ছয় মাস না যেতেই কেন লংমার্চে নামলো বিরোধী জোট?

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে লংমার্চ ও একের পর এক পথসভা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট। কর্মসূচি এখানেই থেমে থাকছে না—আগামী দুই মাসে আরও তিনটি বিভাগীয় শহরে একই ধরনের লংমার্চ ও পথসভা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে জোট, আর সব কর্মসূচির শেষে নভেম্বরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ। এই ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মাথায় সরকারকে কি বড় ধরনের আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চাইছে বিরোধী জোট?

গত ৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু হয় এই লংমার্চের। পথের বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে জোটের নেতারা তুলে ধরেন ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান। তবে কর্মসূচির প্রথম দিনেই এমন মন্তব্য উঠে আসে যে, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে কিংবা দাবি পূরণ না হলে সরকার পতনের একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। কর্মসূচি শুরুর দিনে ঢাকায় আয়োজিত সমাবেশে জোটের অন্যতম শরিক দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে “ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে”। অন্যদিকে কর্মসূচির সমাপনী পর্ব হয় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে, যেখানে এগার দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারকে সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের এই আন্দোলন “ঈদের পরের আন্দোলন হবে না”।

এই কর্মসূচি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আসে। কর্মসূচি শুরুর আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন, “জনগণকে বিভ্রান্ত করে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।” জামায়াত-এনসিপির কর্মসূচির দিনই ঢাকায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “আমরা খেয়াল করছি কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, অবশ্যই দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে কীভাবে অরাজকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।” পরদিন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদও বিরোধী দলের এই কর্মসূচির সমালোচনা করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।”

সরকারের এই সমালোচনা বা সন্দেহের নেপথ্যে মূলত দুটি বিষয় সামনে আসছে। প্রথমত, বর্তমান সরকার মাত্র ছয় মাস পার করেছে—এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন বড় ধরনের আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখছে না ক্ষমতাসীন দল। দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচি ঘিরে সম্ভাব্য “অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্য” থাকার দাবি করছে সরকার। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন বলেন, “জামায়াতের এই লং মার্চকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ এক ধরনের সুযোগ নিতে চেয়েছিল যে, এই লং মার্চের মধ্যে ঢুকে তারা এক ধরনের অঘটন ঘটাবে। এখানে সরকারের কাছে তথ্য ছিল। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যাতে করে সরকার পতন কিংবা সরকারকে দায় চাপানোর রাজনীতি কেউ করতে না পারে।” তাঁর মতে, গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার “প্রতারণা করে গেছে”, তবে এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের ষোলো বছরের যে ‘অব্যবস্থাপনা’, তার দায় বিএনপির নয়। কিন্তু জামায়াত সেই দায় “বিএনপির ওপর চাপিয়ে চাপিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি করছে” বলেও মনে করেন তিনি।

লংমার্চে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট থেকে মূলত ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের সংকট নিরসন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। তবে সরকারের ছয় মাস পার হতে না হতেই এসব দাবিকে সামনে রেখে এত বড় কর্মসূচিকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতের কর্মসূচি থেকে এটাও স্পষ্ট যে, তারা এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে রাজপথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার পথ তৈরি করতে চাইছে। জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী লংমার্চ হবে ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে আগামী ১৯শে সেপ্টেম্বর, এরপর খুলনায় ১০ই অক্টোবর এবং ২৪শে অক্টোবর সিলেটে। চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ শেষে নভেম্বরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ, যেখান থেকে আসবে পরবর্তী কর্মসূচি বা ঘোষণা।

