাতিক টেকসই মানদণ্ড মেনে তা কিনতে পারেন।

যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান সবুজ অর্থনীতিতে ঢুকতে চায়, তাদের জন্য রেনমিনবি অর্থায়ন ও চীনা কারিগরি মান মেনে নেওয়া একসময় প্রবেশমূল্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন লিউ। তাতে সবুজ পণ্য ও সবুজ অর্থায়নের এমন চক্র তৈরি হবে, যার সিংহভাগ রেনমিনবিতে।

ওয়াশিংটনের জন্য প্রশ্ন

লিউ বলছেন, ‘গ্রিন ইউয়ান’-এর সম্ভাবনা দেখে ওয়াশিংটনের আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। বরং আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার: পেট্রোডলার কি এখনো উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম, আর ভবিষ্যতে কোন সম্পদ, প্রযুক্তি বা শিল্পব্যবস্থা ডলারের মুদ্রাশক্তিকে নোঙর করতে পারে।

তাঁর বিশ্লেষণে, বেইজিং ডলারকে উৎখাতের চক্রান্ত করছে না। এমন বিজয়ের জন্য যে আর্থিক উন্মুক্ততা দরকার, কমিউনিস্ট পার্টি সম্ভবত তা চায়ও না। আন্তর্জাতিকীকৃত রেনমিনবির তাৎক্ষণিক মূল্য হলো, চীনবিরোধী মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার থেকে নিবৃত্ত রাখা। রেনমিনবিভিত্তিক ব্যবস্থা যত শক্ত হবে, নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সইবার ক্ষমতাও তত বাড়বে, আর নিষেধাজ্ঞার হুমকি হারাবে কার্যকারিতা।

শেষ কথাটি তিনি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে। ডলারের রাজত্ব যদি কখনো শেষ হয়, তা সম্ভবত চীনের সিংহাসন দখলে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের সমর্পণের কারণেই হবে। পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থার কৌশলগত সম্পদ হয়তো তেলের ব্যারেল নয়, একটি শিল্প ইকোসিস্টেম।

সূত্র: ফরেন অ্যাফেয়ার্স

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

বিকাশ-নগদ-রকেটের বাড়তি চার্জ কেন অবৈধ নয়, হাইকোর্টের রুল

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

১০ মিনিটে হামলার হুমকি ট্রাম্পের, পাল্টা আক্রমণের জবাবের নির্দেশ খামেনির

০১ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ডলারের অস্ত্রকে ভোঁতা করতে রেনমিনবির পথে এগোচ্ছে চীন, কীভাবে

আপডেট সময় ০২:১৬:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

একাত্তর সালের কথা। আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা তখন ভেঙে পড়ার মুখে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী জন কনেলি উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় অর্থমন্ত্রীদের উদ্দেশে একটি কথা বলেছিলেন। ডলার ‘আমাদের মুদ্রা, কিন্তু সমস্যাটা আপনাদের’। প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে সেই কথাটি নতুন করে ভাবাচ্ছে বেইজিংকে।

ডলারকে কোনো একদিন চীনের জন্য ‘সমস্যা’ বানিয়ে তুলতে পারে ওয়াশিংটন, এমন আশঙ্কা থেকেই চীন নিজস্ব সমাধানের পথ খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জোংইউয়ান জোই লিউ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে এক বিশ্লেষণে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। তাঁর যুক্তি, রেনমিনবির আন্তর্জাতিকীকরণ আসলে ডলারকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা নয়। এটি মূলত আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একধরনের সুরক্ষা।

ডলারের ইতিহাস ও চীনের উদ্বেগ

১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক রিজার্ভ মুদ্রার স্বীকৃতি পায়। ফলে চুক্তিতে সই করা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের পর এবং বিশ্বের বহু মুদ্রা মুক্তভাবে ভাসমান হওয়ার পরেও ডলারের আধিপত্য থেকে গেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক ভাষণে চীনের নেতা সি চিন পিং দেশটিকে একটি ‘শীর্ষস্থানীয় আর্থিক শক্তিতে’ রূপান্তরের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী মুদ্রা এই শক্তির অন্যতম অপরিহার্য ভিত্তি। লিউয়ের মতে, ডলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে বড় শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সর্বশেষ অধ্যায় এটি। তবে ইউরোপ বা জাপানের সঙ্গে চীনের তফাত হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক ইচ্ছা চীনের আছে।

নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি, বিমার ভাবনা

লিউ মনে করিয়ে দেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডলারকে শাস্তিমূলক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো চীনের ক্ষেত্রেও তেমন পথ নেয়, তখন রেনমিনবির আন্তর্জাতিকীকরণ বেইজিংয়ের জন্য টিকে থাকার একধরনের আর্থিক বিমা হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার সরবরাহই নিয়ন্ত্রণ করে না, সেই মুদ্রা যেসব জটিল আর্থিক নেটওয়ার্কে আবর্তিত হয়, তারও মূল নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। ওয়াশিংটন চাইলে চীনকে ডলারের তরলতা থেকে তীব্রভাবে বঞ্চিত করতে পারে। লিউয়ের ভাষ্যে, তাতে চীনের আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামবে, বাণিজ্যের খরচ বাড়বে এবং রপ্তানি খাত বড় ধাক্কা খাবে। চীনের জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই খাত থেকে।

তবে টিকে থাকার ব্যবস্থা কেবল প্রথম শর্ত। যুক্তরাষ্ট্রকে ডলার-অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে বেইজিংয়ের ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ দরকার। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ রেনমিনবিভিত্তিক নেটওয়ার্কে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

বিশ্লেষকের মতে, সি চিন পিং রেনমিনবি দিয়ে ডলারকে প্রতিস্থাপন করতে চান, এমন নিশ্চয়তা নেই। ২০২৪ সালের ভাষণে তিনি মুদ্রার শক্তির কথা বলেছিলেন, আধিপত্যের কথা নয়। ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা সীমিত করতে চীনের জন্য সম্মানজনক দ্বিতীয় বা প্রভাবশালী তৃতীয় স্থানই যথেষ্ট।

ডলারের সুবিধা ভোগীও চীন

লিউয়ের পর্যবেক্ষণ, ডলারের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থেকে সম্ভবত অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনই বেশি সুবিধা পায়। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশটির পণ্য ডলারে মূল্য নির্ধারণ ও অর্থায়ন হওয়ায় প্রায় যেকোনো বাজারের ক্রেতার কাছে সহজে পৌঁছায়। বিপরীতে বৈশ্বিক ডলার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশিদের হাতে থাকা ক্রমবর্ধমান ডলারের দাবির বোঝা বইতে হয়। আর্থিক সংকটের সময় ফেডারেল রিজার্ভকে ব্যালান্স শিট সম্প্রসারণ করতে হয়।

চীনের নেতারা এমন বিনিময়ে আগ্রহী নন বলে মনে করেন লিউ। বৈশ্বিক রেনমিনবি ব্যবস্থা চালু রাখা চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেলের পরিপন্থী। রেনমিনবিকে ডলারের ভূমিকা নিতে হলে দ্বিমুখী আর্থিক পথ তৈরি করতে হবে, যাতে বিদেশি ধারকেরা সেই অর্থ আবার চীনের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু তাতে যে মূলধনপ্রবাহ তৈরি হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক বাজারকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।

আরেকটি দিকও আছে। চীনের অনেক বিত্তবান নাগরিকের, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কিছু সদস্যেরও, কাছে ডলার রাজনৈতিক ঝুঁকির বিমার মতো। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামান্য আইনি প্রক্রিয়া মেনেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা কারাদণ্ড হতে পারে। অফশোর ডলার ডিপোজিট ও বিদেশি করপোরেট কাঠামো তাঁদের সম্পদ নানা মুদ্রা ও বিচারব্যবস্থায় ছড়িয়ে রাখার সুযোগ দেয়। কেউই এই আশ্রয় হারাতে চান না।

