নারায়ণগঞ্জে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ড্রামে ঢালাই করে পুকুরে লাশ গুম,প্রযুক্তিগত তদন্তে রহস্যের উন্মোচন 

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ব্যবসায়ী হেকমত আলী নিখোঁজ হওয়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গিয়েছিল। সবদিকেই ছিল এক গভীর রহস্য। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে কোনো সুরাহা না মিললেও, শেষ পর্যন্ত এক নছিমনচালকের দেওয়া তথ্যে উন্মোচিত হলো এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বীভৎস চিত্র। নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই পরিকল্পিত হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় এখন আদালতের চূড়ান্ত রায়ও ঘোষিত হয়েছে।

ঘটনাটির সূত্রপাত ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল। রূপগঞ্জের কালাদী এলাকার নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি মোটর পার্টস ব্যবসায়ী হেকমত আলী। পরিবারের পক্ষ থেকে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করা হলেও কোনো কিনারা করতে পারছিল না পুলিশ। দীর্ঘ ১০ দিন পর ১৫ জুন মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তের শুরুতে হেকমতের দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু রফিকুল শুরু থেকেই তথ্যের অসংগতি সৃষ্টি করে আসছিলেন। পিবিআইয়ের নজরে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—নিখোঁজ হওয়ার রাতে রফিকুলের সাথে এক নছিমনচালকের মুঠোফোনে যোগাযোগের প্রমাণ।

তদন্তকারীরা সেই চালককে খুঁজে বের করার পর প্রথমবারের মতো সামনে আসে একটি ড্রামের কথা। চালক জানান, ঘটনার পরদিন ভোরে তিনি রফিকুলের বাড়িতে গেলে দেখেন, রফিকুল, তাঁর দুই ভাই ও বাবা একটি ভারী ড্রাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ড্রামটি নছিমনে তুলে নিয়ে একটি মাছের খামারের পুকুরপাড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এই সূত্রের ভিত্তিতে রফিকুলকে আবারও রিমান্ডে নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পিবিআই। শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েন তিনি। স্বীকার করেন, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বিরোধের জেরে হেকমতকে কৌশলে তাদের বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম নেওয়ার সময় শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়।

মরদেহ গুম করার জন্য এক চরম নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয় খুনিরা। একটি বড় ড্রামের ভেতর লাশ ঢুকিয়ে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাতে লাশ কোনোভাবেই ভেসে না ওঠে। এরপর ড্রামটি মাছের খামারের পুকুরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ২ জুলাই ডুবুরি দল পুকুরের তলদেশ থেকে ড্রামটি উদ্ধার করে। ড্রামের ধাতব আবরণ কাটতেই বেরিয়ে আসে হেকমতের কঙ্কালসার দেহ।

পিবিআই প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, অপরাধীরা ভেবেছিল লাশ গুম করে খুনের চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহারে পিবিআই পুরো পরিকল্পনার জাল ছিন্ন করে।

তদন্তে উঠে আসে, ব্যবসার লাভের অংশ এবং পারিবারিক বিবাদ থেকে এই হত্যার ছক কষে রফিকুল। এতে যুক্ত হন তাঁর দুই ভাই মাহফুজুর রহমান ও মামুন এবং তাঁদের বাবা ইয়াকুব হোসেন। আইনের দীর্ঘ লড়াই শেষে গত ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে রফিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁর ভাই মাহফুজুর রহমানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একটি ড্রাম আর প্রযুক্তিগত তদন্তে শেষ হলো এক দীর্ঘ রহস্যের পথচলা।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইরান-সংঘাতে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, চাপে এশিয়ার শেয়ারবাজার

১৩ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

নারায়ণগঞ্জে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ড্রামে ঢালাই করে পুকুরে লাশ গুম,প্রযুক্তিগত তদন্তে রহস্যের উন্মোচন 

আপডেট সময় ০১:২৫:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ব্যবসায়ী হেকমত আলী নিখোঁজ হওয়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গিয়েছিল। সবদিকেই ছিল এক গভীর রহস্য। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে কোনো সুরাহা না মিললেও, শেষ পর্যন্ত এক নছিমনচালকের দেওয়া তথ্যে উন্মোচিত হলো এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বীভৎস চিত্র। নিখোঁজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই পরিকল্পিত হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় এখন আদালতের চূড়ান্ত রায়ও ঘোষিত হয়েছে।

ঘটনাটির সূত্রপাত ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল। রূপগঞ্জের কালাদী এলাকার নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি মোটর পার্টস ব্যবসায়ী হেকমত আলী। পরিবারের পক্ষ থেকে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করা হলেও কোনো কিনারা করতে পারছিল না পুলিশ। দীর্ঘ ১০ দিন পর ১৫ জুন মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তের শুরুতে হেকমতের দূরসম্পর্কের ভাগনে রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু রফিকুল শুরু থেকেই তথ্যের অসংগতি সৃষ্টি করে আসছিলেন। পিবিআইয়ের নজরে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—নিখোঁজ হওয়ার রাতে রফিকুলের সাথে এক নছিমনচালকের মুঠোফোনে যোগাযোগের প্রমাণ।

তদন্তকারীরা সেই চালককে খুঁজে বের করার পর প্রথমবারের মতো সামনে আসে একটি ড্রামের কথা। চালক জানান, ঘটনার পরদিন ভোরে তিনি রফিকুলের বাড়িতে গেলে দেখেন, রফিকুল, তাঁর দুই ভাই ও বাবা একটি ভারী ড্রাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ড্রামটি নছিমনে তুলে নিয়ে একটি মাছের খামারের পুকুরপাড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এই সূত্রের ভিত্তিতে রফিকুলকে আবারও রিমান্ডে নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পিবিআই। শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েন তিনি। স্বীকার করেন, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক বিরোধের জেরে হেকমতকে কৌশলে তাদের বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম নেওয়ার সময় শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়।

মরদেহ গুম করার জন্য এক চরম নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয় খুনিরা। একটি বড় ড্রামের ভেতর লাশ ঢুকিয়ে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাতে লাশ কোনোভাবেই ভেসে না ওঠে। এরপর ড্রামটি মাছের খামারের পুকুরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ২ জুলাই ডুবুরি দল পুকুরের তলদেশ থেকে ড্রামটি উদ্ধার করে। ড্রামের ধাতব আবরণ কাটতেই বেরিয়ে আসে হেকমতের কঙ্কালসার দেহ।

পিবিআই প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, অপরাধীরা ভেবেছিল লাশ গুম করে খুনের চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহারে পিবিআই পুরো পরিকল্পনার জাল ছিন্ন করে।

তদন্তে উঠে আসে, ব্যবসার লাভের অংশ এবং পারিবারিক বিবাদ থেকে এই হত্যার ছক কষে রফিকুল। এতে যুক্ত হন তাঁর দুই ভাই মাহফুজুর রহমান ও মামুন এবং তাঁদের বাবা ইয়াকুব হোসেন। আইনের দীর্ঘ লড়াই শেষে গত ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে রফিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁর ভাই মাহফুজুর রহমানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একটি ড্রাম আর প্রযুক্তিগত তদন্তে শেষ হলো এক দীর্ঘ রহস্যের পথচলা।

Share this news as a Photo Card