কিন্তু ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় কেন এমন ধারাবাহিক কর্মসূচিতে গেল এগার দলীয় জোট? এ প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “সরকার একেবারে প্রথম দিনেই গণভোটের রায়কে অস্বীকার করেছে। যেকোনো একটা সরকারের কিছু সময় যাওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলো আসে। কিন্তু এই সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন না। তারা একেবারে শুরুর দিনেই যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল যে, গণভোটের গণরায়কে তারা বাস্তবায়ন করবে—এটাকে তারা অস্বীকার করেছে।” তাঁর মতে, পরিস্থিতিই তাদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একই রকম মত দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে দুটো ম্যান্ডেটরি টাইম ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন যেদিন শুরু হবে, তার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে। আপনি ডাকেননি। ছয় মাসের মধ্যে জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন করে সংবিধানে তফসিল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সেপ্টেম্বরেই সেই ছয় মাসও শেষ হয়ে যাচ্ছে।” মি. পরওয়ার মনে করেন, সরকার গণভোটের রায় কিংবা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করছে না, বরং ‘ইচ্ছেমতো চলার’ প্রবণতা তৈরি হয়েছে—আইন পাস থেকে শুরু করে প্রায় সবখানেই যা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আপনি যা ইচ্ছা তা-ই করে যাবেন, এ জন্য তো লোকেরা তাঁদের ভোট দেয়নি। আর আপনি যদি ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে মেজরিটি হন, তাহলে গণভোটে তো প্রায় ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে পড়েছে। সেটা মানবেন না?” আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, “এখন বলা হচ্ছে, মাত্র ছয় মাস হলো, এখন এমন কী হয়েছে! কিন্তু এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে যে গণ-আকাঙ্ক্ষা, আপনি তাকে অস্বীকার করে যাচ্ছেন! এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?”

তবে বিরোধী দলের পক্ষে সত্যিকার অর্থে ‘বড়’ কোনো আন্দোলন সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এখানে ঘুরেফিরে কয়েকটি কারণ সামনে আসছে। একটি হলো, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ‘দুর্বল ভূমিকা’—মূলত নবীন ও অনভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই দল সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখে আলোচিত হয়েছে, এমন উদাহরণ সেভাবে নেই। আরেকটি কারণ, এগার দলের আন্দোলনের সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কোনো সুবিধা নেবে কি না, সেই প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “জামায়াতের একটা ইমেজ তৈরি হয়ে গেছে যে, তারা দুর্বল বিরোধী দল। এখন তাদের পক্ষে সবল আন্দোলন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন তো আছেই। এ ছাড়া জামায়াতের জন্য একটা উভয় সংকট আছে, বিপদও আছে। সেটা হলো, তারা বিএনপির সঙ্গে এমন কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইবে না, যাতে নির্বাচনের পর তাদের যে অর্জন হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটা হলো, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সুবিধা হয়—এমন কোনো কাজ তারা করবে না।” তাঁর মতে, সংসদে বা এর বাইরে জামায়াতের “শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো ইমেজ তৈরি হয়নি”, ফলে দলটির লক্ষ্য থাকবে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই শক্তিশালী ইমেজ তৈরি করা কিংবা সরকারকে সেই বার্তা দেওয়া। তবে তিনি যোগ করেন, “খুব বড় ধরনের কোনো আন্দোলন হবে বা সরকার পতনের দিকে যাবে, সেরকমটা আমার মনে হয় না।”

তবে দুর্বল বিরোধী দলের এই ইমেজের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “আমি এটার তীব্র আপত্তি করি যে বিরোধী দল দুর্বল। তো এখন সবলতা দেখাতে গেলে প্রতিদিন পাঁচটা করে গাড়িতে আগুন দিলে সবাই বলবে যে, বিরোধী দল খুব মজবুত। আমরা তো এই ন্যারেটিভ দেশে তৈরি করতে চাই না। এটা একটা ব্যাড কালচার, ব্যাড প্র্যাকটিস।” তাঁর ভাষায়, তারা ‘নিয়মতান্ত্রিক’ পথেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, আর এটাকে দুর্বলতা বলার কোনো সুযোগ নেই।

