এলডিসি উত্তরণ পেছানো: ইকোসকের সবুজ সংকেত, জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বিশেষ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক বৈশ্বিক মহামারি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার কারণে এই অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের বর্তমান পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইকোসকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের ফলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উঠছে। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের ২৪ নভেম্বরের আগেই সাধারণ পরিষদ এ বিষয়ে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
কেন এই বাড়তি সময়ের আবেদন?
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের কাছাকাছি সময় ধরে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা, সহজ শর্তে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ছাড় পেয়ে আসছে ঢাকা।
জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী, কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য কি না তা নির্ধারণে মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচক বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ এবং ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় তা পিছিয়ে ২০২৬ সাল করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও প্রস্তুতি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। বৈশ্বিক কারণগুলোর মধ্যে মহামারি পরবর্তী ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যে অস্থিরতা, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটপরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে বাড়তি সময় চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া
ইকোসকের বৈঠকে বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী। তিনি বলেন, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতির জন্য এই অতিরিক্ত সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইকোসকের সিদ্ধান্তের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, সাধারণ পরিষদ যদি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, তবে তা বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এবং এলডিসি-উত্তর সময়ের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।
এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) দুটি দেশের আবেদন পর্যালোচনার পর ইতিবাচক মতামত দিয়ে ইকোসকে সুপারিশ পাঠিয়েছিল।
অতীত দৃষ্টান্ত ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
সংকট কিংবা বিশেষ বাস্তবতার কারণে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটিই প্রথম নয়। এর আগে গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সলোমন দ্বীপপুঞ্জ আবেদন করে অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেয়েছিল। এছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির কারণে নেপালের এলডিসি উত্তরণও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইকোসকের এই সুপারিশ চূড়ান্তভাবে পাস করলে বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত আগের মতো শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করতে পারবে। ফলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতগুলো বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বাড়তি সময় পাবে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 


























