দুই বছর পর জুলাই: প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও আন্দোলনের স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান এখনও স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যসংগঠক সামিনা লুৎফা মনে করেন, জুলাই ছিল কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অধিকারের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই সম্ভাবনার বড় অংশই রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ, দমন-পীড়ন, গুম, বিচারহীনতা, বাক্‌স্বাধীনতার সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় জনগণের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আবু সাঈদ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, মুগ্ধ, রিয়া, নাইমসহ অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামার সাহস জুগিয়েছিল। আন্দোলনের দিনগুলোতে শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এক অভূতপূর্ব সংহতির পরিচয় দেন।
তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় বলে উল্লেখ করেন সামিনা লুৎফা। তাঁর মতে, ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের পরিবর্তে শুরু হয় আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতা। এই সুযোগে উগ্র ডানপন্থার উত্থান ঘটে এবং বিভিন্ন স্থানে মাজার, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নারী ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার মতো ঘটনা সামনে আসে। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনেও ‘মব’ সংস্কৃতি, সাইবার হয়রানি এবং মতপ্রকাশের সংকীর্ণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক শক্তিও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক সমঝোতা, ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য আড়ালে পড়ে যায়। এতে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়নও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
লেখকের মতে, জুলাইকে কেবল একটি শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমে যায়। বরং এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের একটি বিরল সুযোগ। কিন্তু শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির অভাবে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সামিনা লুৎফার বিশ্বাস, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ ও সামাজিক বিভাজন মোকাবিলায় দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক ঐক্য, সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম শর্ত। তাঁর ভাষায়, ইতিহাসকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না; জনগণের সম্মিলিত স্মৃতিতে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, স্বপ্ন ও অপূর্ণতার হিসাব সব সময়ই জীবন্ত থাকবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

শিশুদের সঠিক গড়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

২৮ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

দুই বছর পর জুলাই: প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

আপডেট সময় ০৩:৫৯:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও আন্দোলনের স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান এখনও স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যসংগঠক সামিনা লুৎফা মনে করেন, জুলাই ছিল কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অধিকারের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই সম্ভাবনার বড় অংশই রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ, দমন-পীড়ন, গুম, বিচারহীনতা, বাক্‌স্বাধীনতার সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় জনগণের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আবু সাঈদ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, মুগ্ধ, রিয়া, নাইমসহ অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামার সাহস জুগিয়েছিল। আন্দোলনের দিনগুলোতে শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এক অভূতপূর্ব সংহতির পরিচয় দেন।
তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় বলে উল্লেখ করেন সামিনা লুৎফা। তাঁর মতে, ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের পরিবর্তে শুরু হয় আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতা। এই সুযোগে উগ্র ডানপন্থার উত্থান ঘটে এবং বিভিন্ন স্থানে মাজার, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নারী ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার মতো ঘটনা সামনে আসে। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনেও ‘মব’ সংস্কৃতি, সাইবার হয়রানি এবং মতপ্রকাশের সংকীর্ণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক শক্তিও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক সমঝোতা, ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য আড়ালে পড়ে যায়। এতে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়নও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
লেখকের মতে, জুলাইকে কেবল একটি শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমে যায়। বরং এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের একটি বিরল সুযোগ। কিন্তু শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির অভাবে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সামিনা লুৎফার বিশ্বাস, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদ ও সামাজিক বিভাজন মোকাবিলায় দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক ঐক্য, সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম শর্ত। তাঁর ভাষায়, ইতিহাসকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না; জনগণের সম্মিলিত স্মৃতিতে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, স্বপ্ন ও অপূর্ণতার হিসাব সব সময়ই জীবন্ত থাকবে।

Share this news as a Photo Card