আবার এটাও স্পষ্ট যে, রাজপথে জোরালো আন্দোলন করতে গিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে কি না, সে বিষয়ে জামায়াতের ভেতরেই একধরনের সতর্কতা, এমনকি দ্বিধাও কাজ করছে। ফলে সরকারি দলের নেতারা বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে যাওয়া বলে আখ্যা দিলেও, জামায়াতসহ এগার দল বলছে, সরকার পতন তাদের লক্ষ্য নয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের কাছে বারবার বলেছি যে, আমরা যে লংমার্চে গিয়েছি, আন্দোলনগুলো করছি, এগুলো কিন্তু এখনো সরকার পতনের আন্দোলন না। আমরা এখানে সরকার যেন জনগণের কথাগুলো বাস্তবায়ন করে, ভুল পথে না যায়, সে জন্য তাদের রিমাইন্ডার দিচ্ছি।” জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একই মত জানিয়ে বলেন, “আমরা সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ফেলব—অনেকে ভুল ব্যাখ্যা থেকে এমনটা মনে করতে পারেন। একের পর এক কর্মসূচি দেওয়ার মানে কি এই যে শেষে গিয়ে সব নামিয়ে দেওয়া হবে? না, আমরা যে দাবি করছি, সেটা মানতে হবে—আমরা এটাই বলছি।” তবে সরকার দাবি মেনে না নিলে কী হবে, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে মি. পরওয়ার বলেন, “আমরা জনগণের দাবি পূরণের পথ তৈরি করছি। এখন এই পথ, এই দাবি, এই আওয়াজ যদি কারও কানে না যায়, তাহলে এরপর কী হবে, সেটা পরেই বলা যাবে।”

সব মিলিয়ে ছয় মাসের নবীন সরকারের সামনে ধারাবাহিক লংমার্চ, পথসভা আর আসন্ন মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট। তবে এই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে, নাকি কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়েই থেকে যাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেই।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সিঙ্গেল-ডেকার থেকে স্লিপার রূপান্তর, ৪১ বাসের নিবন্ধন স্থগিত

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ছয় মাস না যেতেই কেন লংমার্চে নামলো বিরোধী জোট?

আপডেট সময় ০৬:৩৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে লংমার্চ ও একের পর এক পথসভা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট। কর্মসূচি এখানেই থেমে থাকছে না—আগামী দুই মাসে আরও তিনটি বিভাগীয় শহরে একই ধরনের লংমার্চ ও পথসভা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে জোট, আর সব কর্মসূচির শেষে নভেম্বরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ। এই ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মাথায় সরকারকে কি বড় ধরনের আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চাইছে বিরোধী জোট?

গত ৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু হয় এই লংমার্চের। পথের বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে জোটের নেতারা তুলে ধরেন ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান। তবে কর্মসূচির প্রথম দিনেই এমন মন্তব্য উঠে আসে যে, লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে কিংবা দাবি পূরণ না হলে সরকার পতনের একদফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। কর্মসূচি শুরুর দিনে ঢাকায় আয়োজিত সমাবেশে জোটের অন্যতম শরিক দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে “ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে”। অন্যদিকে কর্মসূচির সমাপনী পর্ব হয় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে, যেখানে এগার দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারকে সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের এই আন্দোলন “ঈদের পরের আন্দোলন হবে না”।

এই কর্মসূচি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আসে। কর্মসূচি শুরুর আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন, “জনগণকে বিভ্রান্ত করে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।” জামায়াত-এনসিপির কর্মসূচির দিনই ঢাকায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “আমরা খেয়াল করছি কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, অবশ্যই দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে কীভাবে অরাজকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।” পরদিন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদও বিরোধী দলের এই কর্মসূচির সমালোচনা করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।”

