বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বছরের শেষ দিকে শুরু হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে একগুচ্ছ নতুন সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
ইসির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে না। অর্থাৎ প্রার্থীরা সবাই স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভোট করবেন। একই সঙ্গে পোস্টারবিহীন প্রচারণা, ইভিএম বাদ, পোস্টাল ভোট বাতিল, জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধের মতো বেশ কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সংঘাত কমানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করা।
বছরের শেষ দিকে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা
সরকারের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার আলোচনা থাকলেও নির্বাচন কমিশন চাইছে অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের শুরুতে ভোট আয়োজন করতে।
কারণ হিসেবে কমিশন বলছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের অনেক এলাকায় বর্ষা পরিস্থিতি থাকে। এতে ভোটগ্রহণ ও নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, দেশের হাওরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে বর্ষার সময় নির্বাচন আয়োজন করা বাস্তবসম্মত হবে না।
তার ভাষায়, “মিঠামইন, বরিশাল বা ময়মনসিংহের মতো এলাকায় সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন। তাই আমরা মনে করি নভেম্বরের আগে নির্বাচন শুরু করা সম্ভব নাও হতে পারে।”
সরকার আগামী এক বছরের মধ্যে পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করতে চাইলেও কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে ইসি সূত্র বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই ভোট আয়োজন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০১৫ সালে আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করা হয়।
এর পর থেকেই স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, সহিংসতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ ছিল বিভিন্ন মহলের।
এবার আবারও সেই পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় প্রতীক বাদ দিলে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ব্যক্তি জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বেশি গুরুত্ব পাবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, দলীয় পরিচয়ের বদলে ব্যক্তি পরিচয়ে ভোট হলে সংঘাত কমতে পারে।
তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত স্থানীয় নেতৃত্বের নির্বাচন। এখানে দলীয় প্রতীক যুক্ত হওয়ার পর সহিংসতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছে।”
পোস্টারবিহীন নির্বাচনের নতুন বাস্তবতা
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন প্রচারণা দেখা যায়। এবার সেই নীতিই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অনুসরণ করতে যাচ্ছে ইসি।
কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পোস্টার নিষিদ্ধ করা হলে পরিবেশ দূষণ কমবে, দেয়াল নষ্ট হবে না এবং নির্বাচনি ব্যয়ও কমে আসবে।
এতে ডিজিটাল প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরাসরি গণসংযোগের ওপর গুরুত্ব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্টারবিহীন নির্বাচন এখন ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।
ইভিএম থাকছে না
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে না।
বাংলাদেশে ইভিএম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এবার কমিশন কাগুজে ব্যালটের দিকেই ফিরছে।
ইসি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে ভোটারদের আস্থা বাড়তে পারে।
অনলাইন মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত
জাতীয় নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই সুবিধা থাকছে না।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কেউ কেউ বলছেন, অনলাইন ব্যবস্থা না থাকলে মাঠ পর্যায়ে প্রার্থীদের হয়রানির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম মনে করেন, অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়। অনলাইন ব্যবস্থা থাকলে প্রার্থীরা ঘরে বসেই আবেদন করতে পারতেন।
তবে নির্বাচন কমিশন এখনো এই বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেয়নি।
১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হচ্ছে
বর্তমানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।
কিন্তু এবার সেই শর্ত তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
ইসি বলছে, যেহেতু সব প্রার্থীই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাই এই বাধ্যবাধকতা আর প্রয়োজন হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটারের গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
কারণ কোনো ভোটার প্রকাশ্যে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দিলে পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এতে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই কারণেই জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা করছে কমিশন।
নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই
জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত সেই পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ইসি।
কমিশন বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে প্রতিটি অঞ্চলে পর্যাপ্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব হবে।
তবে কোথাও সহিংসতা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অতীতে অনেক সহিংসতা হয়েছে এবং সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
তার ভাষায়, “আমরা কোনো রক্তপাত চাই না। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া সংঘাতমুক্ত নির্বাচন সম্ভব নয়।”
সংসদ সদস্যদের প্রভাব ঠেকানোর চিন্তা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে এমপিদের বসা এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে।
নির্বাচন কমিশন এখন এই বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করছে।
তবে কমিশন বলছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করা হবে।
সামনে কী?
নির্বাচন কমিশন আশা করছে জুন মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন বিধিমালার কাজ শেষ হবে।
এরপর ধাপে ধাপে তফসিল ঘোষণা শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন বরাবরই সংঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
এবারের পরিবর্তনগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে দলীয় প্রতীক বাতিল, পোস্টার নিষিদ্ধ এবং ইভিএম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
শিরোনাম :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি: পোস্টার নিষিদ্ধ, দলীয় প্রতীক বাদ, ইভিএমও থাকছে না
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ১২:০৩:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
- 74
ট্যাগস
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ইভিএম বাতিল ইসি উপজেলা নির্বাচন দলীয় প্রতীক বাতিল দলীয় প্রতীক বাদ ও ইভিএম বাতিলের পথে ইসি নির্দলীয় নির্বাচন নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সংস্কার পোস্টার নিষিদ্ধ বাংলাদেশ নির্বাচন বাংলাদেশ রাজনীতি সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ২০২৬: পোস্টার নিষিদ্ধ
জনপ্রিয় সংবাদ





















