অর্ধেক আর্জেন্টিনা, অর্ধেক ব্রাজিল: এক জার্সিতেই ‘শান্তি’ খুঁজছেন অভিনেতা ফারুক আহমেদ
ফুটবল বিশ্বকাপের বাদ্যি বাজতেই বাংলাদেশে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এক চিরচেনা দ্বৈরথ—আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল। প্রিয় দলের নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ পতাকা, জার্সি আর বিশালাকার ব্যানারে ছেয়ে যায় অলিগলি থেকে বহুতল ভবনের ছাদ। এই উন্মাদনা থেকে পিছিয়ে থাকেন না বিনোদন জগতের তারকারাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের খুনসুটি, টিপ্পনী আর তর্ক-বিতর্ক যেন সাধারণ সমর্থকদের উৎসবের পারদ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই চিরাচরিত বিভাজন আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এক রূপ নিয়ে হাজির হলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ফারুক আহমেদ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর পোস্ট করা একটি ছবি রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে নেটিজেনদের মাঝে।
ছবিতো দেখা যাচ্ছে তাঁর গায়ে জড়ানো বিশেষ এক জার্সি, যার এক অংশে জ্বলজ্বল করছে আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল স্ট্রাইপ, আর অন্য অংশে ব্রাজিলের চিরচেনা হলুদ-সবুজ। এক জার্সিতেই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দী দেশের এই অভিনব সহাবস্থান নজর কেড়েছে সবার।
‘এই কামড়াকামড়ির মধ্যে আমি নাই’
বিশ্বকাপের এই জোয়ার এবং নিজের ব্যতিক্রমী জার্সি প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেতা ফারুক আহমেদ। দেশের বর্তমান ফুটবল আবহ নিয়ে তিনি বলেন, “আবারও আসছে ফিফা বিশ্বকাপ। এটা সত্যিই দারুণ এক ভালো লাগার সময়। বিশ্বকাপের এই উন্মাদনায় সারা দেশের মানুষ এখন মশগুল। কেউ আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখছেন, তো কেউ ব্রাজিলকে। যার যে দল পছন্দ, সে সেই দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে ছবি তুলছেন, ফেসবুকে পোস্ট করছেন। এখন যেখানেই যাচ্ছি—চায়ের দোকান থেকে শুটিং সেট—সবখানেই শুধু খেলা নিয়ে আলাপ।”
কথায় কথায় এই অভিনেতা জানান, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সহকর্মীরাও প্রায়ই তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি আসলে কোন দলের সমর্থক। বিষয়টি তিনি বেশ উপভোগ করেন।
তবে মাঠের খেলা যখন মাঠ পেরিয়ে গ্যালারি বা ঘরের ড্রয়িংরুমে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তখন ফারুক আহমেদ চেষ্টা করেন নিজেকে গুটিয়ে রাখতে। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “এক দল বলে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হবে, আরেক দল বলে ব্রাজিল। সবাই নিজের পছন্দের দলকে সেরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। এই তর্ক-বিতর্কের মাঝে আমি নাই। আমি স্রেফ খেলা উপভোগ করি।”
গাছের জার্সিটি দেখে অনেকেই যখন ভাবছেন তিনি বোধহয় দুই দলকেই সমানভাবে সমর্থন করেন, তখন স্বভাবসুলভ রসবোধের সাথে ফারুক আহমেদ বলেন, “এই খেলা নিয়ে দেশে বিরাট ফাটাফাটি হইব, বুঝলেন? আমি অত্যন্ত গোবেচারা মানুষ। এসব দলাদলি আর কামড়াকামড়ির মধ্যে আমি নাই। তাই এমন একখান জার্সি গায়ে জড়িয়েছি। এখন আমার আর কোনো প্রতিপক্ষ নাই। আহ্, কী শান্তি! সবাই এখন আমার আপন।”