পাঁচ ধাপের লড়াই

লিউ বলছেন, শতাধিক দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য লেনদেন নিষ্পত্তি, বাণিজ্য-বিনিয়োগের অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় রেনমিনবির ব্যবহার সহজ করে চীন ভিত্তি গড়েছে। এখানে গভীরতার চেয়ে পরিধিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রস্তুতকৃত পণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশ ছিল চীনের।

২০০৫ সালে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার তৎকালীন গভর্নর জৌ জিয়াওচুয়ান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারে জনসমক্ষে উৎসাহ দেন। ২০০৯ সালে সীমান্ত পেরোনো লেনদেন নিষ্পত্তির পাইলট প্রকল্প চালু হয়। ২০১৫ সালে গড়া হয় ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’, যা আন্তর্জাতিক রেনমিনবি নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি।

কিন্তু পেমেন্ট দেখে মুদ্রার আসল ক্ষমতা মাপা যায় না। লিউয়ের ব্যাখ্যায়, একটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে পাঁচ ধাপের আর্থিক পরিষেবা লাগে: মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন, ঝুঁকি হস্তান্তর, পেমেন্ট ও পুনর্বিনিয়োগ। ডলার প্রতিটি ধাপে ডিফল্ট মুদ্রা, আর এক ধাপের শক্তি অন্য ধাপে তার অবস্থান জোরদার করে। রেনমিনবিকে জায়গা নিতে হলে প্রতিটি ধাপেই প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।

মূল্য নির্ধারণ: ‘চায়না প্রাইসেস’

পেমেন্টের ধাপে উপস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে বেইজিং। এখন তারা মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন ও ঝুঁকি হস্তান্তরের দিকে এগোচ্ছে, সতর্কভাবে পুনর্বিনিয়োগের দিকেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আনুমানিক হিসাবে ২০২৩ সালে চীনের রপ্তানি পণ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশের ইনভয়েস রেনমিনবিতে হয়েছিল। অন্যদিকে চীনা সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য বাণিজ্য রেনমিনবিতে নিষ্পত্তি হয়।

এই চিত্র বদলাতে সরকার ‘চায়না প্রাইসেস’ প্রচার করছে। এর অর্থ, চীন যেসব প্রধান কাঁচামাল আমদানি করে, স্থানীয় এক্সচেঞ্জে সেগুলোর রেনমিনবি-মূল্যের বেঞ্চমার্ক তালিকাভুক্ত করা। সংকটপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা আরও জরুরি, কারণ সবুজ শিল্পকে সি চিন পিং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় বিষয় মনে করেন।

লিউয়ের হিসাবে, চীন বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি তৈরি করে। এসব ব্যাটারিতে বিশ্বের ৭৫ শতাংশের বেশি লিথিয়াম, ৭০ শতাংশ কোবাল্ট ও প্রায় ৬০ শতাংশ নিকেল ব্যবহার হয়। তবু এসব খনিজের বিশ্ববাজারে চীনের অবস্থান উৎপাদন ও ব্যবহারের আধিপত্যকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। নিকেল ও কোবাল্ট এখনো লন্ডন ও শিকাগোর ডলার-বেঞ্চমার্কের সঙ্গে বাঁধা। বৃহত্তম ভোক্তা হয়েও চীন এ দুটির আর্থিক রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারেনি। ‘চায়না প্রাইসেস’ উদ্যোগের লক্ষ্য এই গরমিল দূর করা।

অর্থায়ন ও পুনর্বিনিয়োগ

অর্থায়নের ধাপেও গতি এসেছে। ২০২৩ সালে বেইজিং চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে রেনমিনবি অর্থায়ন বাড়াতে নির্দেশ দেয়। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার মতো রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্ট ঋণদাতারা বিদেশে বাণিজ্য ও অবকাঠামো প্রকল্পে রেনমিনবি ঋণ বাড়িয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকও রেনমিনবিতে বাণিজ্য অর্থায়ন জোগাচ্ছে। বিমা ও পুনর্বিমার বাজারে রেনমিনবির উপস্থিতি বাড়াতেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শেষ ধাপ পুনর্বিনিয়োগ। অর্থ পাওয়ার পর প্রাপককে ঠিক করতে হয়, সেটি স্বল্পমেয়াদি অ্যাকাউন্টে থাকবে, দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে যাবে, নাকি অন্য মুদ্রায় রূপান্তরিত হবে। লিউয়ের মতে, মুদ্রাব্যবস্থা টেকসই হয় তখনই, যখন প্রাপকেরা ব্যালান্স রূপান্তরের বদলে ধরে রাখতে ও পুনর্বিনিয়োগ করতে চান। এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় দুশ্চিন্তা এখন বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, বরং বেইজিংয়ের অনির্দেশ্য মূলধন নিয়ন্ত্রণ কখনো তহবিল আটকে দেবে কি না।

সবুজ শক্তি: নতুন নোঙর?

