ঢাকা, ০৪ জুন ২০২৬
ঢাকার রায়েরবাজারের বাসিন্দা সুমন রাহা প্রতিদিন মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় যাতায়াত করেন। একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরির সুবাদে সকালে এসে সন্ধ্যায় ফিরতে হয়। প্রতিদিনের এই যাতায়াত তাঁর জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম। “বাসগুলোর যে লক্কড়ঝক্কড় অবস্থা, তাতে ওঠাই যায় না। বাধ্য হয়ে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে উবার নিতে গেলে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। যদি একটা ভালো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের সুবিধা থাকত, তবে সাধারণ মানুষ অন্তত স্বস্তিতে ও সাশ্রয়ে যাতায়াত করতে পারত,” বলছিলেন তিনি।
সুমন রাহা এই ক্ষোভ ও আর্তি মূলত ঢাকার প্রায় দেড় কোটি মানুষের প্রতিদিনকার বাস্তব চিত্র। এই বিশাল মেগাসিটিতে এখন মানসম্মত গণপরিবহন যেন এক সোনার হরিণ। অথচ ঢাকার সিংহভাগ মানুষ যাতায়াতের জন্য বাসের ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতির উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় ধুমধাম করে ৬৯০টি নতুন ডিজেলচালিত এসি বাস নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, গত ছয় মাসেও সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। বেসরকারি আমদানিকারক ও পরিবহন কোম্পানিগুলো একটি বাসও রাস্তায় নামাতে পারেনি। এই ব্যর্থতার পর সরকার এখন নতুন করে কৌশল বদলাচ্ছে। এবার জোর দেওয়া হচ্ছে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী ‘ইলেকট্রিক বাস’ (ই-বাস) চালুর ওপর।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা আর পরিবহন মালিকদের অনীহার যে বৃত্তে এসি বাস আটকে গেল, তা পেরিয়ে ইলেকট্রিক বাস কি সত্যিই ঢাকার সড়কে স্বস্তি ফেরাতে পারবে?
আটকে গেল ৬৯০টি ডিজেল এসি বাস: নেপথ্যে কী?
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন পর কার্যকর করা হয়েছিল ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটিকে (মেট্রো আরটিসি)। ঢাকার পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে এবং বিআরটিএর ঢাকা বিভাগীয় পরিচালকের পরিচালনায় এই কমিটি গত বছরের ৬ নভেম্বরের এক সভায় একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সভায় বিভিন্ন রুটের জন্য প্রায় ৩ হাজার বাসের আবেদন জমা পড়লেও, লক্কড়ঝক্কড় নন-এসি বাসের অনুমতি না দিয়ে কেবল ১০টি রুটে ৬৯০টি আধুনিক এসি বাস নামানোর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এসব বাস ঢাকা ও এর আশপাশের সড়কে নামাতে হবে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও দৃশ্যপট বদলায়নি। কেন এই স্থবিরতা? অনুসন্ধান এবং পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানা যায়, প্রধান বাধা আর্থিক এবং কৌশলগত।
- ব্যয় ও আমদানির সংকট: অনুমোদিত কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ ভারত ও চীনের অটোমোবাইল নির্মাতাদের সাথে যোগাযোগ করলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উচ্চ আমদানি ব্যয় ও কর কাঠামোর কারণে প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করতে পারেনি।
- পুরোনো বাসের পুনর্ব্যবহারের চেষ্টা: কিছু মালিক দূরপাল্লার পুরোনো এসি বাস মেরামত করে ঢাকার রাস্তায় নামানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শহরের গণপরিবহনে কোনো পুরোনো বা জোড়াতালির বাসের অনুমোদন দেওয়া হবে না।
- মালিকদের ভিন্ন স্বার্থ: ‘চিত্রা পরিবহন লিমিটেড’ ১২০টি এবং ‘টাইম বার্ড এক্সপ্রেস’ ১০০টি এসি বাসের অনুমতি পেয়েছিল। চিত্রা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম সরদার স্বীকার করেন যে, তাঁরা কোনো বাসই নামাতে পারেননি। তাঁর দাবি, তাঁরা মূলত নন-এসি বাসের জন্য জোর দিয়েছিলেন, কারণ এসি বাসের চেয়ে নন-এসি বাস পরিচালন ব্যয় কম এবং লাভজনক। একই অবস্থা ২০০টি বাসের অনুমোদন পাওয়া ‘শাপলা পরিবহন’-এরও। তাদের বাসগুলো সাভারের চন্দ্রা থেকে মোহাম্মদপুর হয়ে ধোলাইখাল পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও, তারা এখনো আমদানির প্রাথমিক ধাপই পার হতে পারেনি।
সরকারের নতুন চালিকাশক্তি: নজর এখন ইলেকট্রিক বাসে
ডিজেলচালিত বাস নামাতে মালিকদের এই ব্যর্থতার পর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন পুরো মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে ইলেকট্রিক এসি ও নন-এসি বাসের দিকে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক এ বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “সরকার মূলত দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে—জ্বালানি সাশ্রয় এবং গণপরিবহনে কঠোর শৃঙ্খলা। আর এই লক্ষ্য পূরণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো ইলেকট্রিক বাস। আমরা সরকারিভাবে যেমন ই-বাস আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছি, ঠিক তেমনি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসার জন্য বড় ধরনের নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক ছাড়ের পরিকল্পনা করছি।”
সরকারের এই নতুন মহাপরিকল্পনায় শুধু বাসের ইঞ্জিন পরিবর্তন নয়, বরং গোটা যাত্রী সেবার মান আধুনিকায়নের রূপরেখা রয়েছে:
১. অটো-ডোর ও ই-টিকেটিং: নতুন প্রতিটি ইলেকট্রিক বাসে স্বয়ংক্রিয় দরজা এবং ডিজিটাল টিকিটের ব্যবস্থা থাকবে।
২. কাউন্টারভিত্তিক সেবা: চালকের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে বাস চালানো (যা সড়কে প্রতিযোগিতার মূল কারণ) বন্ধ করে সম্পূর্ণ কাউন্টারভিত্তিক ও বেতনভুক্ত চালক প্রথা চালু করা হবে।
৩. অভিন্ন রং ও ফ্র্যাঞ্চাইজি: একই রুটের বা একই কোম্পানির সব বাসের রং হবে একই রকম। ছোট ছোট মালিকদের বাদ দিয়ে বড় বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে এই বাসগুলো পরিচালিত হবে।
ইতিমধ্যেই ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, তাঁরা পরিবহন মালিকদের একটি জোট তৈরি করে ঢাকার একটি নির্দিষ্ট রুটে প্রাথমিকভাবে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস নামানোর জন্য কাজ শুরু করেছেন।
কেন হারিয়ে গেল ঢাকার এসি বাস?