সরকারের এই সমালোচনা বা সন্দেহের নেপথ্যে মূলত দুটি বিষয় সামনে আসছে। প্রথমত, বর্তমান সরকার মাত্র ছয় মাস পার করেছে—এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন বড় ধরনের আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখছে না ক্ষমতাসীন দল। দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচি ঘিরে সম্ভাব্য “অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্য” থাকার দাবি করছে সরকার। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন বলেন, “জামায়াতের এই লং মার্চকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ এক ধরনের সুযোগ নিতে চেয়েছিল যে, এই লং মার্চের মধ্যে ঢুকে তারা এক ধরনের অঘটন ঘটাবে। এখানে সরকারের কাছে তথ্য ছিল। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যাতে করে সরকার পতন কিংবা সরকারকে দায় চাপানোর রাজনীতি কেউ করতে না পারে।” তাঁর মতে, গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার “প্রতারণা করে গেছে”, তবে এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের ষোলো বছরের যে ‘অব্যবস্থাপনা’, তার দায় বিএনপির নয়। কিন্তু জামায়াত সেই দায় “বিএনপির ওপর চাপিয়ে চাপিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি করছে” বলেও মনে করেন তিনি।

লংমার্চে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট থেকে মূলত ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের সংকট নিরসন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। তবে সরকারের ছয় মাস পার হতে না হতেই এসব দাবিকে সামনে রেখে এত বড় কর্মসূচিকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতের কর্মসূচি থেকে এটাও স্পষ্ট যে, তারা এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে রাজপথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার পথ তৈরি করতে চাইছে। জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী লংমার্চ হবে ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে আগামী ১৯শে সেপ্টেম্বর, এরপর খুলনায় ১০ই অক্টোবর এবং ২৪শে অক্টোবর সিলেটে। চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ শেষে নভেম্বরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ, যেখান থেকে আসবে পরবর্তী কর্মসূচি বা ঘোষণা।

কিন্তু ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় কেন এমন ধারাবাহিক কর্মসূচিতে গেল এগার দলীয় জোট? এ প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “সরকার একেবারে প্রথম দিনেই গণভোটের রায়কে অস্বীকার করেছে। যেকোনো একটা সরকারের কিছু সময় যাওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলো আসে। কিন্তু এই সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন না। তারা একেবারে শুরুর দিনেই যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল যে, গণভোটের গণরায়কে তারা বাস্তবায়ন করবে—এটাকে তারা অস্বীকার করেছে।” তাঁর মতে, পরিস্থিতিই তাদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একই রকম মত দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে দুটো ম্যান্ডেটরি টাইম ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন যেদিন শুরু হবে, তার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে। আপনি ডাকেননি। ছয় মাসের মধ্যে জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন করে সংবিধানে তফসিল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সেপ্টেম্বরেই সেই ছয় মাসও শেষ হয়ে যাচ্ছে।” মি. পরওয়ার মনে করেন, সরকার গণভোটের রায় কিংবা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করছে না, বরং ‘ইচ্ছেমতো চলার’ প্রবণতা তৈরি হয়েছে—আইন পাস থেকে শুরু করে প্রায় সবখানেই যা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আপনি যা ইচ্ছা তা-ই করে যাবেন, এ জন্য তো লোকেরা তাঁদের ভোট দেয়নি। আর আপনি যদি ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে মেজরিটি হন, তাহলে গণভোটে তো প্রায় ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে পড়েছে। সেটা মানবেন না?” আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, “এখন বলা হচ্ছে, মাত্র ছয় মাস হলো, এখন এমন কী হয়েছে! কিন্তু এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে যে গণ-আকাঙ্ক্ষা, আপনি তাকে অস্বীকার করে যাচ্ছেন! এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?”