ডলার ব্যবস্থায় জ্বালানি তেলের বাণিজ্য দীর্ঘদিন যে ভূমিকা রেখেছে, যার থেকে ‘পেট্রোডলার’ শব্দের জন্ম, লিউ মনে করেন রেনমিনবির ক্ষেত্রে তার সমতুল্য নোঙর হতে পারে সংকটপূর্ণ খনিজ, ক্লিন এনার্জি সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো। কয়েক দশক ধরে পদ্ধতিগতভাবে চীন এমন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়েছে, যা তাকে সবুজ শক্তি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের শীর্ষ উৎপাদনকারী করেছে।

প্রথম এগিয়ে যাওয়ার সুবিধা নেওয়ার পর বেইজিং এখন স্কেল অব ইকোনমি কাজে লাগিয়ে বাজার সংহত করছে এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কারিগরি মান উঁচু করছে। এ পর্যন্ত শিল্প নেতৃত্বকে আর্থিক শক্তিতে রূপান্তরের চেয়ে নেতৃত্ব বিস্তারেই মনোযোগ ছিল বেশি। লিউয়ের পর্যবেক্ষণ, সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি সবুজ ঋণের বড় অংশকে তদারকিযোগ্য, ট্রেডেবল সিকিউরিটিজে রূপ দিচ্ছে, যাতে বিদেশিরা আন্তর্জাতিক টেকসই মানদণ্ড মেনে তা কিনতে পারেন।

যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান সবুজ অর্থনীতিতে ঢুকতে চায়, তাদের জন্য রেনমিনবি অর্থায়ন ও চীনা কারিগরি মান মেনে নেওয়া একসময় প্রবেশমূল্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন লিউ। তাতে সবুজ পণ্য ও সবুজ অর্থায়নের এমন চক্র তৈরি হবে, যার সিংহভাগ রেনমিনবিতে।

ওয়াশিংটনের জন্য প্রশ্ন

লিউ বলছেন, ‘গ্রিন ইউয়ান’-এর সম্ভাবনা দেখে ওয়াশিংটনের আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। বরং আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার: পেট্রোডলার কি এখনো উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম, আর ভবিষ্যতে কোন সম্পদ, প্রযুক্তি বা শিল্পব্যবস্থা ডলারের মুদ্রাশক্তিকে নোঙর করতে পারে।

তাঁর বিশ্লেষণে, বেইজিং ডলারকে উৎখাতের চক্রান্ত করছে না। এমন বিজয়ের জন্য যে আর্থিক উন্মুক্ততা দরকার, কমিউনিস্ট পার্টি সম্ভবত তা চায়ও না। আন্তর্জাতিকীকৃত রেনমিনবির তাৎক্ষণিক মূল্য হলো, চীনবিরোধী মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার থেকে নিবৃত্ত রাখা। রেনমিনবিভিত্তিক ব্যবস্থা যত শক্ত হবে, নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সইবার ক্ষমতাও তত বাড়বে, আর নিষেধাজ্ঞার হুমকি হারাবে কার্যকারিতা।

শেষ কথাটি তিনি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে। ডলারের রাজত্ব যদি কখনো শেষ হয়, তা সম্ভবত চীনের সিংহাসন দখলে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের সমর্পণের কারণেই হবে। পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থার কৌশলগত সম্পদ হয়তো তেলের ব্যারেল নয়, একটি শিল্প ইকোসিস্টেম।

সূত্র: ফরেন অ্যাফেয়ার্স

Share this news as a Photo Card