শিরোনাম :
তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ মন্ত্রিসভায় নতুন চার মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা, চলছে আলোচনা ৮০ টাকার নিচে সবজি নেই, দেশি মাছের দাম আকাশছোঁয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন উদ্যোগ চট্টগ্রামে শিপইয়ার্ডে গ্যাস দুর্ঘটনায় নিহত সাত শ্রমিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ: ৫৫ বছরে ১৮ জন, নতুন মুখের অপেক্ষা গ্যাস সংকট: ক্ষমা চেয়ে ব্যবসায়ীদের ‘মোরাল সাপোর্ট’ চাইলেন জ্বালানিমন্ত্রী ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেনও হবে বাংলা কিউআরে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ফখরুল, এলজিআরডিতে সালাহউদ্দিন, স্বরাষ্ট্রে এ্যানি গ্যাস সংকট: তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় রচিত হতে চলেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে গত কয়েক দিন ধরে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান এখনো ভারতে কোনো সফরে যাননি। এই প্রথমবারের মতো তাকে ঘিরে যে সফর-আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু দুই সরকারপ্রধানের একটি সাক্ষাতের বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় প্রতিবেশীর সম্পর্ক নতুন কোন খাতে বইবে, সেই প্রশ্নেরও একটি ইঙ্গিত বহন করছে এই সফর-সম্ভাবনা।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার—এখনো পর্যন্ত এই সফর চূড়ান্ত নয়। ঢাকা কিংবা দিল্লি, কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ বা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সূত্র ও প্রকাশিত তথ্যে একধরনের দ্বিমুখী চিত্র উঠে আসছে—একদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে দুইভাবে, অন্যদিকে সরকারের ভেতর থেকেই বলা হচ্ছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আমন্ত্রণের সূত্রপাত
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান এবং দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার এবং পররাষ্ট্র সচিব উপস্থিত থাকাকে তখন অনেক পর্যবেক্ষক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। এরপর থেকেই থেমে থেমে আলোচনায় উঠে এসেছে সম্ভাব্য এই সফরের প্রসঙ্গ, যদিও দীর্ঘদিন তা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আবার সামনে আসে গত সোমবার, যখন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ওই সাক্ষাতের পরই সাংবাদিকরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন কি না। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, এই বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর একদিন পর, মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন, দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্যও পৃথকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য এলে তা জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারতের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ দুই ধরনের—একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য, অন্যটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনের আউটরিচ অংশে অংশগ্রহণের জন্য। তবে বাংলাদেশ এই দুই আমন্ত্রণের কোনোটিতেই এখনো চূড়ান্ত সাড়া দেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্রিকস সম্মেলন ও সম্ভাব্য সময়সূচি
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে এই সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এই আউটরিচ অধিবেশন মূলত এমন একটি মঞ্চ, যেখানে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর বাইরেও প্রতিবেশী ও অংশীদার দেশগুলোকে যুক্ত করার একটি রেওয়াজ ইদানীং দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান কি সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনের সময়েই দিল্লি যাবেন, নাকি তার আগেই পৃথক একটি দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। কিছু সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, দ্বিপক্ষীয় সফরটি ব্রিকস সম্মেলনের আগেই সম্পন্ন হতে পারে, এমনকি চলতি মাসেই তিনি দিল্লি যেতে পারেন বলেও কোনো কোনো প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আবার কূটনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, দুই কর্মসূচি একই সময়ে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই মিলিয়ে ফেলা হতে পারে, যাতে একবারের সফরেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বহুপক্ষীয় সম্মেলন—দুটোই সম্পন্ন হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ নেই। একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সফরের সময়সূচি নিয়ে এখনো আলোচনা চলমান, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফলে পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে আগামী দিনের সরকারি ঘোষণার দিকে নজর রাখার জন্য।
সিদ্ধান্তহীনতার আড়ালে যা আছে
কেন এখনো সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি সূত্র বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই সফর-প্রস্তুতি এগোচ্ছে ধীর গতিতে। উভয় পক্ষই চাইছে, সফরটি যেন কোনো তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত না হয়ে বরং প্রস্তুতিমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি পরিণত পরিণতিতে পৌঁছায়।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর দেশের ভেতরে নানা সংস্কার প্রক্রিয়া, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের কাজ চলছে একযোগে। এমন এক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরের সময় ও প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করাটা সরকারের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। এই সফরকে ঘিরে জনমনে যে স্পর্শকাতরতা রয়েছে, তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয় একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, সফরের এজেন্ডা চূড়ান্ত করা। দুই দেশের মধ্যে ঝুলে থাকা একাধিক বিষয়—সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, ভিসা জটিলতা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—এসব ইস্যুতে আগে থেকে একটি সমঝোতার রূপরেখা তৈরি না হলে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারে না। তাই কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা এখনো চলমান থাকতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি
যদি এই সফর শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে দুই সরকারপ্রধানের বৈঠকে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে, তা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে একধরনের সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে আসছে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রসঙ্গ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান, তা কমিয়ে আনার উপায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি সীমান্ত হাট পুনরায় চালু করা কিংবা নতুন করে সম্প্রসারণের বিষয়েও কথা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ ও সংযোগ ব্যবস্থা। রেল, সড়ক ও নৌপথে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর একাধিক প্রকল্প বিগত বছরগুলোতে আলোচনায় ছিল। এসব প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে এই বৈঠকে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে সহযোগিতার প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেতে পারে। বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তিগুলোর অগ্রগতি এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলার বিষয়ে দুই পক্ষ কথা বলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চতুর্থত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি স্পর্শকাতর অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থেকেই যাচ্ছে। সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কে একটি অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ হয়ে আছে। এই বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের ধারণা।
সবশেষে আছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মনে রাখা জরুরি, এই আলোচ্যসূচির পুরোটাই এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে; সরকারিভাবে চূড়ান্ত এজেন্ডা প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব বিষয়কে সম্ভাব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
সম্পর্কের বাঁকবদল
প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়টি সব সময়ই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন সরকারের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের সুর কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় প্রথম কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাতের মধ্য দিয়েই। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে অনেক পর্যবেক্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বেশ কিছু ওঠানামা দেখা গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেও কমবেশি পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম দিল্লি সফর সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
একই সঙ্গে এই সফরকে অনেকে দেখছেন আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির প্রভাব বলয়ের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তারেক রহমান দিল্লি সফরের আগে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পন্ন করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ভারত সফর নিয়ে যে জল্পনা, তা এই বৃহত্তর কূটনৈতিক সফরসূচিরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গণমাধ্যমে যা উঠে আসছে
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তথ্যের মধ্যে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তারেক রহমান দিল্লি সফরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, আবার কোথাও উল্লেখ করা হচ্ছে, এই সফরে তার না যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই দ্বৈত বার্তা থেকেই বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিষয়টি এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিক দিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে আমন্ত্রণের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হলেও সফরের সময়সূচি নিয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
কেন এই সফর গুরুত্বপূর্ণ
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এই সফর কেবল একটি প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সাক্ষাতের চেয়ে অনেক বেশি কিছু বহন করছে। প্রথমত, এটি হবে নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি সংলাপ, যা আগামী দিনের সম্পর্কের সুর নির্ধারণ করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান জটিল ইস্যুগুলো—সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি বণ্টন—নিয়ে সরাসরি সংলাপের একটি সুযোগ তৈরি হবে এই সফরের মধ্য দিয়ে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানও এই সফরে একটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে, কেননা ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর বৈশ্বিক দক্ষিণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, কূটনৈতিক সফর মানেই তাৎক্ষণিক ফলাফল নয়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সফর দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্গঠনের সূচনা মাত্র। ফলে এই সফর হলেও তা থেকে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট ফলাফল আসবে, তা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি না করাই সংগত বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।
এখন যা জানা প্রয়োজন
সংক্ষেপে বললে, এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে যা বলা যায় তা হলো—ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুইভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য। এই আমন্ত্রণ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সরাসরি নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে যা এখনো অনিশ্চিত তা হলো—প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে এই সফরে যাবেন কি না, গেলে কবে যাবেন, এবং সফরটি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কর্মসূচি একসঙ্গে হবে নাকি পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে পাঠকদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ, কর্মসূচি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে সরকারি সূত্র থেকে আসা সবশেষ ঘোষণার দিকে নজর রাখা জরুরি। কূটনৈতিক এই ধরনের আলোচনা প্রায়ই দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বর্তমান প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য আগামী দিনগুলোতে পরিমার্জিত বা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত না উভয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ও কর্মসূচি নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সফরকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা সংগত। আগামী দিনগুলোতে এই বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশিত হলে তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ থাকবে পাঠকদের প্রতি।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

