ভারতে কেন আলোড়ন তুলেছে জেন–জিদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন নতুন এক ঝড়। মাত্র পাঁচ দিন আগে জন্ম নেওয়া একটি গ্রুপ রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছে সে দেশের মূলধারার রাজনীতিকে। নাম তার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। নতুন প্রজন্মের (জেন-জি) নানা উদ্বেগ, বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতির মতো গুরুতর বিষয়গুলোকে হাস্যরসের ছলে তুলে ধরে এই গ্রুপটি এখন দেশটির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
চমকপ্রদ তথ্য হলো, মাত্র এক সপ্তাহের কম সময়ে এই গ্রুপটি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করা বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার যেখানে ৯০ লাখের নিচে, সেখানে সিজেপি পার করেছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখের মাইলফলক। ফোনের ওপর একটি তেলাপোকার অবয়বকে লোগো বানিয়ে এই গ্রুপটি নিজেদের ঘোষণা করেছে ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে।
কেন এই অদ্ভুত নাম?
গ্রুপটির ৩০ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানান এই নামকরণের পেছনের গল্প। সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কিছু বেকার যুবককে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করার পর এই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে নাম দেওয়া হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। পরে প্রধান বিচারপতি অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি তরুণদের নয়, বরং ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী’ পরজীবীদের বুঝিয়েছেন।
দুই বছর ধরে বোস্টনে বসবাস করা দিপকে বলেন, “এটি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনাকে বদলে দেওয়ার একটি আন্দোলন। মূলধারার রাজনীতি থেকে যুবসমাজ আজ হারিয়ে গেছে। আমাদের সমস্যা কেউ শুনছে না, অস্তিত্বটুকুও স্বীকার করছে না।”
ক্ষোভের প্রকাশ যখন গ্রাফিক্সে
সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এখন তরুণদের ক্ষোভ আর দাবির মঞ্চ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সংসদ ও মন্ত্রিসভায় নারীদের জন্য অর্ধেক আসন সংরক্ষণের মতো দাবি উঠে আসছে তাদের তৈরি গ্রাফিক্স ও ভিডিওতে। বাদ যায়নি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে সম্প্রতি বাতিল হওয়া জাতীয় মেডিকেল কলেজ প্রবেশিকা পরীক্ষার (NEET) প্রসঙ্গও, যার ফলে প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ভারতের তরুণদের এই মানসিক চাপ ও ক্ষোভের সত্যতা মিলেছে সাম্প্রতিক ‘ডেলয়েট গ্লোবাল’-এর একটি জরিপেও। সেখানে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থানের অভাব ও তীব্র আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভারতের জেন-জি (১৯৯৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী) জনগোষ্ঠী।
আন্দোলন কি রাজপথে যাবে?
প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে জেন-জিদের নেতৃত্বে রাজপথের আন্দোলনে সরকার পতনের ঘটনা ঘটলেও, সিজেপি সেই পথ মাড়াতে নারাজ। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা দিপকে বলেন, “এটির বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমরা যা-ই করব, সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে থেকে অত্যন্ত গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে করব।”
ইতিমধ্যেই গুগল ফর্মের মাধ্যমে ৪ লাখের বেশি তরুণ সিজেপির সদস্য হতে নিবন্ধন করেছেন, যার ৭০ শতাংশের বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। মজার ব্যাপার হলো, সদস্য পদের জন্য দলটির পক্ষ থেকে চারটি যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে—বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইনে সক্রিয় এবং ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হতে হবে।
লক্ষ্ণৌর ২৬ বছর বয়সী তরুণ সদস্য সিদ্ধার্থ কানৌজিয়া বলেন, “ককরোচ জনতা পার্টিকে আমার সত্যিই খুব পছন্দ হয়েছে। তেলাপোকা মূলত টিকে থাকার লড়াই বা সহনশীলতার প্রতীক, যা প্রতিটি চ্যালেঞ্জের পর আরও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।” তরুণদের এই অভিনব সামাজিক আন্দোলন ভারতের আগামী দিনের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এস কে চন্দন 





















