স্ট্রোক এমন এক শারীরিক বিপর্যয়, যেখানে রোগীর বাঁচা-মরা অনেকাংশে নির্ভর করে কতটা দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম কয়েক মিনিট সবচেয়ে জরুরি সময়—এই সময়ে করা কিছু সাধারণ ভুলই হতে পারে মারাত্মক।
স্ট্রোক কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ
মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে বা রক্তনালি বন্ধ হয়ে যে স্ট্রোক হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে বলা হয় ইস্কেমিক স্ট্রোক—আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এই ধরনের স্ট্রোকেই ভোগেন। এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, আগেভাগে সতর্ক হওয়ার মতো নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ প্রায়ই থাকে না। অনেক সময় কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা সাময়িক অবশ হয়ে যাওয়া বা চোখে ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ কয়েক মিনিটেই সেরে যায়—চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক বা মিনি স্ট্রোক। এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বড় আকারে স্ট্রোক ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, ইস্কেমিক স্ট্রোকের সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে উপযুক্ত ওষুধ প্রয়োগ করা গেলে রোগীর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি
মুখে পানি বা খাবার না দেওয়া: রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়লে বা মুখ বেঁকে গেলে ঢোক গেলার ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। এ অবস্থায় পানি ফুসফুসে চলে গিয়ে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
নিজে থেকে ওষুধ না দেওয়া: স্ট্রোক মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কি না তা নিশ্চিত না হয়ে অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ দেওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে, কারণ রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে এমন ওষুধ রক্তপাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রোগীকে বাসায় রেখে না দেওয়া: লক্ষণ সাময়িকভাবে কমে গেলেও রোগীকে বাসায় রেখে পর্যবেক্ষণ করা ঝুঁকিপূর্ণ; দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই নিরাপদ।
প্রথম পাঁচ মিনিটে যা করণীয়
লক্ষণ চেনাই প্রথম কাজ—মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে পড়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়া দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। লক্ষণ ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, সেই সময়টি মনে রাখা জরুরি, কারণ হাসপাতালে প্রথমেই এই তথ্য জানতে চাওয়া হবে। রোগীকে মাথা কিছুটা উঁচু করে শুইয়ে রাখতে হবে, আর জ্ঞান হারালে একপাশ ফিরিয়ে শোয়ানো উচিত, যাতে শ্বাসনালি বন্ধ না হয়।
বাংলাদেশের চিত্র উদ্বেগজনক
বাংলাদেশেও স্ট্রোক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশই ঘটে স্ট্রোকের কারণে, আর প্রতি লাখে বছরে গড়ে ৫৫ জনের মৃত্যু হয় এই রোগে। দেশের কয়েকটি বড় হাসপাতালে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীরা গড়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা দেরি করে হাসপাতালে পৌঁছান, আর হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও চিকিৎসা শুরু হতে সময় লাগে আরও দেড় ঘণ্টা—এই বিলম্বের কারণে দেশের বড় সংখ্যক রোগী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থেকে যান। ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত স্নায়ুরোগ চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হওয়ায় সমস্যা আরও প্রকট। তবে আশার কথা, মস্তিষ্কের জমাট রক্ত ক্যাথেটারের মাধ্যমে বের করে আনার আধুনিক পদ্ধতি মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমি এখন দেশের কিছু হাসপাতালেও চালু হয়েছে, যা দ্রুত আনা গেলে রোগীর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
শিরোনাম :
স্ট্রোক হলে প্রথম পাঁচ মিনিটে কী করবেন, কোন ভুলে বাড়ে প্রাণহানির ঝুঁকি
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০৫:৫০:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
- 4
জনপ্রিয় সংবাদ

