গ্যাস সংকট: তিন বছরের মধ্যে আরও ৩ এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা

১৩ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ

আপডেট সময় ১২:৫৩:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তার মেঘ
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায় রচিত হতে চলেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে গত কয়েক দিন ধরে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান এখনো ভারতে কোনো সফরে যাননি। এই প্রথমবারের মতো তাকে ঘিরে যে সফর-আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু দুই সরকারপ্রধানের একটি সাক্ষাতের বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার দুই বড় প্রতিবেশীর সম্পর্ক নতুন কোন খাতে বইবে, সেই প্রশ্নেরও একটি ইঙ্গিত বহন করছে এই সফর-সম্ভাবনা।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার—এখনো পর্যন্ত এই সফর চূড়ান্ত নয়। ঢাকা কিংবা দিল্লি, কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ বা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সূত্র ও প্রকাশিত তথ্যে একধরনের দ্বিমুখী চিত্র উঠে আসছে—একদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে দুইভাবে, অন্যদিকে সরকারের ভেতর থেকেই বলা হচ্ছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আমন্ত্রণের সূত্রপাত
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান এবং দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার এবং পররাষ্ট্র সচিব উপস্থিত থাকাকে তখন অনেক পর্যবেক্ষক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। এরপর থেকেই থেমে থেমে আলোচনায় উঠে এসেছে সম্ভাব্য এই সফরের প্রসঙ্গ, যদিও দীর্ঘদিন তা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আবার সামনে আসে গত সোমবার, যখন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ওই সাক্ষাতের পরই সাংবাদিকরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন কি না। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, এই বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর একদিন পর, মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন, দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্যও পৃথকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য এলে তা জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারতের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ দুই ধরনের—একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য, অন্যটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনের আউটরিচ অংশে অংশগ্রহণের জন্য। তবে বাংলাদেশ এই দুই আমন্ত্রণের কোনোটিতেই এখনো চূড়ান্ত সাড়া দেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্রিকস সম্মেলন ও সম্ভাব্য সময়সূচি
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে এই সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এই আউটরিচ অধিবেশন মূলত এমন একটি মঞ্চ, যেখানে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর বাইরেও প্রতিবেশী ও অংশীদার দেশগুলোকে যুক্ত করার একটি রেওয়াজ ইদানীং দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান কি সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনের সময়েই দিল্লি যাবেন, নাকি তার আগেই পৃথক একটি দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। কিছু সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, দ্বিপক্ষীয় সফরটি ব্রিকস সম্মেলনের আগেই সম্পন্ন হতে পারে, এমনকি চলতি মাসেই তিনি দিল্লি যেতে পারেন বলেও কোনো কোনো প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আবার কূটনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, দুই কর্মসূচি একই সময়ে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই মিলিয়ে ফেলা হতে পারে, যাতে একবারের সফরেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বহুপক্ষীয় সম্মেলন—দুটোই সম্পন্ন হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ নেই। একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সফরের সময়সূচি নিয়ে এখনো আলোচনা চলমান, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফলে পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে আগামী দিনের সরকারি ঘোষণার দিকে নজর রাখার জন্য।
সিদ্ধান্তহীনতার আড়ালে যা আছে
কেন এখনো সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি সূত্র বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই সফর-প্রস্তুতি এগোচ্ছে ধীর গতিতে। উভয় পক্ষই চাইছে, সফরটি যেন কোনো তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত না হয়ে বরং প্রস্তুতিমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি পরিণত পরিণতিতে পৌঁছায়।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর দেশের ভেতরে নানা সংস্কার প্রক্রিয়া, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের কাজ চলছে একযোগে। এমন এক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরের সময় ও প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করাটা সরকারের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। এই সফরকে ঘিরে জনমনে যে স্পর্শকাতরতা রয়েছে, তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয় একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, সফরের এজেন্ডা চূড়ান্ত করা। দুই দেশের মধ্যে ঝুলে থাকা একাধিক বিষয়—সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, ভিসা জটিলতা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—এসব ইস্যুতে আগে থেকে একটি সমঝোতার রূপরেখা তৈরি না হলে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারে না। তাই কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা এখনো চলমান থাকতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি
