বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে “পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থা” বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তে অনির্বাচিত প্রশাসনিক কাঠামোর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়। বরং এ ধরনের ব্যবস্থা রাজনীতিবিদদের নিজেদের প্রতিই অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।
রোববার রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘নেহরীন খান স্মৃতি বক্তৃতা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান–২০২৬’–এ সম্মানিত বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘সাংবিধানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক লিখিত বক্তৃতায় তিনি নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধান, সংসদ, প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনীতি নিয়ে বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আপত্তি
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ধারণা এসেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দুর্বল করে।
তার ভাষায়, রাজনীতিবিদরা যদি নিজেরাই নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে না পারেন, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব
সংসদীয় শাসনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনের প্রস্তাব দেন তিনি।
বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সংসদ সদস্যদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল। এর পরিবর্তে তিনি একটি বৃহৎ ইলেকটোরাল কলেজ গঠনের প্রস্তাব করেন।
এই কলেজে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং অন্যান্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি। এতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা আরও শক্তিশালী হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
একই সঙ্গে সাংবিধানিক বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। তবে সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বাধ্যতামূলক পরামর্শের বিষয়টি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।
উচ্চকক্ষ গঠনের আহ্বান
বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দেন অধ্যাপক ফরাসউদ্দিন।
তার মতে, বিদ্যমান “উইনার টেকস অল” পদ্ধতিতে সামান্য ভোটের ব্যবধানেও আসনের বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়। ফলে অনেক ভোটারের মতামত সংসদে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
তিনি প্রস্তাব করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংবিধান সংশোধন এবং গুরুত্বপূর্ণ আইন পর্যালোচনার ক্ষমতা থাকবে এই উচ্চকক্ষের হাতে।
৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের সুপারিশ
সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
তার মতে, দলত্যাগ রোধে এই ধারা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবে এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ সীমিত করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন, অনাস্থা প্রস্তাব এবং অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
এছাড়া কোনো সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য চাইলে পৃথক ব্লক গঠনের সুযোগ রাখারও প্রস্তাব দেন তিনি।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তিনি একটি কঠোর নীতির প্রস্তাব দেন।
তার মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল যদি অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন না দেয়, তাহলে সেই দলের নিবন্ধন বাতিলের বিধান থাকা উচিত।
পরবর্তীতে ধাপে ধাপে নারী প্রার্থীর হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করারও সুপারিশ করেন তিনি।
নির্বাচনী ব্যয় কমানোর পরামর্শ
নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়ের একটি অংশ সরকারি কোষাগার থেকে বহনের প্রস্তাব দেন তিনি।
একই সঙ্গে নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রশাসনিক সংস্কারের রূপরেখা
প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের সুপারিশ করেন অধ্যাপক ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে এসব পদ দ্রুত পূরণ করা গেলে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি প্রশাসনিক সেবার মানও উন্নত হবে।
অদক্ষ ও অকার্যকর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে “গোল্ডেন হ্যান্ডশেক” নীতির মাধ্যমে সম্মানজনক অবসরের ব্যবস্থাও করার পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খেলাপি ঋণের সুদ আলাদা হিসাবে সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য নগদ জমার হার অতীতে ১০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া একই পরিবারের ব্যাংক পরিচালক থাকার সুযোগও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির আশা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন অধ্যাপক ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে এ লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা কাটিয়ে কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার ওপর জোর দেন।
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গ
বক্তৃতায় স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে চলমান বিতর্ককেও “অহেতুক” বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাই এ বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরির কোনো প্রয়োজন নেই বলেও মত দেন তিনি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্র ও কার্যকর সংস্কারের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য।
তার মতে, দেশের কোনো বড় জনগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সফল হতে পারে না। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সংলাপ, অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা নয়; বরং নির্বাচন, সংবিধান, প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি সমন্বিত সংস্কার ভাবনার রূপরেখা, যা ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