পর্দার গল্প যখন বাস্তবে
অর্ধেক আর্জেন্টিনা আর অর্ধেক ব্রাজিলের এই অদ্ভুতুড়ে জার্সির পেছনে রয়েছে একটি পুরনো গল্প। ফারুক আহমেদ জানান, ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ের হলেও জার্সিটির বয়স বেশ কয়েক বছর।
“এটি গতবারেরও আগের বারের ঘটনা। তখন একটি বিশেষ নাটকের শুটিংয়ের প্রয়োজনে আমাকে এই বিশেষ জার্সিটি পরতে হয়েছিল,” বলেন তিনি।
বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রচারিত সেই নাটকটির মূল উপজীব্যই ছিল বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা এবং এর পারিবারিক মনস্তত্ত্ব। নাটকের গল্পে দেখা যায়, ফারুক আহমেদের চরিত্রের স্ত্রী ছিলেন কট্টর আর্জেন্টিনার সমর্থক, আর তিনি নিজে ব্রাজিলের। ফুটবলকে কেন্দ্র করে সেই চেনা আদলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রতিনিয়ত খুনসুটি, ঝগড়া এবং তীব্র মতবিরোধ চলতেই থাকত।
একপর্যায়ে পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে এবং স্ত্রীর রাগ ভাঙাতে এক অভিনব উপায় বের করে ফারুক আহমেদের চরিত্রটি। দর্জি দিয়ে তৈরি করে নেন এমন এক জার্সি, যার অর্ধেকটা আর্জেন্টিনার আর বাকি অর্ধেকটা ব্রাজিলের। সেই নাটকে ফারুক আহমেদের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী মাইশা খন্দকার। পর্দার সেই ‘পারিবারিক শান্তি’র ফর্মুলাটাই এবার অভিনেতা বাস্তবে ব্যবহার করলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ফুটবল যুদ্ধ’ থেকে বাঁচতে।
‘অত্যধিক মাতামাতি ভালো নয়’
হাসি-ঠাট্টার আড়ালে বাংলাদেশের এই ফুটবল উন্মাদনার একটি অন্ধকার দিক নিয়ে বেশ আফসোস ঝরল জ্যেষ্ঠ এই অভিনেতার কণ্ঠে। লাতিন আমেরিকার দুটি দেশের জন্য বাংলাদেশের মানুষের এই আত্মত্যাগ বা আবেগের আতিশয্যকে তিনি পুরোপুরি ইতিবাচকভাবে দেখতে পারছেন না।
ফারুক আহমেদ বলেন, “কোনো কিছু নিয়েই অতিরিক্ত মাতামাতি ভালো নয়। অন্য একটি দেশের পতাকা আমরা ঘরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখছি, দিনের পর দিন তর্ক করছি। আমরা কোনো কিছুতে ভালো করলে কি ওইসব দেশের মানুষ আমাদের পতাকা এভাবে ঘরের ছাদে ঝোলাত? সমর্থন বা ভালোবাসা থাকতেই পারে, কিন্তু অত্যধিক মাতামাতি কখনোই কাম্য নয়।”
ফুটবলকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঘটনাগুলো তাঁকে ব্যথিত করে। তিনি যোগ করেন, “আমাদের দেশে খেলা নিয়ে খুনখারাবি পর্যন্ত হয়ে যায়। অথচ খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্যই তো হলো মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি জাগিয়ে তোলা। আর আমাদের এখানে উল্টো সম্পর্ক নষ্ট হয়, মারামারি হয়। এমন ঘটনা সত্যি দুঃখজনক।”
ব্যক্তিগতভাবে ফারুক আহমেদ কোন শিবিরের বাসিন্দা—আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল? এমন প্রশ্নের জবাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “আমি ফুটবল খেলা পছন্দ করি, কিন্তু কোনো বিশেষ দলের অন্ধ সমর্থক নই। খেলা নিয়ে আমার ওতটা অন্ধ আবেগ বা উগ্রতা নেই। মাঠের লড়াইয়ে যারা ভালো খেলবে এবং যারা জিতবে, তারাই আমার পছন্দের দল। আমি স্রেফ সুন্দর একটা ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করতে ভালোবাসি।”
চলমান বার্তা ডেস্ক : 






















