উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস: নিহত ৮ শিশু, আহত ৫

টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পাহাড়ধসের এক মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও পাঁচ শিশু। বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল তিনটার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর ব্লক এ-৭/৩ এলাকায় একটি মেয়েদের মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা মোট ১৩ জন শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনেন। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়। বর্তমানে আহত পাঁচ শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আরআরআরসি জানায়, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (সিসিসিএম), স্বেচ্ছাসেবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে এপিবিএন সদস্যরাও নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। উদ্ধার কার্যক্রম শেষে পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনাস্থলে একটি মেয়েদের মাদ্রাসার ওপরের অংশে একটি মক্তব ছিল। দীর্ঘদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। একপর্যায়ে পাহাড়ের ঢাল ভেঙে নিচের মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ে। এতে মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি কাদা ও মাটির স্তূপে চাপা পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা নাগরিক একে মোহাম্মদ সাদেক বলেন, মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হঠাৎ করেই বিশাল অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় ভেতরে অবস্থানরত শিশুদের অধিকাংশই বেরিয়ে আসতে পারেনি।

ক্যাম্পের বাসিন্দা করিম শাহাদাত জানান, দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। পাহাড়ধস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রী দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে কান্না, চিৎকার ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর কোনো ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর আগেই আশপাশের বাসিন্দারা খালি হাতে মাটি সরিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান জোরদার করেন। উদ্ধারকারীরা একের পর এক শিশুদের বের করে এনে দ্রুত হাসপাতালে পাঠান। তবে গুরুতর আহত কয়েকজনকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে অবস্থান করায় মাদ্রাসাটি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় ঢাল ভেঙে ভবনের ওপর পড়ে। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিক আব্দুল্লাহ দাবি করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও শিক্ষার্থী আটকে থাকতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অতিরিক্ত কোনো নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঘনবসতি, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, অস্থায়ী স্থাপনা এবং অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে এসব এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

বুধবারের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ অবকাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে। নিহত শিশুদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক, আর আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইরান-সংঘাতে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, চাপে এশিয়ার শেয়ারবাজার

১৩ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস: নিহত ৮ শিশু, আহত ৫

আপডেট সময় ০৬:২৪:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পাহাড়ধসের এক মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও পাঁচ শিশু। বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল তিনটার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর ব্লক এ-৭/৩ এলাকায় একটি মেয়েদের মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা মোট ১৩ জন শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনেন। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়। বর্তমানে আহত পাঁচ শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আরআরআরসি জানায়, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (সিসিসিএম), স্বেচ্ছাসেবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে এপিবিএন সদস্যরাও নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। উদ্ধার কার্যক্রম শেষে পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনাস্থলে একটি মেয়েদের মাদ্রাসার ওপরের অংশে একটি মক্তব ছিল। দীর্ঘদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। একপর্যায়ে পাহাড়ের ঢাল ভেঙে নিচের মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ে। এতে মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি কাদা ও মাটির স্তূপে চাপা পড়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা নাগরিক একে মোহাম্মদ সাদেক বলেন, মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হঠাৎ করেই বিশাল অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় ভেতরে অবস্থানরত শিশুদের অধিকাংশই বেরিয়ে আসতে পারেনি।

ক্যাম্পের বাসিন্দা করিম শাহাদাত জানান, দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জন ছাত্রী কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। পাহাড়ধস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রী দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে কান্না, চিৎকার ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর কোনো ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর আগেই আশপাশের বাসিন্দারা খালি হাতে মাটি সরিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান জোরদার করেন। উদ্ধারকারীরা একের পর এক শিশুদের বের করে এনে দ্রুত হাসপাতালে পাঠান। তবে গুরুতর আহত কয়েকজনকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে অবস্থান করায় মাদ্রাসাটি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় ঢাল ভেঙে ভবনের ওপর পড়ে। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিক আব্দুল্লাহ দাবি করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও শিক্ষার্থী আটকে থাকতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অতিরিক্ত কোনো নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঘনবসতি, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, অস্থায়ী স্থাপনা এবং অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে এসব এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

বুধবারের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ অবকাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে। নিহত শিশুদের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক, আর আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

Share this news as a Photo Card