ঢাকার সড়কে ‘এআই জাদু’: সিগন্যাল অমান্য করলেই ডিজিটাল মামলা
রাত নয়টা। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত কারওয়ান বাজার মোড়। যে মোড়ে কদিন আগেও গাড়ি থামাতে ট্রাফিক পুলিশকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হতো, সেখানে এখন দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সিগন্যালে লালবাতি জ্বলে উঠতেই সুশৃঙ্খলভাবে থমকে যায় সব যানবাহন। চালকেরা নিখুঁতভাবে গাড়ি থামালেন ‘স্টপ লাইনের’ ভেতরে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এই জাদুকরী পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তি। ট্রাফিক আইন মানাতে রাজধানীর সড়কগুলোতে এখন পাহারা দিচ্ছে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা।
পরীক্ষামূলক যাত্রা ও ৫০০ ক্যামেরার পরিকল্পনা
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ গত ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার ৩০টি মোড়ে এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আগের ৮০টি ক্যামেরাসহ মোট ১১০টি ক্যামেরাকে এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, এই উদ্যোগ এখানেই থামছে না। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব সিগন্যাল বাতির খুঁটিতে মোট ৫০০টি এআই ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে মহাখালী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় নতুন ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।
যেভাবে কাজ করছে ‘পিটিজেড’ ক্যামেরা
আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ি শনাক্ত করতে পুলিশ ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক ‘পিটিজেড’ (প্যান-টিল্ট-জুম) ক্যামেরা। ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম এই ক্যামেরাগুলো অনেক দূর থেকেও নিখুঁতভাবে গাড়ির নম্বর প্লেট ও ছবি তুলতে পারে।
এই ক্যামেরাগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভার। ফলে কোনো গাড়ি আইন অমান্য করলেই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ছবি ও ভিডিও ডিএমপি সদর দপ্তরের সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়। মুহূর্তেই বিআরটিএ-র তথ্যভাণ্ডার থেকে মালিকের নাম-ঠিকানা শনাক্ত করে ডিজিটাল মাধ্যমে মামলা চলে যাচ্ছে চালকের কাছে।
গত ১৩ দিনে সার্ভারে জমা হওয়া প্রায় ১২ হাজার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে ৫৪৮টি ডিজিটাল মামলা দায়ের করা হয়েছে।
“আগে গাড়ি থামাতে আমাদের যুদ্ধ করতে হতো। এখন লাল বাতি জ্বলে উঠলেই চালকেরা নিজে থেকেই থেমে যাচ্ছেন। শান্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারছি।” — ছোটন বড়ুয়া, ট্রাফিক পুলিশ সদস্য।
যেসব অপরাধে শাস্তি
প্রাথমিকভাবে ছয় ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ওপর কড়া নজর রাখছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এর মধ্যে রয়েছে:
-
উল্টো পথে গাড়ি চালানো
-
সিগন্যাল অমান্য করা
-
জেব্রা ক্রসিং ও স্টপ লাইন না মানা
-
বাম লেন বন্ধ করে রাখা
-
যত্রতত্র লেন পরিবর্তন ও অবৈধ পার্কিং
ডিএমপি ট্রাফিকের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, সিট বেল্ট না বাঁধা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট না থাকার মতো অপরাধগুলোও এই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠোরভাবে নজরদারি করা হবে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ডিএমপির এই আধুনিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ চালক ও যাত্রীরা। তবে চালকদের একাংশের মনে কিছু সংশয়ও রয়েছে। মাইক্রোবাস চালক মো. মহিউদ্দিন বলেন, “উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ভালো। তবে অনেক সময় সিগন্যালে লালবাতি জ্বললেও ট্রাফিক পুলিশ হাত উঁচিয়ে গাড়ি যাওয়ার ইশারা করেন। তখন চললে ক্যামেরা মামলা দেবে কি না, তা নিয়ে আমরা কিছুটা দ্বিধায় আছি।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতার মতো ছোটখাটো কিছু জটিলতা দূর করা গেলে এই ‘এআই চোখ’ ঢাকার বিশৃঙ্খল সড়ককে চিরতরে বদলে দিতে পারে।
এস কে চন্দন 





