তবে বিরোধী দলের পক্ষে সত্যিকার অর্থে ‘বড়’ কোনো আন্দোলন সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এখানে ঘুরেফিরে কয়েকটি কারণ সামনে আসছে। একটি হলো, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ‘দুর্বল ভূমিকা’—মূলত নবীন ও অনভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই দল সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রেখে আলোচিত হয়েছে, এমন উদাহরণ সেভাবে নেই। আরেকটি কারণ, এগার দলের আন্দোলনের সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কোনো সুবিধা নেবে কি না, সেই প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “জামায়াতের একটা ইমেজ তৈরি হয়ে গেছে যে, তারা দুর্বল বিরোধী দল। এখন তাদের পক্ষে সবল আন্দোলন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন তো আছেই। এ ছাড়া জামায়াতের জন্য একটা উভয় সংকট আছে, বিপদও আছে। সেটা হলো, তারা বিএনপির সঙ্গে এমন কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইবে না, যাতে নির্বাচনের পর তাদের যে অর্জন হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটা হলো, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সুবিধা হয়—এমন কোনো কাজ তারা করবে না।” তাঁর মতে, সংসদে বা এর বাইরে জামায়াতের “শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো ইমেজ তৈরি হয়নি”, ফলে দলটির লক্ষ্য থাকবে আন্দোলনের মাধ্যমে সেই শক্তিশালী ইমেজ তৈরি করা কিংবা সরকারকে সেই বার্তা দেওয়া। তবে তিনি যোগ করেন, “খুব বড় ধরনের কোনো আন্দোলন হবে বা সরকার পতনের দিকে যাবে, সেরকমটা আমার মনে হয় না।”

তবে দুর্বল বিরোধী দলের এই ইমেজের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “আমি এটার তীব্র আপত্তি করি যে বিরোধী দল দুর্বল। তো এখন সবলতা দেখাতে গেলে প্রতিদিন পাঁচটা করে গাড়িতে আগুন দিলে সবাই বলবে যে, বিরোধী দল খুব মজবুত। আমরা তো এই ন্যারেটিভ দেশে তৈরি করতে চাই না। এটা একটা ব্যাড কালচার, ব্যাড প্র্যাকটিস।” তাঁর ভাষায়, তারা ‘নিয়মতান্ত্রিক’ পথেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, আর এটাকে দুর্বলতা বলার কোনো সুযোগ নেই।

আবার এটাও স্পষ্ট যে, রাজপথে জোরালো আন্দোলন করতে গিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে কি না, সে বিষয়ে জামায়াতের ভেতরেই একধরনের সতর্কতা, এমনকি দ্বিধাও কাজ করছে। ফলে সরকারি দলের নেতারা বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে যাওয়া বলে আখ্যা দিলেও, জামায়াতসহ এগার দল বলছে, সরকার পতন তাদের লক্ষ্য নয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের কাছে বারবার বলেছি যে, আমরা যে লংমার্চে গিয়েছি, আন্দোলনগুলো করছি, এগুলো কিন্তু এখনো সরকার পতনের আন্দোলন না। আমরা এখানে সরকার যেন জনগণের কথাগুলো বাস্তবায়ন করে, ভুল পথে না যায়, সে জন্য তাদের রিমাইন্ডার দিচ্ছি।” জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একই মত জানিয়ে বলেন, “আমরা সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ফেলব—অনেকে ভুল ব্যাখ্যা থেকে এমনটা মনে করতে পারেন। একের পর এক কর্মসূচি দেওয়ার মানে কি এই যে শেষে গিয়ে সব নামিয়ে দেওয়া হবে? না, আমরা যে দাবি করছি, সেটা মানতে হবে—আমরা এটাই বলছি।” তবে সরকার দাবি মেনে না নিলে কী হবে, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে মি. পরওয়ার বলেন, “আমরা জনগণের দাবি পূরণের পথ তৈরি করছি। এখন এই পথ, এই দাবি, এই আওয়াজ যদি কারও কানে না যায়, তাহলে এরপর কী হবে, সেটা পরেই বলা যাবে।”

সব মিলিয়ে ছয় মাসের নবীন সরকারের সামনে ধারাবাহিক লংমার্চ, পথসভা আর আসন্ন মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন এগার দলীয় জোট। তবে এই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে, নাকি কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়েই থেকে যাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেই।

Share this news as a Photo Card