মেসির আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিতে রেফারির ‘কারচুপি’!

কাতার বিশ্বকাপের পর আবারও বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের ফুটবলের চেয়েও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আটলান্টার সেই বিতর্কিত ম্যাচ। শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলেও, ভিএআরের (VAR) একটি সিদ্ধান্ত জন্ম দিয়েছে তুমুল বিতর্কের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ফুটবল বিশ্লেষকদের ঘর—সবখানেই এখন প্রশ্ন: তবে কি মেসিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের?

বিতর্কিত সেই মুহূর্ত

ম্যাচ তখন বেশ জমে উঠেছে। মোহামেদ সালাহর জাদুকরী পাস থেকে মোস্তফা জিকোর দুর্দান্ত গোলে মিশর যখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন গ্যালারিতে মিশরের সমর্থকদের বাঁধনহারা উল্লাস। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। গোল উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ভিএআরের শরণাপন্ন হন।

রিপ্লে ফুটেজে দেখা যায়, গোল হওয়ার প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, সেই ফাউলের সূত্র ধরে জিকোর গোলটি বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পরই যেন খেলার মোড় ঘুরে যায়। মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। শেষ পর্যন্ত মেসির গোল এবং ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্কালোনির শিষ্যরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়

ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হয়ে ওঠে সমালোচনার কেন্দ্রস্থল। মিশরের সমর্থকরা সরাসরি ‘ম্যাচ পাতানোর’ অভিযোগ তুলেছেন। একজন সমর্থক লিখেছেন, “এটি ফুটবল নয়, বরং একটি সাজানো চিত্রনাট্য। মেসির হাতে শিরোপা তুলে দিতেই কি এমন আয়োজন?” আরেকজন যোগ করেন, “মিশরের কাছ থেকে গোলটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে, গোলের এত আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভিত্তিতে গোল বাতিল করার নজির ফুটবলে বিরল।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা?

ফুটবল জগতের অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং বিশ্লেষকরাও এই সিদ্ধান্তটিকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। স্কাই স্পোর্টসের সাংবাদিক রব হ্যারিস মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের যে মূল উদ্দেশ্য, তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, “ভিএআর আইনের ভেতর থাকলেও, এত দীর্ঘ সময় আগের একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ফুটবলের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে।”

বিবিসির সাংবাদিক ডেল জনসনের মতে, চলতি বিশ্বকাপের সামগ্রিক রেফারিং মানদণ্ডের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “খুবই সূক্ষ্ম সংস্পর্শের কারণে এত সুন্দর একটি গোল বাতিল হওয়া ফুটবলের সৌন্দর্যের জন্য ক্ষতিকর।”

তীব্র সমালোচনার মুখে কিছুটা রসিকতা মিশিয়ে সাংবাদিক হেনরি উইন্টার বলেন, “ভিএআর যদি আরও বিশ সেকেন্ড পেছনে গিয়ে দেখত, হয়তো দেখা যেত মিশরের এই আক্রমণের সাথে তুতানখামেনও জড়িত ছিলেন! নিয়মের মারপ্যাঁচে সিদ্ধান্তটি হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক, কিন্তু ফুটবলের আবেগের জায়গায় এটি বড় ধরণের অবিচার।”

প্রশ্নবিদ্ধ রেফারিং মানদণ্ড

বিতর্কিত এই সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে গোটা টুর্নামেন্টের রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভিএআর প্রযুক্তি যেখানে ফুটবলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে এটি কি উল্টো বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?

আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠের ফুটবলের চেয়েও মাঠের বাইরের এই বিতর্ক দীর্ঘকাল মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন পরবর্তী ম্যাচগুলোর দিকে—যেখানে প্রযুক্তি নয়, বরং খেলোয়াড়দের পায়ের জাদুই হয়ে উঠুক ম্যাচের মূল নিয়ামক।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইরান-সংঘাতে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, চাপে এশিয়ার শেয়ারবাজার

১৩ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

মেসির আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিতে রেফারির ‘কারচুপি’!