আজ থেকে দুই দশক আগেও ঢাকার বুকে সাভার কিংবা উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে ‘প্রিমিয়াম’, ‘নিরাপদ’ কিংবা ‘ট্রান্স মিলেনিয়াম’-এর মতো চমৎকার এসি বাস সার্ভিস চালু ছিল। মধ্যবিত্ত ও চাকুরিজীবীদের জন্য তা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেগুলো উধাও হয়ে গেছে। সম্প্রতি গুলশান-বনানী এলাকায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত রুটে চলাচলকারী ‘ঢাকা চাকা’ ছাড়া পুরো ঢাকা শহরে এসি বাস এখন ডুমুরের ফুল। সরকারি সংস্থা বিআরটিসি কিছু এসি বাস নামালেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও এখন অকেজো বা রুটচ্যুত।
মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর ঢাকার মানুষের মাঝে এসি যাতায়াতের চাহিদা যে কতটা ব্যাপক, তা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু উত্তরা থেকে মতিঝিল—এই একটি মাত্র রুটে মেট্রোরেল এই বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে পারছে না। ট্যাক্সিক্যাব শহর থেকে বিলুপ্ত, রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়াও আকাশচুম্বী। এই পরিস্থিতিতে একটি আধুনিক বাস নেটওয়ার্কই পারত মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-র সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (STP) অনুযায়ী, ঢাকার মানুষের যাতায়াতের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয় গণপরিবহনে, যার মধ্যে ৬৪ শতাংশই বাসের ওপর নির্ভরশীল। পরিকল্পনা বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন চালু হলেও, শহরের মোট যাতায়াতের অন্তত ৫৭ শতাংশই বাস-মিনিবাসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। অর্থাৎ, বাস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া ঢাকার যানজট ও যাত্রী ভোগান্তি দূর করা অসম্ভব।
’লক্কড়ঝক্কড়’ ঢাকা এবং রুট পারমিটের গোলকধাঁধা
বর্তমানে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস। বিআরটিএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা প্রায় ৫৪ হাজার, যার মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ১৬ হাজার ১৯৮টি বাস সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ (২০ বছরের বেশি পুরোনো)।
শুধু বাসের বয়সই নয়, রুট পারমিট ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী:
- ঢাকার ১২৮টি রুটে ৭ হাজার ৯১টি বাস নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে সড়কে চলে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার বাস।
- অনুমোদিত রুটে চলে মাত্র ৩,৪২৭টি বাস। বাকি ২,০১৮টি বাস তাদের নির্ধারিত রুট তোয়াক্কা না করে অন্য লাভজনক রুটে চলে।
- ১,৬৪৬টি বাসের কোনো বৈধ রুট পারমিটই নেই। তারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সড়কে রাজত্ব করছে।
বিআরটিএর অনুমোদিত ৩৮৮টি রুটের মধ্যে ২৫০টিরও বেশি রুট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, যা পুরো পরিবহন খাতের সমন্বয়হীনতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: বৈজ্ঞানিক ফ্র্যাঞ্চাইজিই একমাত্র পথ
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জোড়াতালি দিয়ে বা কেবল কাগজের কলমে রুট পারমিট দিয়ে ঢাকার গণপরিবহন ঠিক করা যাবে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে বাসের রুট পারমিট দেওয়ার বর্তমান পদ্ধতিটি একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। ব্যক্তিমালিকানার ভিত্তিতে বা বিচ্ছিন্ন কোম্পানির আবেদনের ওপর ভিত্তি করে রুট দিলে বাসের মান কখনো ধরে রাখা যায় না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কয়েক বছর আগে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে বাস রুট রেশনালাইজেশনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক তদারকির অভাবে টেকেনি। ঢাকার গণপরিবহনকে বাঁচাতে হলে রুট অব্যবস্থাপনা আগে দূর করতে হবে। অল্প কিছু শক্তিশালী কোম্পানির অধীনে পুরো শহরের বাস রুটগুলোকে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে হবে। সরকার যদি ইলেকট্রিক বাস আনতেই চায়, তবে চার্জিং স্টেশন অবকাঠামো এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল আগে নিশ্চিত করতে হবে।”
ঢাকার রাস্তায় এসি বাসের খরা কাটবে কি না, কিংবা নতুন ইলেকট্রিক বাসের পরিকল্পনা শুধু ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে কি না—তা সময়ই বলে দেবে। তবে প্রতিদিনের নরকযন্ত্রণা থেকে বাঁচতে ঢাকার কোটি মানুষের এখন একটাই দাবি: সড়কে শৃঙ্খলা এবং একটি সভ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









