ঢাকা, ৯ জুন ২০২৬: পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসলামের একটি চিঠি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে, যেখানে তাঁকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার জন্য অভিনন্দন জানানো হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি শোরগোল তৈরি হয়েছে চিঠির ধরন এবং এর ভেতরের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী স্থানীয় নেতার এই চিঠির নেপথ্যে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ বেশি কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিঠিতে কী বলা হয়েছে?
ভাইরাল হওয়া চিঠিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এটি গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে মিরাজুল ইসলাম গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘প্রাণঢালা অভিনন্দন’ জানান।
তিনি বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ‘৩১ দফা’, নির্বাচনি ইশতেহার এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, এসব স্লোগানে দেশের মানুষের মনের কথা ফুটে উঠেছে এবং গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রাজনৈতিক প্যাড নয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্যাড
এই চিঠির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, মিরাজুল ইসলাম এটি তাঁর দলীয় পরিচয় বা কোনো রাজনৈতিক প্যাডে লেখেননি। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে তাঁর নিজস্ব মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড’-এর অফিসিয়াল প্যাড ব্যবহার করে, যেখানে তিনি নিজেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রশংসাসূচক চিঠির মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে পিরোজপুর জেলায় এই প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু বড় ঠিকাদারি প্রকল্প চলমান রয়েছে। চিঠির শেষ অংশে মিরাজুল ইসলাম সেই প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার জন্য সময়সীমা আরও এক বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
স্থানীয় রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নানা আইনি ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভাণ্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এই চিঠির বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন বিষয়টিকে তাঁর ‘রাজনৈতিক ভোলবদল’ হিসেবে দেখছেন অনেকে, অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন এটি কেবলই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই মো. মিরাজুল ইসলাম আত্মগোপনে চলে যান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। চিঠির সত্যতা বা এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুর বদলানোর ঘটনা নতুন নয়। তবে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতার পক্ষ থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে ঠিকাদারি কাজ বাড়ানোর আবেদন—বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