যদি এই সফর শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে দুই সরকারপ্রধানের বৈঠকে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে, তা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে একধরনের সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে আসছে বাণিজ্য সম্পর্কের প্রসঙ্গ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান, তা কমিয়ে আনার উপায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি সীমান্ত হাট পুনরায় চালু করা কিংবা নতুন করে সম্প্রসারণের বিষয়েও কথা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ ও সংযোগ ব্যবস্থা। রেল, সড়ক ও নৌপথে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর একাধিক প্রকল্প বিগত বছরগুলোতে আলোচনায় ছিল। এসব প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে এই বৈঠকে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে সহযোগিতার প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেতে পারে। বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তিগুলোর অগ্রগতি এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলার বিষয়ে দুই পক্ষ কথা বলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চতুর্থত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি স্পর্শকাতর অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থেকেই যাচ্ছে। সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কে একটি অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ হয়ে আছে। এই বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের ধারণা।
সবশেষে আছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মনে রাখা জরুরি, এই আলোচ্যসূচির পুরোটাই এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে; সরকারিভাবে চূড়ান্ত এজেন্ডা প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এসব বিষয়কে সম্ভাব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
সম্পর্কের বাঁকবদল
প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়টি সব সময়ই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন সরকারের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের সুর কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় প্রথম কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাতের মধ্য দিয়েই। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে অনেক পর্যবেক্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বেশ কিছু ওঠানামা দেখা গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেও কমবেশি পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম দিল্লি সফর সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
একই সঙ্গে এই সফরকে অনেকে দেখছেন আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির প্রভাব বলয়ের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তারেক রহমান দিল্লি সফরের আগে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পন্ন করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ভারত সফর নিয়ে যে জল্পনা, তা এই বৃহত্তর কূটনৈতিক সফরসূচিরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গণমাধ্যমে যা উঠে আসছে
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তথ্যের মধ্যে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তারেক রহমান দিল্লি সফরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, আবার কোথাও উল্লেখ করা হচ্ছে, এই সফরে তার না যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই দ্বৈত বার্তা থেকেই বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিষয়টি এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিক দিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে আমন্ত্রণের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হলেও সফরের সময়সূচি নিয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
কেন এই সফর গুরুত্বপূর্ণ
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এই সফর কেবল একটি প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সাক্ষাতের চেয়ে অনেক বেশি কিছু বহন করছে। প্রথমত, এটি হবে নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি সংলাপ, যা আগামী দিনের সম্পর্কের সুর নির্ধারণ করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান জটিল ইস্যুগুলো—সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি বণ্টন—নিয়ে সরাসরি সংলাপের একটি সুযোগ তৈরি হবে এই সফরের মধ্য দিয়ে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানও এই সফরে একটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে, কেননা ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর বৈশ্বিক দক্ষিণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, কূটনৈতিক সফর মানেই তাৎক্ষণিক ফলাফল নয়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সফর দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্গঠনের সূচনা মাত্র। ফলে এই সফর হলেও তা থেকে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট ফলাফল আসবে, তা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি না করাই সংগত বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।
এখন যা জানা প্রয়োজন
সংক্ষেপে বললে, এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে যা বলা যায় তা হলো—ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুইভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য। এই আমন্ত্রণ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সরাসরি নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে যা এখনো অনিশ্চিত তা হলো—প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে এই সফরে যাবেন কি না, গেলে কবে যাবেন, এবং সফরটি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কর্মসূচি একসঙ্গে হবে নাকি পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে পাঠকদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ, কর্মসূচি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে সরকারি সূত্র থেকে আসা সবশেষ ঘোষণার দিকে নজর রাখা জরুরি। কূটনৈতিক এই ধরনের আলোচনা প্রায়ই দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বর্তমান প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য আগামী দিনগুলোতে পরিমার্জিত বা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত না উভয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ও কর্মসূচি নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সফরকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা সংগত। আগামী দিনগুলোতে এই বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশিত হলে তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ থাকবে পাঠকদের প্রতি।

Share this news as a Photo Card