আপডেট সময় ১১:৪৬:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

কাতার বিশ্বকাপের পর আবারও বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের ফুটবলের চেয়েও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আটলান্টার সেই বিতর্কিত ম্যাচ। শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলেও, ভিএআরের (VAR) একটি সিদ্ধান্ত জন্ম দিয়েছে তুমুল বিতর্কের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ফুটবল বিশ্লেষকদের ঘর—সবখানেই এখন প্রশ্ন: তবে কি মেসিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের?

বিতর্কিত সেই মুহূর্ত

ম্যাচ তখন বেশ জমে উঠেছে। মোহামেদ সালাহর জাদুকরী পাস থেকে মোস্তফা জিকোর দুর্দান্ত গোলে মিশর যখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন গ্যালারিতে মিশরের সমর্থকদের বাঁধনহারা উল্লাস। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। গোল উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ভিএআরের শরণাপন্ন হন।

রিপ্লে ফুটেজে দেখা যায়, গোল হওয়ার প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, সেই ফাউলের সূত্র ধরে জিকোর গোলটি বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পরই যেন খেলার মোড় ঘুরে যায়। মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। শেষ পর্যন্ত মেসির গোল এবং ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্কালোনির শিষ্যরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়

ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হয়ে ওঠে সমালোচনার কেন্দ্রস্থল। মিশরের সমর্থকরা সরাসরি ‘ম্যাচ পাতানোর’ অভিযোগ তুলেছেন। একজন সমর্থক লিখেছেন, “এটি ফুটবল নয়, বরং একটি সাজানো চিত্রনাট্য। মেসির হাতে শিরোপা তুলে দিতেই কি এমন আয়োজন?” আরেকজন যোগ করেন, “মিশরের কাছ থেকে গোলটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে, গোলের এত আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভিত্তিতে গোল বাতিল করার নজির ফুটবলে বিরল।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা?

ফুটবল জগতের অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং বিশ্লেষকরাও এই সিদ্ধান্তটিকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। স্কাই স্পোর্টসের সাংবাদিক রব হ্যারিস মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের যে মূল উদ্দেশ্য, তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, “ভিএআর আইনের ভেতর থাকলেও, এত দীর্ঘ সময় আগের একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ফুটবলের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে।”

বিবিসির সাংবাদিক ডেল জনসনের মতে, চলতি বিশ্বকাপের সামগ্রিক রেফারিং মানদণ্ডের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “খুবই সূক্ষ্ম সংস্পর্শের কারণে এত সুন্দর একটি গোল বাতিল হওয়া ফুটবলের সৌন্দর্যের জন্য ক্ষতিকর।”

তীব্র সমালোচনার মুখে কিছুটা রসিকতা মিশিয়ে সাংবাদিক হেনরি উইন্টার বলেন, “ভিএআর যদি আরও বিশ সেকেন্ড পেছনে গিয়ে দেখত, হয়তো দেখা যেত মিশরের এই আক্রমণের সাথে তুতানখামেনও জড়িত ছিলেন! নিয়মের মারপ্যাঁচে সিদ্ধান্তটি হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক, কিন্তু ফুটবলের আবেগের জায়গায় এটি বড় ধরণের অবিচার।”

প্রশ্নবিদ্ধ রেফারিং মানদণ্ড

বিতর্কিত এই সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে গোটা টুর্নামেন্টের রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভিএআর প্রযুক্তি যেখানে ফুটবলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে এটি কি উল্টো বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?

আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠের ফুটবলের চেয়েও মাঠের বাইরের এই বিতর্ক দীর্ঘকাল মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন পরবর্তী ম্যাচগুলোর দিকে—যেখানে প্রযুক্তি নয়, বরং খেলোয়াড়দের পায়ের জাদুই হয়ে উঠুক ম্যাচের মূল নিয়ামক।

Share this news as a Photo Card