রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন কে। গত শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর থেকেই এই আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। সরকার গঠনের সময় থেকেই এই পদে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার নাম শোনা যাচ্ছিল, তবে গত দুই দিনে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কয়েকটি নতুন নাম। যদিও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্যদের চূড়ান্ত তালিকা এখন অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে।
সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, দল থেকে বাইরের কাউকে নয়, বরং বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকেই বেছে নেওয়া হতে পারে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। যদিও এ নিয়ে এখনো দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। সূত্রের ভাষ্য, সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে চলছে অত্যন্ত সন্তর্পণে, নীরবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের সময় থেকেই রাষ্ট্রপতি পদে দলের বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় উঠে আসে। এর মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ছিল অন্যতম। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নামও শোনা যাচ্ছিল সে সময়। সাম্প্রতিক সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও। এমনকি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নামও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
তবে দলীয় ও দলের বাইরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, শারীরিক প্রতিকূলতাসহ নানা বিবেচনায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই এখন সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির আলোচনায় পিছিয়ে পড়েছেন। বরং গত দুই দিনে জোরালোভাবে সামনে উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম। দলের ভেতরের একটা অংশ নানা বিবেচনায় তাঁকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।
রাজনীতির বাইরেও মির্জা ফখরুল ইসলামের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে এই পদের জন্য যোগ্য মনে করছেন, যাঁদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলাখুলি সেই মনোভাব প্রকাশও করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলামকে ‘সেরা প্রার্থী’ আখ্যা দিয়েছেন। ‘বাংলাদেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন?’ শিরোনামে সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমার মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ পদে যোগ্য ব্যক্তি। শেখ হাসিনার দুঃশাসনকালে তিনি মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেছেন, বহুভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি মডারেট, সদাচারী ও সুবক্তা হিসেবে অগ্রগণ্য।’ আসিফ নজরুল আরও লেখেন, ‘বিএনপিতে উপযুক্ত আরও কেউ কেউ আছেন। তবে আমার মতে, সব দিক বিবেচনায় মির্জা ফখরুল এগিয়ে থাকবেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তিনি সম্ভবত সেরা প্রার্থী।’
এর আগে ব্র্যাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও এক ফেসবুক পোস্টে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন অন্যদের চেয়ে যোগ্যতর, তা তুলে ধরেছিলেন।
এদিকে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই এই দায়িত্ব পালন করে যাবেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি, আর সংসদে যেহেতু বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দলের মনোনীত প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হওয়ার কথা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি। রাজনীতির বাস্তবতায় পরিস্থিতি যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে, তাই আজ যাঁরা আলোচনায় এগিয়ে আছেন, সময়ের ব্যবধানে তাঁদের অবস্থানও বদলে যেতে পারে। এ কারণেই রাজনৈতিক বোদ্ধাদের অনেকে মনে করছেন, ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে এই জল্পনা-কল্পনা চলতেই থাকবে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
এস কে চন্দন, ঢাকা 




















