২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে দেশ পেল নতুন রাষ্ট্রপ্রধান। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
সিইসি জানান, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ৩৪৩টি ব্যালট পেপার ব্যবহার হয়েছে, অব্যবহৃত থেকে গেছে ছয়টি। ব্যবহৃত সবকটি ব্যালটই বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ঝুলিতে জমা পড়েছে ৮৮ ভোট। অর্থাৎ ১৭৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন মির্জা ফখরুল। ভোটগ্রহণ চলাকালে চারটি ব্যালট পেপার ভুলবশত নষ্ট হওয়ায় ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালার দশম বিধি অনুসরণ করে সেগুলো পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।
নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয় দুপুর ২টায়, শেষ হয় বিকাল ৫টায়। শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অধিবেশন কক্ষের পরিবেশ পবিত্রতা পায়। এরপর সিইসি নাসির উদ্দিন দুই প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন এবং সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন ভোট পরিচালনার নিয়মকানুন। এরপর নির্বাচনি সহায়ক কর্মকর্তারা একে একে সংসদ সদস্যদের আসনে গিয়ে পৌঁছে দেন ব্যালট পেপার। প্রত্যেক সদস্য নিজ আসনে বসেই পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে জানিয়ে দেন নিজের পছন্দ।
সবার আগে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তাঁর পরে একে একে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেই সঙ্গে অন্য সংসদ সদস্যরাও। ভোট দিতে ভোলেননি খোদ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও।
যদিও ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যেরই ভোট দেওয়ার কথা ছিল, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ভোটে অংশ নিতে পারেননি বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস। অন্যদিকে সংসদ সদস্য না হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদেরও ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলা এড়াতে নেওয়া হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থা। কক্ষে রাখা হয় তিনটি ব্যালট বাক্স, আর সংসদ সদস্যদের ধাপে ধাপে ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হয় যাতে ভিড় না লাগে। প্রতিটি ব্যালট পেপারে ছাপা ছিল দুই প্রার্থীর নাম। ভোট দেওয়ার পর নির্ধারিত জায়গায় স্বাক্ষর করে সদস্যরা তা জমা দেন বাক্সে। পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন নিজে, সহযোগিতায় ছিলেন নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ভোটগ্রহণের প্রথম বিশ মিনিট সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়।
বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই খোলা হয় ব্যালট বাক্স। সবার সামনে প্রকাশ্যে গোনা হয় ভোট, তারপর ঘোষণা করা হয় চূড়ান্ত ফলাফল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সবশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনগুলোতে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটের প্রয়োজনই পড়েনি। ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেখল দেশ।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় মোটামুটি প্রত্যাশিতই ছিল রাজনৈতিক মহলে। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান কতটা হয়, তা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ১৭৭ ভোটের বড় ব্যবধানই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই গণমাধ্যমের সামনে আসেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামীকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন। শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বলেও জানা গেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই জয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করল। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে পরিচিত এই নেতা এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের দায়িত্ব পালনের অধ্যায়ও।
৩৫ বছরের বিরতির পর অনুষ্ঠিত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপ্রধান বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াই নয়, বরং দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গণতান্ত্রিক চর্চার এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















