সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি সরকারের প্রশাসনে এক অভাবনীয় টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ঘিরে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার জের ধরে শেষ পর্যন্ত সরকারকে পিছু হটতে হয়েছে। কিন্তু কেন এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং কেনই–বা এক সপ্তাহের মাথায় তা প্রত্যাহার করতে হলো—তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।
সিদ্ধান্তের পটভূমি ও অসন্তোষ
চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় একটি প্রস্তাব পাঠায়। ওই প্রস্তাবে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসিক ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি একই দিনে কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়িঋণ বন্ধ করা এবং স্কলারশিপ পাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রেষণের বদলে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এ বিষয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’ রয়েছে। কিন্তু সরকারের এই পদক্ষেপে আমলাতন্ত্রের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দিনে এমন একাধিক স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চিঠি পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতি না মানায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
বর্তমানে বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের প্রায় ৭ হাজার ২০০ কর্মকর্তা এই সুবিধা উপভোগ করছেন। ফলে কোনো ধরনের পূর্ব-আলোচনা বা অংশীজনদের সাথে মতামত ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে প্রশাসনে চরম ‘সমন্বয়হীনতা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পিছু হটা ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
প্রশাসনের অভ্যন্তরে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ১৬ জুলাই, অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন চিঠি দিয়ে পূর্বের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। জানানো হয়, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পূর্বের ন্যায় ৫০ হাজার টাকাই বহাল থাকবে।
এদিকে বিতর্কিত ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, কেবল মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তাকে বদলি করাই কি যথেষ্ট, নাকি এর পেছনে থাকা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন?
এদিকে সুশাসন সংক্রান্ত সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সরকারের এই পিছু হটাকে ‘আমলাতন্ত্রের অন্যায্য প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার’ বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার সরকারের অসহায়ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
ভবিষ্যতের ভাবনা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ নিরসনে এবং নতুন পথ খুঁজতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে যানবাহন ব্যবস্থাপনার দুটি বিকল্প রূপরেখা পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, কর্মকর্তাদের গাড়ি, জ্বালানি ও চালক সুবিধা সরাসরি সরকারের পক্ষে দেওয়া হলে বার্ষিক খরচ কেমন হবে; এবং দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান ঋণের ব্যবস্থা চালু রাখলে কোনটি বেশি সাশ্রয়ী হবে—তা মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই আমলাদের নিজস্ব গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ভাতা দেওয়ার নিয়ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই নীতির ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 





















